আবু আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক। বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদের চেয়ারম্যানের (২০০২-০৬) দায়িত্ব পালন করেন। দেশের শীর্ষস্থানীয় এ শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞ চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে সরকার মনোনীত পরিচালক ছিলেন। এছাড়া ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটের নির্বাচিত সদস্য ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন। পুঁজিবাজারের সংকট, সম্ভাবনা ও ২০২৩ সালের সার্বিক পারফরম্যান্স নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম ও পাপলু রহমান

পুঁজিবাজারের জন্য কেমন ছিল ২০২৩ সাল?

মোটেও ভালো ছিল না। ২০২৩ সালটা মূলত ফ্লোর প্রাইসের কারণে লেনদেন এক-তৃতীয়াংশে নেমে গেছে। আর এখানে কিছু জুয়া খেলার জন্য উর্বর জায়গা ছিল। বেশির ভাগই শেয়ার ফ্লোর প্রাইসে চলে গেছে। এজন্য ২০২৩ সাল পুঁজিবাজারের জন্য হতাশাজনক ছিল। নতুন পুঁজিও ওঠানো সম্ভব হয়নি। যারা এই মার্কেটে ছিল—মার্চেন্ট ব্যাংক, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি, তাদের মধ্যে অধিকাংশই নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। অনেকে টাকা হারিয়ে ফেলেছে, অনেকে প্রয়োজনে টাকা নিতে পারেনি। এ কারণে বাজারে নতুন টাকা আসেনি। অন্যদিকে ২০২৩-এর জুন থেকে আমাদের পলিসি রেট বাড়ল, তার সঙ্গে ঋণ ও আমানতের সুদহার দুটোই বেড়েছে। ঋণের সুদহার তো এখন ১২ শতাংশের বেশি। বেশি লক্ষণীয় সরকার ট্রেজারি বিলের সুদহার সাড়ে ১০ শতাংশ থেকে সাড়ে ১১ শতাংশ বাড়িয়েছে। যেখানে সরকার নিজেই সুদহার বাড়াচ্ছে, সেখানে বেসরকারি খাতে কেউ ঋণ নিলে তাকে বেশি অর্থ দিতে হবে। এর ফলে বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ হারাচ্ছেন। 

কিন্তু পুঁজিবাজারে আমরা যেটাকে চাঙ্গা ভাব বলি, সেটা নাই-বা হলো, তেজি ভাব (বুলস রান) না থাকলেও নরমাল ট্রেন্ডও ছিল না। এটা ফ্লোর প্রাইসের কারণে আরো ঘনীভূত হয়েছে। আশা করি সামনে এটি তুলে নেয়া হবে। কারণ চারদিক থেকে এটির ক্ষতির বিষয়ে অনেক লোক কথা বলছে।

ফ্লোর প্রাইস পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা আনতে পারেনি?

স্থিতিশীলতা তো আনেইনি বরং খারাপ করেছে। শেয়ারবাজারে ওঠানামা এটি স্থিতিশীল অবস্থা, যদি না এটি ক্রাশ করে। ক্রাশ না করলে এটি স্থিতিশীল। আর খুব বেশি সূচকের (ভলাটিলিটি) ঊর্ধ্বমুখী হলে এটি এক ধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরি করে। কিন্তু সূচকের ওঠানামা এটি স্বাভাবিক এবং এটি স্থিতিশীল। কিন্তু এটি ছিল না। 

স্পেকুলেশন বা ফটকা কারবারকে উৎসাহিত করেছে ফ্লোর প্রাইস?

হুম, ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণের ফলে ফটকা কারবার বেড়েছে। ফ্লোর প্রাইস না থাকলে যে ফটকা কারবার থাকত না—এমনটা বলব না। তবে ফ্লোর প্রাইস দেয়ার দেড় বছরে ফটকাবাজরা হেরে গেছে এমন উদাহরণ নেই। হেরে গেছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। শেয়ার কিনতে গিয়ে ফতুর হয়ে গেছেন তারা। কোনো কোনো উদ্যোক্তা যে ধরনের প্রিমিয়ামে শেয়ার বিক্রি করেছেন, ৫০/৬০ টাকার ওপরে সেগুলো ১০ শতাংশ লভ্যাংশ দিচ্ছে অথবা তারও কম দিচ্ছে। দিচ্ছে না এমনও আছে। তাহলে এত স্বপ্ন দেখিয়ে লোকজনকে দিয়ে কিনিয়ে কী লাভ হচ্ছে? তালিকাভুক্ত তিন শতাধিক প্রতিষ্ঠান এর মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশই জাংক শেয়ার। এসব কোম্পানি আর বিনিয়োগ করতে আসছে না। আগে থেকেই আশাহত হতে হচ্ছে। মাঝেমধ্যে সরকার পলিসি পরিবর্তন করছে। উদাহরণ হিসেবে বলি, এ বছরের জানুয়ারিতে হঠাৎ করে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন গ্রামীণফোনের ওপর সিম বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তাহলে কারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন? স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা। তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তারপর অবশ্য চার মাস পর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়েছে। এভাবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা জনস্বার্থের বিষয়টি খেয়াল না করে শুধু করতে হবে বলে করে ফেলছে। আমি আরেকটি বিষয় দেখি, কোথায় ট্যাক্স বেশি পাবে সেটি লক্ষ করে শুধু। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কথা চিন্তা করে না। এ রকম বহু ঘটনা ঘটেছে। 

মিউচুয়াল ফান্ডের অবস্থা বলুন, এটি কি ঠিকঠাক আছে?

মিউচুয়াল ফান্ডের কথা বলি, বিশ্বব্যাপী এটি খুব জনপ্রিয়। আমরা বলতাম, যারা বেশি ভ্যালুয়েশন জানে না, অতটা ফান্ডামেন্টাল ও অ্যানালাইসিস জানে না এবং যাদের কোম্পানি সম্পর্কে খোঁজখবর রাখা কঠিন, তাদের জন্য উপযোগী হলো মিউচুয়াল ফান্ড। কিন্তু বাংলাদেশে এখানেও প্রতারণা। এক মিউচুয়াল ফান্ডের বড় কর্তা টাকা-পয়সা নিয়ে ভেগে লন্ডন চলে গেছে। সব জালিয়াতি। এখন অবস্থা হয়েছে এ বছর জুনে সমাপ্ত হিসাব বছরে কোনো মিউচুয়াল ফান্ড শূন্য, কেউ দশমিক ৫, কেউ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ লভ্যাংশ দিয়েছে। তারা অসহায়। আমি এজন্য তাদের দোষ দিচ্ছি না। কারণ ফ্লোর প্রাইস থাকার কারণে তারা এ বছর কেউ কিছু করতেও পারেনি। এজন্য মিউচুয়াল ফান্ডের ওপরও কেউ আর আস্থা রাখছেন না। মিউচুয়াল ফান্ডে টাকা দিতে গিয়ে মানুষ আরো গরিব হয়েছে। 

বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও স্টক এক্সচেঞ্জের চ্যালেঞ্জ কোথায়?

তারা ফ্লোর প্রাইসের পরিণাম নিয়ে যথাযথভাবে চিন্তা করতে পারেনি। তারা খুব তড়িঘড়ি করে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করে ফেলেছে। এতে ক্ষতি হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা অর্থ মন্ত্রণালয়ের তদারকিতে কাজ করে। অর্থ মন্ত্রণালয় আবার বাজেট প্রণয়ন করে, ট্যাক্স-সংক্রান্ত ইস্যু ঠিক করে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা মন্ত্রণালয়ে হয়তো বাজারের পক্ষে কিছু সাজেশন বা সুপারিশ পাঠায়। কিন্তু মনে হচ্ছে, সেগুলো যেন অন্ধ-বধিরদের কাছে পাঠানো হচ্ছে। তারা দেখে কিন্তু সেটি ফলপ্রসূ হয় না। 

ভালো কোম্পানি পুঁজিবাজারে উৎসাহিত হচ্ছে না। ভারতে ইউনিলিভার ও নেসলে দুটোই তালিকাভুক্ত কোম্পানি। তাদের শীর্ষ ১৫টি কোম্পানির মধ্যে এ দুটি রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে তারা নেই কেন? এখানেও তারা বড় অংকের ব্যবসা করছে কিন্তু পরিশোধিত মূলধনের সামান্য মালিকানাও নেই দেশের জনগণের। এর কারণ হলো আমাদের তারা বোকা মনে করে। আর আমাদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা, অর্থ মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় তাদের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে কখনো জোর দিয়েছে বলে মনে হয় না। অথচ এটি গভীরভাবে জনগণের আগ্রহের সঙ্গে জড়িত। আমার শেয়ারবাজারের স্বার্থ জড়িত। ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত করতে না পারলে তো ভালো পুঁজিবাজার হবে না। যেটি আমি অনেক আগে থেকে বলে আসছি। এই ইউনিলিভার তালিকার বাইরে রয়েছে। আমরা সমানে নেসলে নুডলস খাচ্ছি, কিন্তু সেটা তালিকায় নেই কেন? পুঁজিবাজারে যে ১০ শতাংশ আইপিও শেয়ার ছাড়ার কথা ছিল নেসলে তো ১ শতাংশও করেনি। যদি পুঁজিবাজারে ১০ শতাংশ শেয়ার ছাড়ত দেশের মানুষের মালিকানা বাড়ত এবং সরকারের প্রাপ্য শুল্কও বাড়ত। ওষুধ কোম্পানির মধ্যে কয়টি বিদেশী কোম্পানি আছে? তারা কেউ আসেনি। গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইন কোম্পানি এসেছিল, তারা ব্যবসা বন্ধ করে চলে গেছে। তাদেরই কিছু প্রডাক্ট ইউনিলিভার কিনে ভোগ্যপণ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। কিন্তু আসল ইউনিলিভারটি নেই। এজন্য বাংলাদেশের যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে, সে তুলনায় স্টক মার্কেটের উন্নতি হয়নি। 

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন বিশ্বের ৩৫তম বৃহত্তম অর্থনীতি। আমাদের অর্থনীতির আকার বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুঁজিবাজার সম্প্রসারণ হয়নি কেন?

আমাদের এখানে আসলে পুঁজিবাজারকে গুরুত্বসহকারে নেয়া হয়নি। বরং যে সুযোগ-সুবিধা ছিল সেগুলো তুলে নেয়া হয়েছে। এখন কেউ তালিকাভুক্ত হতে আগ্রহী নয়। এজন্য এটা বড় হচ্ছে না। শুধু বাজার মূলধন আমাদের জিডিপির ১৫ শতাংশের কাছাকাছি। ভারতে যা ৩৩ শতাংশের বেশি আর যুক্তরাষ্ট্রে তো আরো বেশি। এশিয়ায় বাজার মূলধনে আমরা সর্বনিম্ন স্তরে থাকা দেশগুলোর সারিতে অবস্থান করছি। এর অর্থটা কী? আমাদের অর্থনীতি এগিয়েছে কিন্তু পুঁজিবাজার পিছিয়েছে। 

পুঁজিবাজারকে এগিয়ে নিতে করণীয় কী?

পুঁজিবাজারকে সুন্দর সিস্টেম বা ব্যবস্থাপনার মধ্যে আনতে হবে। সুন্দর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতে প্রণোদনা দিতে হবে। ভালো কোম্পানিকে জোর করে শেয়ারবাজারে আনা যাবে না। ভালো কোম্পানি আনতে হলে তাদের মতামত শুনতে হবে, প্রণোদনা দিতে হবে। তাদের জিজ্ঞাসা করতে হবে, কী সুবিধা পেলে তারা শেয়ারবাজারে আসবে? একটি কোম্পানি ব্যবসা করছে ২ হাজার কোটি টাকার, অথচ দেশের জনগণের কোনো মালিকানাই তাতে নেই। আমরা তাদের পণ্য কিনছি। পৃথিবীর কোথাও এভাবে বাজার অর্থনীতি দাঁড় করানো হয়নি। এজন্য এ অর্থনীতি কিছুটা এগিয়ে থমকে যাবে। ব্যাংকের অর্থ ও বড় তহবিল দিয়ে বেশি দূর এগোনো যাবে না। গত সাত-আট বছরে সরকার যেসব অবকাঠামো বাস্তবায়ন করেছে, সেগুলো থেকে টোল আদায় করছে। ঠিক আছে টোল সংগ্রহ করছে, এটি অনেক আগে থেকে হয়ে আসছে। কিন্তু এগুলোকে কোম্পানি করে মার্কেটে তালিকাভুক্ত করা হয়নি। আমি উদাহরণ দিচ্ছি, মুম্বাই এয়ারপোর্ট অথবা হিথরো এয়ারপোর্ট—এগুলো তালিকাভুক্ত কোম্পানি। এয়ার ইন্ডিয়া যেটি বিক্রি করা হয়েছে, এটি এখনো তালিকাভুক্ত কোম্পানি। তাহলে? আমাদের দেশে এটা আছে? আমরা এয়ারপোর্টটাকে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ফেলে দিয়েছি, এভাবে আসলে মুক্ত বাজার অর্থনীতি চলে না। 

সরকারি সহায়-সম্পত্তি যদি অকার্যকর করে রাখা হয়, তাহলে এটি দেশের জন্য ক্ষতি। দেশের লোকজন জানেও না, বিদেশে বড় বড় এয়ারপোর্ট কোম্পানি করে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। আমলাদের দোষ দিই না। আমলারা চাকরি করেন, তারা ট্রান্সফার হয়ে যান। অনেকের অতটা জ্ঞানও নেই। কিন্তু উচ্চ পর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের থেকে এটি আসতে হবে। স্টক মার্কেট বিস্তৃত করা, অংশগ্রহণমূলক করা ও মধ্যবিত্তদের বিনিয়োগের সুযোগ দেয়ার জন্য তারা নীতি গ্রহণ করবেন। মধ্যবিত্তরা শুধু জমি কিনবে, সঞ্চয়পত্র কিনবে, ফ্ল্যাট কিনবে এটি দুর্বল পলিসি। আমরাই আসলে তাদের জমি কেনা, ফ্ল্যাট কেনা, সঞ্চয়পত্র এসবের দিকে ধাবিত করেছি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য এগুলো ভালো পলিসি নয়। ফ্ল্যাট কিনে, জমি কিনে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটানো সম্ভব না। এজন্য ব্যবসা প্রয়োজন। ব্যবসার একটা বিরাট অংশ পুঁজিবাজারে যেতে হবে। সব শ্রেণী যেন সেখানে বিনিয়োগ করতে পারে। 

যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন ফাউন্ডেশন শেয়ারবাজারে রয়েছে। আমাদের সরকার একটি পেনশন ফান্ড করেছে। বিদেশে কিন্তু পেনশন ফান্ড শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে। সরকার যদি এটি বিনিয়োগ করতে আসে, কোথায় করবে? যেসব কোম্পানিতে এই ফান্ড বিনিয়োগ করলে লাভ হতো বা নিরাপদ থাকত সেগুলো তো নেই এখানে। একেবারে যে নেই, তা বলব না, কিছু আছে। এসব নিয়ে সরকারকে চিন্তা করতে হবে এবং সমন্বয় দরকার। এ ইস্যুগুলো তারা বুঝতেই চায় না। আমি বহু দেখেছি। 

আমাদের তো অনেক চেম্বার অব কমার্স রয়েছে, তারা তো উদ্যোগ নিতে পারে?

দেশে যে এত চেম্বার অব কমার্স আছে তারা পুঁজিবাজারে কেন জোর দেয় না তা মাথায় আসে না। ব্যাংকগুলোকে আর কত শোষণ করবেন? ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসায়ীরা খেলাপি হচ্ছে। মনে হচ্ছে, তারা ঋণ খেলাপি হতে ভালোবাসে। ব্যাংকগুলোও এ সুযোগ করে দিচ্ছে। পুঁজিবাজারে এসেও তারা বিনিয়োগকারীদের ঠকাচ্ছে। প্রিমিয়ামে ৭৫ টাকা শেয়ার কিনে এখন সেটি ৫০-৬০ টাকায়ও বিক্রি করা যায় না। তার পরও তো কিছু জবাবদিহির বিষয় রয়েছে। এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থার সম্মতি থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলো চার-পাঁচজন মিলে জুমের মাধ্যমে এজিএম করে ফেলছে। এটি ছোট ইস্যু নয়। জুমের মাধ্যমে কি বলা যায়? বক্তব্য ও কাউন্টার বক্তব্যে যাওয়া যায় না। আমি এতে অংশ নিই না। তাদের দায়িত্ব হলো, সবাইকে ডেকে একটি হিসাব নিয়ে ঘণ্টা দুয়েক আলোচনা করা। এটা তো তারা করে না। এখানে যদি বাংলাদেশ ব্যাংক এত দুর্বলতা দেখায়, তাহলে তো চলবে না। কিছু ব্যাংকের অবস্থা তো শোচনীয়। এটি হতো না, যদি পরিচালনা পর্ষদ নিজেদের স্বার্থ না দেখে ব্যাংকের স্বার্থ দেখত। কিছু ব্যাংক আদৌ ব্যবসা করতে পারে কিনা আমি জানি না। তাদের আস্থার ঘাটতি দেখা গেছে। 

রাজনীতির জটিলতার মধ্যে ২০২৪ সাল আসছে। নতুন বছরে পুঁজিবাজার নিয়ে আপনি কী আশা রাখেন?

আমি আশাবাদী। তবে রাজনৈতিক সংকট আমাদের বেকায়দায় ফেলেছে। অর্থনৈতিক সমস্যা নতুন করে দেখা দিয়েছে। যেমন ধরুন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে গেছে। আমরা উচ্চ মূল্যস্ফীতি, উচ্চ সুদহারের দিকে চলে গেলাম। এগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক সংকট, এটি কিন্তু এক নম্বর। যদি একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতো, তাহলে সংকট হয়তো কেটে যেত। আর এখন যেভাবে নির্বাচন হচ্ছে, এটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এটি নিয়ে বিদেশীদের পাশাপাশি বিরাট সংখ্যক জনগোষ্ঠী নির্বাচন গ্রহণ করতে চাইবে না। এ নিয়ে কথা চলতেই থাকবে। 

আরেকটি কথা বলতে চাই, মানবাধিকার, ভালো নির্বাচন, কথা বলার অধিকার, শ্রম আইন এগুলো একসঙ্গে জড়িত। এগুলোর জন্য প্রয়োজন জবাবদিহিতা। আজকে বড় বড় দুর্নীতিবাজকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা যাচ্ছে না। সরকার যদি সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হতো, তাহলে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হতো। সরকার নিজেও দায়িত্বশীল হতো এবং যারা অর্থনীতিতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে তাদেরও ধরত। দুর্ভাগ্যক্রমে দুর্নীতিবাজরা মনে করে যে তারা নিরাপদ আছে, তাদের সঙ্গে ওপর মহলের আশীর্বাদ রয়েছে। এটি অর্থনীতির জন্য খুবই খারাপ। 

তাহলে আপনি আশাবাদী কীভাবে?

সরকার যদি নির্বাচনটা গ্রহণযোগ্য করতে পারে, তাহলে আশাবাদী হওয়া যায়। আর আশাবাদী না হয়ে তো উপায় নেই। পিসিমিজমের মধ্যে যদি আমরা পড়ে যাই, তাহলে তো গেলাম। অতটা আশাও করি না। কারণ এরই মধ্যে আমাদের কেউ ঋণ দিচ্ছে না। আবার রেটিং এজেন্সিগুলো (মুডি’স, এসঅ্যান্ডপি ও ফিচ) তারা প্রত্যেকে আমাদের ঋণমান নামিয়ে দিয়েছে। এর অর্থ হলো কেউ ঋণ দিতে চাইবে না, দিলেও উচ্চ সুদহার, আগেই নগদ ডলার দিতে হবে। এটা তো আমাদের জন্য ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই যে মানবাধিকারের ইস্যু এটিও বারবার আসতে থাকবে। সরকার কেন এ ঝুঁকি নিতে গেল এটা বুঝে আসে না। আমার মনে হয় না পশ্চিমারা মানবাধিকারের প্রশ্ন ভুলে যাবে। সংলাপের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতায় পৌঁছানো দরকার ছিল। এটা না হওয়ার কারণে চারদিকে হতাশা দেখা দিয়েছে।