আমিনুর রসুল বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক ও নিরাপদ নৌপথ বাস্তবায়ন আন্দোলনের সদস্য সচিব। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা শেষে কর্মজীবন শুরু এনজিও সংস্থা ব্র্যাকে। তারপর কাজ করেন ড্যানিশ ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি, একশন এইডসহ খ্যাতনামা এনজিওতে। দীর্ঘ ৪২ বছর কাজ করেছেন উপকূলের জীবনমান নিয়ে। দ্বীপ এলাকাগুলোর নৌযোগাযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সরকারের সঙ্গে মধ্যস্থতা করছেন। বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন দেশের নৌপথের বিদ্যমান সমস্যা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আল ফাতাহ মামুন

পদ্মা সেতুর ফলে দেশের নৌযোগাযোগে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। যাত্রীবাহী নৌযানের সংখ্যা ক্রমেই কমছে। অনেক নৌপথ বন্ধ হয়ে গেছে। দেশের নৌযোগাযোগের ভবিষ্যৎ কী?

নদী মাতৃক একটি দেশের যোগাযোগ কেমন হওয়া উচিত? অবশ্যই নৌযোগাযোগ। অতীতে আমাদের ৯০ শতাংশ যোগাযোগ ছিল নৌপথকেন্দ্রিক। কিছু জায়গায় সড়ক যোগাযোগ ছিল। কালের বিবর্তনে তা উন্নত হয়েছে। সে তুলনায় নৌযোগাযোগ উন্নত হয়নি। এটি কমার পেছনে  দুটি প্রধান কারণ হলো—১. নৌযোগাযোগ খাতকে আমরা অবহেলার চোখে দেখে আসছি ২. সেবার চেয়ে ব্যবসার মানসিকতাই প্রাধান্য পেয়েছে। আমরা ভেবেছি, সড়কপথ উন্নত করলে বিদেশ থেকে গাড়ি আমদানি হবে, যারা আমদানি করেন তাদের লাভ হবে, যারা এটা ব্যবহার করেন তাদের লাভ হবে। এটা ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি। কিন্তু যোগাযোগকে যদি সেবা মনে করা হয়, তাহলে নদীমাতৃক দেশে প্রাধান্য পাওয়ার কথা ছিল নৌযোগাযোগ। আমরা সবাই জানি, কথায় কথায় বলিও—আমাদের ২৪ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ছিল। এখন সেটা শুষ্ক মৌসুমে ২ হাজার ৪০০ আর বর্ষা মৌসুমে চার হাজার কিলোমিটারে ঠেকেছে। আমরা যদি হিসাব মেলাই—গত ৫০ বছরে আমাদের কতটুকু নৌপথ ছিল আর কতটুকু সড়কপথ বেড়েছে? আকাশ-পাতাল পার্থক্য। এটা ঘটেছে মূলত ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে। 

অবহেলার কথা বললেন, ঠিক কী কারণে নৌপথ অবহেলার শিকার হয়েছে বলে মনে করেন?

নৌপথের পেছনে কোনো ব্যয় নেই। এজন্যই এটা সব সময় অবহেলিত। অথচ নদীকেন্দ্রিক যে ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি, সেটা আমাদের জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর সঙ্গে কৃষি, মৎস্য, যোগাযোগ বংশ পরম্পরায় চলে আসছে। কিন্তু এক ধরনের উন্নয়নের কথা বলতে গিয়ে আমরা নদীকে অবহেলা করেছি, নদীকে নদীর মতো চলতে দিইনি। পাশাপাশি এক ধরনের ভুল কনসেপ্টের বাঁধ দিয়ে নদী ধ্বংস করেছি। আমাদের যেহেতু উজান থেকে পানি আসত, সে প্রবাহ বন্ধ হওয়ার ফলে আমাদের প্রচুর নদী ধীরে ধীরে মরে গেছে। সেই সঙ্গে অভ্যন্তরীণভাবে আমরা নদীগুলো ধ্বংস করেছি। ফলে যেসব এলাকায় নৌযোগাযোগ ছিল সেগুলো বন্ধ হয়ে যায়। বিশেষজ্ঞরাও বলেন, যোগাযোগের তিনটি মাধ্যম—নৌ, সড়ক ও রেল। এর মধ্যে কম খরচ, পরিবেশবান্ধব ও হৃদ্যতাপূর্ণ ব্যবস্থা হলো নৌযোগাযোগ। হৃদ্যতা মানে অনেক মানুষ একসঙ্গে যাতায়াত করতে পারে, ফলে এখানে যাত্রীদের সঙ্গে সহানুভূতি, সুসম্পর্ক ও সহযোগিতার সুযোগ বেশি। নৌযোগাযোগ ছাড়া অন্য কোনো মাধ্যমে এত ফলপ্রসূ যোগাযোগের সুযোগ নেই। এ সংস্কৃতি দেশের নীতিনির্ধারকরা কখনো বোঝেননি। না বোঝার ফলে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি অন্য জায়গায় চলে গেছে। এর সঙ্গে বিদেশী ঋণদাতা থেকে শুরু করে যারা ব্যবসা করেন তাদেরও সম্পৃক্ততা আছে।

বড় বড় সেতু নৌপথ সংকোচনে প্রভাব ফেলেছে। নৌপথ বিশেষজ্ঞ হিসেবে আপনার মূল্যায়ন কী?

আমরা হঠাৎ করে লাভবান হতে চাই। আমাদের এ পর্যন্ত যে কয়টি সড়ক সেতু করা হয়েছে, পদ্মা সেতু সর্বশেষ—আমরা কখনো চিন্তা করিনি এ সেতুগুলোর কারণে নদীগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধু সেতুর ফিজিবিলিটি স্টাডিতে একবারও বলা হয়নি, সেতু নির্মাণের কারণে নদীপ্রবাহের গতিপথ ঠিক থাকবে কিনা। পলিগুলো যে পড়বে সেটা কোথায় যাবে? ফলাফল যা হয়েছে তা খুবই মারাত্মক। শুধু যে বঙ্গবন্ধু সেতু আশপাশের নদীগুলো ধ্বংস করেছে তা নয়, তার প্রভাব পড়েছে ঢাকার আশপাশের নদীগুলোর ওপরও। ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর প্রবাহ ধ্বংস করে দিয়েছে। যে কারণে ঢাকার অভ্যন্তরীণ নৌযোগাযোগ ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এর ফলে নদীগুলোর সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত ছিল, যেমন জেলে, কৃষিজীবী, বেদেগোষ্ঠী; তাদের জীবনে মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। এ শ্রেণীর প্রচুর লোকজন হারিয়ে গেছে, যা নিয়ে কোনো গবেষণা নেই। এমন বাস্তবতায় আমাদের ঐতিহ্য ধরে রাখার কথা বললাম। নদী, নৌযোগাযোগ, নদী পাড়ের জনগোষ্ঠী রক্ষার দাবি তুললাম। আমরা চেষ্টা করেছি বিষয়টি রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে তুলে ধরতে। যেহেতু রাষ্ট্র পরিচালনা করে রাজনৈতিক দল, আমরা চেষ্টা করেছি, সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কথা বলতে। কেউ কেউ এটাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। সরকারের গত মেয়াদে আমরা যখন এসব বিষয় নিয়ে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে কথা বলেছি, তারা বুঝতে পেরেছে আমাদের নদীগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। তখন প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দেন, তিনি আবার নদী ও নৌযোগাযোগ আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে চান। প্রথম দিকে ১০ হাজার কিলোমিটার নৌপথ খননের একটি কাজ চলমান রয়েছে। যদিও যেভাবে এটা হওয়ার কথা ছিল সেভাবে হচ্ছে না। এর প্রতিবন্ধকতা আছে।

নৌপথের জৌলুস হারানোর পেছনে নীতিনির্ধারকরা সঠিক পথে হাঁটতে পারেননি বলে মনে করেন কি?

নীতিনির্ধারকরা নৌযোগাযোগকে প্রাধান্য দিলেও যে বিষয়টি দৃষ্টিভঙ্গিতে আনতে পারেননি সেটা হলো, সাশ্রয়ী যোগাযোগ ব্যবস্থা। পণ্য পরিবহন থেকে শুরু করে সব কিছুই। সে দৃষ্টিভঙ্গিতে না করে চেষ্টা করা হয়েছে সড়কপথকে কীভাবে গুরুত্ব দেয়া যায়। কারণ এখানে সহজেই চমক দেখানো যায়। এটা যেমন নীতি নির্ধারকদের মাথায় ঢুকেছে, একইভাবে দাতাগোষ্ঠীরাও  ভেবেছেন। যার সঙ্গে ঋণপ্রবাহের একটা সম্পর্ক আছে। আমাদের কথা হলো, যে রুট পয়সা খরচ না করেই সচল রাখা যায়, সেটা না করে বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন এমন রুটে কেন যাওয়া হয়? এ নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম করছি, আমাদের এ চাপ কখনো বন্ধ হবে না। আমরা চেষ্টা করছি তাদের বোঝানোর জন্য—নদী মাতৃক দেশে নৌযোগাযোগ পুরনো ব্যবস্থায় যদি ফেরত না যায়, তাহলে পরিবেশ বিপর্যয় থেকে শুরু করে সব ধরনের বিপর্যয়ের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। 

আমাদের নৌযোগাযোগের সম্ভাবনা পুনরুদ্ধারের বিষয়ে আপনার ভাবনা বলুন। 

নৌযোগাযোগের পুরোপুরি সম্ভাবনা আছে। বিশেষ করে দ্বীপ এলাকাগুলোর পুরো যোগাযোগই নৌভিত্তিক। হাওর ও পাহাড়ি অঞ্চলেও সচল নৌপথ বিদ্যমান। যদি এসব এলাকায় নৌযোগাযোগের ব্যাপারে ইতিবাচক দৃষ্টি না দেয়া হয়, তাহলে এখানেও নৌযোগাযোগ ও নদীগুলো ধ্বংস হয়ে যাবে। আমরা এ ব্যাপারে কাজ শুরু করেছি। এরই মধ্যে অনেক জায়গায় কথা বলেছি।   নৌপথ ও নৌযোগাযোগ নিয়ে আমাদের আন্দোলন চলবে। নৌ-পরিবহন ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আমরা কথা বলে বারবার দাবি জানাচ্ছি, নৌপথগুলো যেন সচল থাকে। গত এক মাস বিভিন্ন চর-উপকূল ঘুরে দেখেছি, বরিশালে বিলাসবহুল যাত্রীবাহী লঞ্চগুলো চলে। পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা, হাতিয়া, সন্দ্বীপ, কুয়াকাটা, মনপুরা, কুতুবখালী ও মহেশখালীতেও নৌযোগাযোগের প্রাধান্য রয়েছে। হাওর অঞ্চলেও আগের মতোই নৌযোগাযোগ রয়েছে। ভারতের সঙ্গে আমাদের যে নৌযোগাযোগ প্রটোকল চুক্তি হয়েছে, নদী মাতৃক দেশ বলেই তারা এ চুক্তি করেছে। তাদের লক্ষ্য সাশ্রয়ী উপায়ে মালামাল পরিবহন। আমাদের প্রতিবেশী দেশ বুঝতে পেরেছে নৌযোগাযোগ সাশ্রয়ী মাধ্যম, কিন্তু নীতি নির্ধারকরা এখনো সেটা বুঝতে পারেননি। আমরা আশা করি, তাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হবে। যেটা বলছিলাম, উপকূলীয় অঞ্চলে লাখ লাখ মানুষ এখনো নদীপথ ও নদীর ওপর নির্ভরশীল। আমাদের অষ্টমবার্ষিকী পরিকল্পনা শেষ, নবম বার্ষিকী পরিকল্পনা শুরু হয়েছে, এখানে অবশ্যই নৌপথকে গুরুত্ব দেয়া উচিত। আমরা খুব আশাবাদী, আমরা নৌ-সেক্টরের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারাও চান, আমাদের নীতিনির্ধারকরা যেন নৌপথের সুদিন ফিরিয়ে আনার জন্য কার্যকরী উদ্যোগ নেন।

বলা হয়, তুলনামূলক ধীরগতির বলেই নৌযোগাযোগের আবেদন ফুরিয়ে এসেছে—আসলে কি তাই?

মোটেও তেমনটি নয়। এখন থেকে প্রায় ২০-২৫ বছর আগে, ১৯৮৪-৮৫ সালের দিকে ঢাকা থেকে বরিশাল যাওয়ার জন্য দ্রুত গতির একটি সার্ভিস শুরু হয়েছিল। মাত্র ৩ ঘণ্টায় বরিশাল যাওয়া যেত। তখনকার নীতি নির্ধারকরা বুঝতে পারেননি বলে তারা এটিকে বন্ধ করে দেন। তারা বলেছিলেন ঢেউ হয়, নদী ভেঙে যায়, আশপাশের নৌযানের ক্ষতি হয়; আসলে কথা সত্য ছিল না। আমরা এখনো ইচ্ছা করলে ৪ ঘণ্টায় যেতে পারি। এবার আমি হাতিয়া থেকে লঞ্চে উঠেছি বিকাল ৫টায়, ইলিশায় পৌঁছে যাই রাত সাড়ে ৯টায়। ইলিশা থেকে রাত ২টায় আমরা ঢাকা পৌঁছি। এজন্য স্পিড একটু বাড়িয়ে দিতে হয়েছে। আমার স্পিডবোট যদি ২০-২৫ মিনিটে চলে যেতে পারে, আমাদের এ জাহাজগুলোও যেতে পারে। সে ক্যাপাসিটি ওদের আছে। এজন্য শুধু নটিক্যালের জায়গাটায় পারমিশন নিতে হবে। এক্ষেত্রে দুটো কাজ করতে হবে। একটি হলো, আমাদের নৌপথটাকে ঠিক করতে হবে সবার আগে। কোথায় চর আছে, কোথায় বয়াবিকন নেই, লাইটিংয়ের সমস্যা আছে এগুলো ঠিক করলে সড়কপথে যে প্রতিযোগিতা, সেটা নৌপথেও হবে। এটা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে হয়। আপনি হংকং থেকে ম্যাকাও চলে যেতে পারবেন ৩ ঘণ্টায়। আমি নিজে এটা ভ্রমণ করেছি। এটা আমাদের জন্য সহজ ব্যবস্থা। নৌপথে যেতে সময় বেশি লাগে এটা অপপ্রচার। দ্বিতীয় যে কাজটা করতে হবে, দিনের বেলায় জাহাজ চলাচলের পারমিশন দিতে হবে। এখন কয়েকটা জাহাজ চলছে দিনের বেলায়। এখনো নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও দিনমজুররা নৌপথেই চলাচল করেন। সড়কপথে তারা যান না। কারণ খরচ দিয়ে তাদের পোষায় না। 

পদ্মা সেতু কি দেশের নৌপথের ওপর কোনো প্রভাব ফেলেছে বলে আপনি মনে করেন?

পদ্মা সেতুর কারণে যাত্রীবাহী জাহাজে প্রভাব পড়েছে এটা সত্য। কিন্তু কার্গো ভেসেলে কোনো প্রভাব পড়েনি। ১-২ শতাংশও নয়। আগে যদি বরিশাল থেকে ঢাকায় ১০টি যাত্রীবাহী লঞ্চ চলত, এখন পাঁচটি চলছে। অর্ধেক কমেছে। কিন্তু অন্যান্য জায়গায় যাত্রী আগের চেয়ে বেড়েছে। আমি হাতিয়ায় দেখেছি টিকিট পাওয়া যায় না। সেখানে এখন ১০টি লঞ্চ চলার মতো অবস্থা আছে। অন্তত ১০টি লঞ্চকে চলার অনুমতি দেয়া হোক। রুট পারমিট ছাড়া তো চালাতে পারবে না। অনুমতির বিষয়টি অবাধ করে দেয়া হোক। যে কেউ চাইলেই জাহাজ চালাতে পারবে। ফিটনেস ঠিক থাকলেই পারমিট দিয়ে দিন। সে চালাক। ওরা তো চায় দিনে চালাতে। আপনি জানেন সন্দ্বীপের কোনো যোগাযোগ ব্যবস্থাই নেই। মানুষ জীবনের ঝুঁকি নেয় অবৈধ যানবাহনে চলাচল করে। বিআইডব্লিউটিসির একটি জাহাজ দিনে একবার আসে আর যায়। অথচ দিনে ১০ বার চলতে পারে। হাতিয়ায় চলে সপ্তাহে দুই দিন মাত্র। প্রতিদিন চলতে পারে এত যাত্রী আছে হাতিয়ায়। শুভঙ্করের ফাঁকিটা কোথায় আমরা সবাই জানি। দুর্নীতিটা কোথায় আমরা জানি। সরকারি যানবাহন বেশি চললে বেসরকারি যানবাহন বেশি চলতে পারবে না। আর বেশি চলতে না পারলে কর্মকর্তারা টু পাইস কামাতে পারবে না। মূল ঘটনা এগুলোই। 

আপনি দীর্ঘদিন সন্দ্বীপের নৌযোগাযোগ নিয়ে কাজ করছেন। গবেষণার বড় একটা সময়ও এ জায়গা নিয়ে। আপনার পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে বলুন।

সন্দ্বীপটা হলো একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। খুব রিচ দ্বীপ। আপনি জানেন দেশের তৃতীয় বৃহৎ রেমিট্যান্স আসে এ দ্বীপের প্রবাসীদের থেকে। এখানের অভ্যন্তরীণ যে অবকাঠামো আছে, দেখে অবাক হতে হবে। একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ এত উন্নত হতে পারে? মনটা জুড়িয়ে যাবে সেখানে গেলে। লেখাপড়া থেকে শুরু করে সব দিকেই উন্নত। সন্দ্বীপের মানুষের একটাই দুঃখ—যোগাযোগ ব্যবস্থার ভঙ্গুর দশা। আর কিছু নয়। শতবছরেও নিরাপদ যোগাযোগ পায়নি সন্দ্বীপের বাসিন্দারা। স্বাধীনতার পর দুটো জাহাজ ছিল, সপ্তাহে চারদিন চলত। কিন্তু পশ্চিম দিকে চর পড়ে যাওয়ার পর নৌপথ বন্ধ হয়ে যায়। আগে ঢাকা থেকেও জাহাজ চলত, চট্টগ্রাম থেকেও চলত। পরে মেঘনা অববাহিকা দিয়ে যোগাযোগ শুরু হয়। পুরোটাই বেসরকারিভাবে। মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করে। যে কয়টা লঞ্চ বা স্পিডবোট চলে, এগুলো কোনোটারই পারমিশন নেই। সব অবৈধ। ইজারাদারের খেয়ালখুশিমতো চলে। এটার সঙ্গে টপ টু বটম একটা চেইন আছে যারা এটা নিয়ন্ত্রণ করে। এর লেনদেন কোটি কোটি টাকা। এক সময় জেলা পরিষদ ঘাট পরিচালনা করত। সম্প্রতি মামলার পর বিআইডব্লিউটিএর আন্ডারে চলে গেছে। কিন্তু এখনো সে আগের ইজারাদারের চেইন মেইনটেইন করে চলছে। আমরা এক্ষেত্রে বলতে চাই, ইজারা উন্মুক্ত করে দেয়া হোক। অনেক কোম্পানির সঙ্গে কথা বলেছি। তারা চাচ্ছে, যদি অনুমতি দেয়া হয়, দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা সার্ভিস দেয়ার জন্য প্রস্তুত আছেন। এটা করলে মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল করতে পারবে। আরেকটি বিষয় হলো, যে ক’টি ঘাট আছে সেখানে মানসম্পন্ন জেটি নেই। যে ক’টা জেটি বানানো হয়েছে সেগুলো লুটপাট ছাড়া আর কিছুই নয়। এ পর্যন্ত তিনটি জেটি নির্মাণ করা হয়েছে। এগুলোর ফিজিবিলিটি স্টাডি সেভাবে করা হয়নি। তিনটি জেটিই কান্ট্রি সাইড থেকে তৈরি করা হয়েছে, কিন্তু পলিবাহিত নদীর জন্য প্রয়োজন রিভার সাইড জেটি নির্মাণ করা। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে শুরু করে সবাই এ কথাই বলেছেন। ফলে শত শত কোটি টাকা সরকার জলে ফেলে দিয়েছে।