মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রের খসড়া করতে যারা দেখেছিলেন তাদের একজন আমার বাবা। শৈশবে তিনি আমাকে বলেছিলেন, শীতল যুদ্ধে বিভক্ত বিশ্বে কীভাবে সবার জন্য প্রযোজ্য এমন একটি সাধারণ ভিত্তি খুঁজে বের করা হয়েছিল।
১৯৪৮ সালে গৃহীত ঘোষণাপত্রে খাদ্যসহ মৌলিক অধিকারগুলো উল্লেখ করা হয়। রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্ব এ অধিকার রক্ষা করা, সম্মান দেখানো ও পূরণ করা। একই সঙ্গে এ দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হলে জবাবদিহি করতে হবে।
ঔপনিবেশিক অঞ্চলগুলো স্বাধীন হতে থাকে এবং বিশ্ব শাসন ব্যবস্থায় ন্যায্যতা বিধানের চাপ থাকায় ষাটের দশকে জাতিসংঘের সদস্যপদ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ১৯৬৬ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোকে চাহিদা অনুযায়ী বিশ্ব খাদ্য সরবরাহে সুষম বণ্টনের কথা বলা হয়েছে।
সত্তরের দশকের মাঝামাঝি তেল সরবরাহের ধাক্কা এবং মূল্যস্ফীতিতে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কমে আসে। কারণ রাষ্ট্রগুলো তখন অধিকারভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা থেকে নব্য উদারনীতিবাদের দিকে সরে যায়।
এ পদ্ধতির ভিত্তি দাঁড়িয়েছিল কিছু ভুল বিশ্বাসের ওপর। যেমন মুক্তবাজারে সবচেয়ে কার্যকরভাবে সম্পদ বণ্টন হয়, আর্থিক বিশ্বায়ন সব দেশের জন্য কল্যাণকর এবং পণ্য ও পরিষেবা সরবরাহ কাজে বেসরকারি খাত সরকারি ব্যবস্থার চেয়েও বেশি কার্যকর।
আশির দশকে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) অর্থাভাবে ভোগা দেশগুলোয় নব্য উদারবাদী কর্মসূচি আরোপ করতে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার উত্থান হলে গ্লোবাল সাউথের সরকারগুলোর সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা সীমিত হয়ে আসে।
নব্য উদারবাদী অর্থনীতিকে কার্যকর করতে সরকারগুলোকে পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানানো হয়। বিশেষ করে শ্রম ও পরিবেশগত সুরক্ষাসহ যেসব বিষয়কে মুক্ত বাণিজ্যের পথে এবং ভর্তুকি দিয়ে খাদ্যপণ্য আমদানিতে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে মনে করা হয়েছিল সেসব ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়।
ফলাফল হিসেবে শিল্পজাত খাদ্য ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি দেয়া বহুজাতিক করপোরেশনগুলো হতাশাজনকভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
নব্য উদারনীতির চরম মূল্য দিতে ভঙ্গুর সরবরাহ চেইন, অধিকারহীন শ্রমিক, ক্রমবর্ধমান জলবায়ু সংকট, মারাত্মকভাবে হ্রাস পাওয়া জীববৈচিত্র্য, স্বাস্থ্যকর খাদ্যের অ্যাকসেস হ্রাস, অস্থিতিশীল খাদ্য এবং চরম অর্থনৈতিক বৈষম্যের মধ্যে নাগরিকদের ফেলে দেয়া হয়েছে। ক্ষুধা ও অপুষ্টি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এখন সময় এসেছে এ ব্যবস্থা আমূল সংশোধনের।
আপাতত বৈশ্বিক শিল্প খাদ্য ব্যবস্থার সংস্কার করা কঠিন হবে। কারণ খাদ্য ব্যবস্থার সর্বোচ্চ ক্ষমতা দখল করে আছে মাত্র কয়েকটি বহুজাতিক কৃষি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। হাতে গোনা এ কতিপয় সংস্থার একচেটিয়া দখলে এখন গোটা বিশ্বের শস্য ও সার বাজার। ফলে সরবরাহ চেইনে কোনো ধরনের গোলযোগ দেখা দিলেই এই কোম্পানিগুলো ব্যাপক মুনাফা তুলে নেয়। যেমনটা করেছিল কভিড-১৯ মহামারীর সময় এবং বিশ্বের শীর্ষ গম রফতানিকারক ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পরপর।
শক্তিশালী পণ্য রফতানিকারক দেশগুলোর নব্য উদারবাদ নীতি শিল্প উৎপাদনকে প্রাধান্য দিচ্ছে, যা দক্ষিণের দেশগুলোকে মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকিতে ফেলে খাদ্য আমদানিকারকে পরিণত করেছে।
আর্থিক শক্তি আমাদের চিন্তা শক্তিকেও কিনে নেয়, যা সর্বশেষ খাদ্যপ্রযুক্তির প্রশংসাতেই ব্যস্ত থাকে। উদাহরণস্বরূপ এখন যদি করপোরেশনগুলো ক্ষুদ্র ড্রোন দিয়ে কৃত্রিম পরাগায়ন ঘটাতে পারে, তাহলে সেই কীটনাশক মৌমাছির প্রজননকেও ধ্বংস করে দেবে। তবে তা নিয়ে আমাদের মোটেও চিন্তা করার দরকার নেই! কারণ সবকিছু এখন আমাদের কাছে শুধু ‘মূল্যের ব্যাপার‘! খরচ কমানোর জন্য আমরা সবকিছু করতে পারি!
এ ক্ষমতাধর করপোরেট শক্তির সর্বশেষ চেষ্টা হচ্ছে অধিকারভিত্তিক আন্তঃসরকার ব্যবস্থা থেকে বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিয়ন্ত্রণ দখলে নেয়া। ২০১০ সালে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম খাদ্য শাসনের জন্য একটি বহু স্টেকহোল্ডার পদ্ধতি চালু করেছে, যেখানে প্রত্যেক দেশের আসন রয়েছে। কিন্তু এই ফ্রেমওয়ার্ক শুনতে যত ভালো লাগে বাস্তবে ততটাই অকার্যকর। যখন বিভিন্ন চরিত্রের ভূমিকা, দায়িত্ব ও স্বার্থ উপেক্ষা করা হয় এবং ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতাকেও গুরুত্ব দেয়া হয় না, তখন করপোরেশনগুলো অনিবার্যভাবে দুর্বলদের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেয়ার সুযোগ পায়। আর এভাবেই সরকারের জবাবদিহিতা ও মানবাধিকার একপাশে পড়ে থাকে।
সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় করপোরেশনগুলোকে যোগদানের আমন্ত্রণ জানানোর মাধ্যমে মূলত শিল্প, রাসায়নিক ভারী মনোকালচারের পক্ষে পাল্লা ঝুঁকে পড়ে। নব্য উদারবাদী পদক্ষেপে এ আমন্ত্রণকে ন্যায়সংগত মনে করা হয়। কারণ তারা প্রচার করে, আমাদের খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য করপোরেট বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনকে কঠোরভাবে কাজে লাগাতে হবে।
বাস্তবে পৃথিবী সবার খাদ্য জোগাতে যথেষ্ট পরিমাণের চেয়েও বেশি খাদ্য উৎপাদন করে। কিন্তু সমস্যাটি হলো অসম প্রবেশাধিকার। যার জন্য প্রযুক্তিগত সমাধান নয়, প্রয়োজন রাজনৈতিক সমাধান। বিশ্ব খাদ্য উৎপাদনের বড় একটা অংশ উৎপাদন করেন ক্ষুদ্র কৃষকরা। যারা বিশ্ববাজারের পরিবর্তে স্থানীয় বাজারে তাদের শস্য বিক্রি করেন। এমন প্রান্তিক কৃষকদের সহায়তার জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন নীতি প্রয়োজন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কেন বহুজাতিক করপোরেশনগুলো তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায় এমন নীতি চিন্তা করবে বা সমর্থন করবে?
মাল্টিস্টেকহোল্ডারিজম বা বহু অংশীদারত্বে জোর দিয়ে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে আয়োজিত হয় দি ইউএন ফুড সিস্টেমস সামিট (ইউএনএফএসএস)। কৃষি খাদ্যসংশ্লিষ্ট করপোরেশন ও গেটস ফাউন্ডেশনের মতো প্রতিষ্ঠানের শক্তিশালী উপস্থিতি থাকলেও অংশগ্রহণ ছিল না জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর। জাতিসংঘের খাদ্যের অধিকারবিষয়ক বিশেষ দূত মাইকেল ফাখরির ভাষায়, মানুষের সত্যিকারের প্রয়োজনের আলাপ ছিল না এতে। এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল (সদ্য শেষ হওয়া) জুলাইয়ের শেষের দিকে এর ফলোআপ আয়োজনের পরিকল্পনা।
দুটো ইভেন্টেরই সমালোচনা করেছেন খাদ্য ব্যবস্থার কাঠামো বাছাইয়ের অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সিভিল সোসাইটি সংস্থা। তারা বরং ইউএন কমিটি অন ওয়ার্ল্ড ফুড সিকিউরিটির মতো প্লাটফর্মের পক্ষে। সংস্থাটি খাদ্য অনিরাপত্তা, ক্ষুধা ও বৈষম্যের কাঠামোগত কারণ অনুসন্ধানসহ বিভিন্ন সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করে।
সবার জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য কীভাবে নিশ্চিত করা যায় তা নির্ধারণ করা নাগরিকদের অধিকার এবং সরকারের কর্তব্য। যারা কেবল মুনাফা অর্জনের ওপরই জোর দিচ্ছে আলোচনার টেবিলে তাদের জায়গা দেয়া উচিত নয়।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
নোরা ম্যাককিওন: জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সিভিল সোসাইটি রিলেশনস বিভাগের সাবেক প্রধান। বর্তমানে রোমা ট্রে ইউনিভার্সিটি ও ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি কলেজ তুরিনে পড়ান।
ভাষান্তর: সাবিদিন ইব্রাহিম ও এমএসআই খান










