মাহ্দী আমিন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা। তিনি দলের ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির সদস্য এবং ৩১ দফা নিয়ে দেশব্যাপী কর্মশালায় ছুটে চলেছেন। বিএনপির বিভিন্ন পলিসি নিয়ে তিনি কাজ করছেন, যার লক্ষ্য রাজনীতিতে তারুণ্যের ক্ষমতায়ন ও তৃণমূলের সম্পৃক্ততা। সংস্কার, নির্বাচন ও রাজনীতির নানা প্রসঙ্গ নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম
বাংলাদেশ জাতীয়বাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার দেশে ফেরা ঘিরে বিভিন্ন মহলের উচ্ছ্বাস, আনন্দের বহিঃপ্রকাশ দেখা গেছে। বাংলাদেশের চলমান রাজনীতিতে কী বার্তা দিচ্ছে?
বেগম খালেদা জিয়া আপসহীন নেত্রী ও মাদার অব ডেমোক্রেসি রূপে এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছেন যে তিনি কেবল বিএনপির নেত্রী নেই। বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী প্রতিটি ব্যক্তি ও রাজনৈতিক দলের নেত্রী হয়ে উঠেছেন। তিনি পরিণত হয়েছেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্রের বাস্তবসম্মত প্রতীকে। সুতরাং তাকে কেন্দ্র করে বিএনপির বাইরে পুরো দেশে আবেগ, আকাঙ্ক্ষা, অনুভূতি কাজ করছে এবং এটিই স্বাভাবিক। যে কারণে আমরা দেখেছি, তিনি দেশে ফেরার দিন দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি অনেক সাধারণ মানুষ রাস্তায় আনন্দ মিছিলে শামিল হয়েছে। প্রত্যেকের ইচ্ছা ছিল দেশের নেত্রীকে, তার পরিবারের সদস্যকে অন্তত একবার কাছ থেকে দেখা। এ আবেগ, আকাঙ্ক্ষায় আমরা গণতান্ত্রিক পথপরিক্রমায়, গণমানুষের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে জনগণের রাষ্ট্রীয় মালিকানা পুনরুদ্ধার করব।
বেগম জিয়ার আগমনের মধ্য দিয়ে কি বিএনপির নির্বাচনী কর্মযজ্ঞ শুরু হতে যাচ্ছে? কবে নাগাদ আপনারা নির্বাচন প্রত্যাশা করছেন?
বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে বলা হয়েছিল যে আগামী ডিসেম্বরের মধ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। যদিও পরবর্তী সময়ে বলা হয়েছে আগামী বছরের জুনের মধ্যে নির্বাচন হতে পারে। বিএনপির অবস্থান এক্ষেত্রে সুস্পষ্ট। আমরা চাই এবং জনগণেরও আকাঙ্ক্ষা এ বছরের মধ্যে যেন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কারণ গণ-অভ্যুত্থানের একটি মূল উদ্দেশ্যই ছিল এমন এক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা যেটি পরিচালনা করবে জনগণের নির্বাচিত সরকার। কাজেই যত দ্রুত আমরা নির্বাচনে যেতে পারব, ততই দেশের জন্য মঙ্গল হবে। পাশাপাশি দেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটবে। নির্বাচনের আগে পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকার তাদের রুটিন কাজগুলো করবে। আমাদের দলের পক্ষ থেকে সরকারকে রোডম্যাপ দিতে বলা হয়েছে যেখানে প্রতিটি কাজ সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সময় ও নির্ধারিত লক্ষ্যের কথা উল্লেখ থাকবে। যার মাধ্যমে আমরা আরো বাস্তবসম্মত উপায়ে তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে পারব—কোন কাজ কতটুকু সম্পন্ন হয়েছে বা কতটা এগিয়েছি।
বিএনপির প্রস্তাবিত ৩১ দফা সংস্কার পরিকল্পনা ২০২২ সালে তৈরি করা হয়েছে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর এসে এর প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছে। এ সমালোচনা ঘিরে কী মত আপনার?
গণ-অভ্যুত্থানের পর যেসব সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে তার মৌলিক ভিত্তি ৩১ দফা, যা ২০২২ সালে ২৭ দফা হিসেবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে প্রণয়ন করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ২০২৩ সালে যুগপৎ আন্দোলনে শরিক সব রাজনৈতিক দলকে একটা প্লাটফর্মে এনে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে ৩১ দফা প্রণীত হয়েছিল। যে কারণে ৩১ দফায় সব রাজনৈতিক দলের মতামতের প্রতিফলন ঘটেছিল। আজকের ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে কথা হচ্ছে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা, নির্বাহী বিভাগ ও আইন সভার মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি, সংস্কার কমিশন গঠন ইত্যাদি নিয়ে। এসবের মৌলিক ভিত্তি ওই ৩১ দফায় রয়েছে। এর অর্থ হলো, ৩১ দফা বর্তমান প্রেক্ষাপটেও প্রাসঙ্গিক। আমরা গৌরবের সঙ্গে বলতে পারি, বাংলাদেশের সংস্কারের প্রধান প্রস্তাবক বিএনপি।
২০১৬ সালে আমাদের দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ভিশন ২০৩০ নির্ধারণ করেছিলেন। এ ভিশনে বিস্তারিত ফ্রেমওয়ার্ক উল্লেখ ছিল বাংলাদেশে সংস্কার বা রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের যার মাধ্যমে আমরা এমন একটা রাষ্ট্র গড়ে তুলতে সক্ষম হব যেখানে ফ্যাসিবাদ কায়েম হবে না। অর্থাৎ স্বৈরশাসন বা ফ্যাসিবাদ কায়েম না হওয়ার বিষয়টি আজ থেকে নয় বছর আগে বিএনপি জাতির সামনে তুলে ধরেছিল। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২২ সালে ২৭ দফা ও ২০২৩ সালে ৩১ দফা প্রণয়ন করা হয়, যার মূল দফাগুলো আজও প্রাসঙ্গিক। হয়তো পদ্ধতিগতভাবে কিছু ভিন্নতা রয়েছে। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ বা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রাষ্ট্রপতির ভারসাম্য কীভাবে হবে—এ ধরনের ভিন্নতা রয়েছে এবং এটাই স্বাভাবিক। গণতন্ত্রের সৌন্দর্যও এটা—ভিন্ন মত ও ভিন্ন পথ থাকবে। সবাই যদি এক বিষয়ে একইভাবে চিন্তা করে তাহলে সেটা নিশ্চয় গণতন্ত্র নয়। তাই গণতান্ত্রিক সৌন্দর্য তথা ভিন্ন মত ধারণ করে, ৩১ দফাকে মৌলিক ভিত্তি হিসেবে সঙ্গে নিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।
৩১ দফার প্রথম দফার শেষ অংশে বলা হয়েছে, ‘আলোচনা, মতবিনিময় ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে ভবিষ্যৎমুখী এক নতুন ধারার সামাজিক চুক্তিতে পৌঁছতে হবে।’ যদিও অভিযোগ রয়েছে, নানা সংস্কার কমিশন বা জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি দ্বিমত পোষণ করছে বিএনপি। এটা কেন হচ্ছে?
অভিযোগটা সঠিক নয়। যারা সংস্কার বা জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে রয়েছেন তারা প্রকাশ্যে বিএনপিকে অ্যাপ্রিশিয়েট (প্রশংসা) করেছেন। কারণ তাদের সঙ্গে বসে বিএনপি বেশ বিস্তারিতভাবে মতামত জানিয়েছে। আর এ মতামত দলের মধ্যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই চূড়ান্ত করা হয়েছে।
যেহেতু বর্তমান বাংলাদেশে সংস্কারের প্রস্তাবক, ধারক ও বাহক বিএনপি, নীতিগতভাবে সংস্কারকাজ যেন দ্রুত ও যথাযথভাবে হয়, সেই আগ্রহ সবচেয়ে বেশি বিএনপির। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি পর্যালোচনা করা দলও বিএনপি। যে সংস্কার প্রস্তাবগুলোয় বিএনপি একমত, সেগুলো জানানো হচ্ছে। আর যেগুলোয় একমত নয়, সেগুলো কারণসহ বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। এটাকে আলাপচারিতার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার চর্চা বলা যায়।
এক ব্যক্তির একাধিক পদ বা দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী না থাকা এসব ক্ষেত্রে বিএনপির দ্বিমত আছে বলে শোনা যায়। বিএনপির আসলে অবস্থান কী এক্ষেত্রে?
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিএনপি সবার আগে এসব প্রস্তাব দিয়েছে। ক্ষমতার ভারসাম্যের কথাও সবার আগে বিএনপিই বলেছিল। সুতরাং আমরাই জাতির সামনে সর্বপ্রথম এ প্রস্তাব উপস্থাপন করেছি। হয়তো বর্তমানে কেউ কেউ ভিন্নভাবে মতামত পোষণ করছেন যে পর পর দুইবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর আর তিনি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না। একটা দেশে যখন বড় ধরনের সাংবিধানিক পরিবর্তনের কথা বলা হয়, সেটি ঐতিহাসিক বা সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট থেকেই বেশি আলোচিত হয়। বাংলাদেশে আমরা ওয়েস্টমিনস্টার পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসির অনুসরণ করি না। যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, কানাডা, ভারত বা পাকিস্তান কোথাও কতবার প্রধানমন্ত্রী হতে পারবে—এ নিয়ে ধরাবাধা নিয়ম নেই। তার পরও যখন ফ্যাসিবাদী শাসন মাথা চাড়া দিয়ে উঠল, শেখ হাসিনা নিজ ক্ষমতা ধরে রাখতে নজিরবিহীনভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম-খুন করতে থাকলেন, সে সময় একটা উদারতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের নেতা হিসেবে তারেক রহমান প্রস্তাব করলেন, পর পর দুইবারের বেশি কেউ প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না। আমরা একটি আপডেটেড ওয়েস্টমিনস্টার মডেল তৈরি করতে চাচ্ছিলাম, যাতে জনগণ চাইলে সর্বজন গ্রহণযোগ্য দলকে দ্বিতীয়বারের জন্য নির্বাচিত করার সুযোগ পান। এতে একদিকে যেমন নেতৃত্ব তৈরির সুযোগ থাকবে, অন্যদিকে দেশের মানুষ এক টার্ম গ্যাপ দিয়ে যদি কাউকে মূল্যায়ন করতে চান সেটি করতে পারেন।
আমরা দেখেছি ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতা ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছে। বিএনপি এ তরুণ প্রজন্মের জন্য এবং তরুণ প্রজন্মকে আকৃষ্ট করতে, বিশেষত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে কী ধরনের নীতি নেবে?
তারুণ্যের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করেই সর্বপ্রথম তারেক রহমান কোটা ব্যবস্থা সংস্কার আন্দোলনের কথা বলেছিলেন। ২০১৩, ২০১৪ সালে যখন কেউ এ নিয়ে কথা বলেননি, তিনি বলেছিলেন যে বাংলাদেশে কোটা ৫ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত নয়। তারুণ্যের আকাঙ্ক্ষা ধারণ করেই তিনি ২০১২ সাল থেকে কর্মসংস্থানের কথা বলে আসছেন এবং তিনি এ নিয়ে তরুণদের জন্য সরকারি, বেসরকারি ও বিদেশে জনশক্তি রফতানির ক্ষেত্রে বিস্তারিত নীতি নিয়েছেন, যাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায়। এজন্য আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটা মৌলিক সংস্কার আনা হবে। বর্তমানে শিক্ষা ক্ষেত্রে বাংলা ও ইংরেজি ভাষার প্রচলন আছে। এটিকে আরো এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় একটি ভাষা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হবে। বিশেষত যে ভাষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সরাসরি সংযোগ রয়েছে, সেই ভাষার প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। হয়তো সেই ভাষা শিক্ষা সর্বোচ্চ লেভেলের হওয়াটা বাধ্যতামূলক না, কিন্তু তারা যেন নির্দিষ্ট দেশে গিয়ে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে সেটি নিশ্চিত করা হবে। এতে সেসব দেশে আমাদের জনগণের কর্মপরিধি বাড়বে। এটা তারেক রহমানের সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনাগুলোর মধ্যে একটি।
এর বাইরে ব্যক্তিগত ও পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য শিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন কারিকুলাম যুক্ত করার কথা তিনি বলেছেন। এ কারিকুলামে নৈতিক শিক্ষা থাকবে। কীভাবে সামাজিক সেবা দেয়া যায়, কমিউনিটির প্রতি দায়বদ্ধ থাকা যায় সেগুলো নিয়ে কাজ করার সুযোগ থাকবে, যাতে আমাদের শিক্ষার্থীদের সত্যিকার অর্থে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা যায়। পাশাপাশি সহশিক্ষায় তিনি জোর দিয়েছেন। সেটা হতে পারে স্পোর্টস বা সাংস্কৃতিক চর্চা। এ ধরনের কারিকুলামের প্রচলন হলে অনেক কর্মসংস্থান তৈরি হবে। একটা উদাহরণ যদি দিই—প্রাথমিকভাবে আমরা যদি দেশে পাঁচটা ভাষা প্রচলনের কথা চিন্তা করি, তাহলে হাজার হাজার শিক্ষকের প্রশিক্ষিত করতে হবে।
তারেক রহমান আরেকটি কথা খুব দৃঢ়ভাবে বলেছেন, বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে শিশু-কিশোরদের যারা শিক্ষা দেন, অর্থাৎ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা ও সামাজিক মর্যাদা বাড়াতে হবে। এজন্য যে উদ্যোগ নেয়া দরকার, আমরা নেব।
স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যেভাবে পল্লী চিকিৎসা নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিলেন, সেই ধারাবাহিকতা ভবিষ্যতে বিএনপি সরকারের সময় চালু রাখা হবে। স্বাস্থ্যসেবা কর্মী হিসেবে নারীদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে, যাতে গ্রামীণ নারীদের ক্ষমতায়ন করা যায়। এছাড়া স্বাস্থ্যসেবার কাঠামোর বিকেন্দ্রীকরণ করতে চাই, যাতে মানুষকে প্রাথমিক চিকিৎসা বা স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য শহরমুখী না হতে হয়। ইউনিয়ন পর্যায়ে তারা স্বাস্থ্যসেবা পেতে পারেন। শিক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও এ বিকেন্দ্রীকরণ ব্যবস্থা অনুসরণ করা হবে।
বিএনপির মহাসচিব সম্প্রতি এক বিৃবতিতে এক কোটি কর্মসংস্থান ও ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি তৈরির পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। কীভাবে এটা সম্ভব করবে বিএনপি?
বিএনপির বিকেন্দ্রীকরণ নীতি বা অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের মূলে রয়েছে কর্মসংস্থান সৃষ্টি। আমরা যদি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী প্রশিক্ষিত জনশক্তি পাঠাতে পারি তাহলে সংখ্যাটি অনেক এগিয়ে নেয়া যাবে। ফিলিপাইনের মডেল অনুসরণ করে যদি বিদেশ গমনের ক্ষেত্রে দক্ষ নারীদের সংখ্যা বাড়াতে পারি তাহলে এ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। এক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি হলো প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জনগণের দক্ষতা বৃদ্ধি। সেজন্য ভোকেশনাল শিক্ষার ওপর জোর দেয়া হবে, যাতে বিদেশে দক্ষ জনশক্তি রফতানি করা যায়।
এর বাইরে প্রযুক্তি খাতে সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর অবারিত সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। এর সঙ্গে আউটসোর্সিং, ফ্রিল্যান্সিংয়ের সংখ্যা বাড়াতে পারি। এজন্য প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত কীভাবে বিভিন্ন টেকনিক্যাল সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো যায় তা নিয়ে কাজ করা হবে। পাশাপাশি আমাদের অবকাঠামো, জ্বালানি ও জাতীয় উন্নয়নের কাজ করতে হবে। তবে আমাদের প্রধান লক্ষ্য, উদারনৈতিক অর্থনীতির চর্চার মাধ্যমে বেসরকারি খাতের বিকাশ ঘটাতে চাই।
সর্বোপরি সরকারি, বেসরকারি খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। উদ্যোক্তা গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে তরুণ উদ্যোক্তাদের সুরক্ষায় কীভাবে এসএমই ঋণের প্রবাহ বাড়ানো যায়, তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেয়া যায়, বাজারে তাদের প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করতে পারি—এগুলোর জন্য নীতি-কৌশল প্রণয়ন করা হবে। তারেক রহমান অনেকবার বলেছেন যে আমরা অ্যামাজন বা আলিবাবার মধ্যে একটা হাব তৈরি করতে পারি, যেখানে ছোট ছোট কুটির শিল্প হাব থাকবে এবং আমরা তা রফতানি করতে পারব।
কৃষি রফতানিও আমাদের একটি সম্ভাবনাময় বড় খাত। কৃষি থেকে সেভাবে বর্তমানে রফতানি হচ্ছে না। এটা আমাদের বাজার ব্যবস্থার অন্যতম সমস্যাগুলোর একটি। উদ্বৃত্ত ফসল নষ্ট হয়ে যায় যথাযথ সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে। অথচ হিমাগারের মাধ্যমে ফসল সংরক্ষণ করে রফতানির অবারিত সুযোগ আমাদের রয়েছে। এজন্য নীতি কাঠামো প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় এটা করা হবে।
বাংলাদেশের অনেক মেধাবী তরুণ-তরুণী সুযোগের অভাবে বিদেশে চলে যাচ্ছেন। আমরা যদি উপযুক্ত পলিসি গ্রহণ করতে পারি তাহলে ব্রেইন ড্রেইনকে ব্রেইন সার্কুলেশনে রূপান্তর সম্ভব।
জুলাই অভ্যুত্থানের পরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কিছুটা বিভাজন পরিলক্ষিত হয়েছে। এর মধ্যে তরুণদের নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক দলও গঠন হয়েছে। নতুন রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে সমঝোতা বা সংহতির কোনো প্রস্তাব আছে কিনা বিএনপির তরফ থেকে?
এক ধরনের গণতান্ত্রিক সংহতি সব রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে থাকবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা। কারণ আমরা সবাই মিলে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়েছি। আমরা সবাই ফ্যাসিবাদবিরোধী ও বাংলাদেশপন্থী শক্তি বলে মনে করি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, যখন দেশের মানুষের অধিকার ও স্বাধীনতা, দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন, ফ্যাসিবাদবিরোধিতার প্রশ্ন সামনে আসবে, আমরা গণতান্ত্রিক নিয়ম মেনে আবার সবাই এক ছাতার নিচে অবস্থান নেব। আজকের বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদবিরোধী বলেই এখানে ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শের দল রয়েছে। গণতন্ত্রের প্রশ্নে সবাই ঐকবদ্ধ থাকলে গণমানুষের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ গণ-অভ্যুত্থানের গণ-আকাঙ্ক্ষা, সাম্য, মানবাধিকার, সামাজিক সুবিচার ও আত্মমর্যাদার মাধ্যমে আমরা বেঁচে থাকতে পারব।
বিগত সরকারের আমলে আমরা দেখেছি যে এক অলিগার্ক গোষ্ঠী দেশের অর্থনীতিতে লুটপাট চালিয়েছে। বিএনপি অলিগার্কদের বিরুদ্ধে কী ধরনের নীতি নেবে?
বিএনপি অনেক আগে থেকেই বলে আসছে, প্রতিটি খাত ধরে ধরে দুর্নীতির শ্বেতপত্র তৈরি করা হবে। দুর্নীতির ধরন ও এর মাত্রা তুলে ধরা হবে। আওয়ামী লীগের আমলে তথাকথিত উন্নয়নের নামে অলিগার্ক শ্রেণী গড়ে তোলা হয়েছে।
বিএনপি তৃণমূলের ক্ষমতায়নের দল। আমরা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশকে পরিবর্তন করতে হলে তৃণমূলের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে হবে। আমাদের নেতা তারেক রহমান যত দিন দেশে ছিলেন, তিনি বাংলাদেশের প্রান্তিক পর্যায়ের জনগোষ্ঠীর কাছে গিয়েছেন এবং বর্তমানে লন্ডনে থেকেও তিনি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছেন। আমরা চেষ্টা করব কোনোভাবেই যেন এ দেশে অলিগার্ক শ্রেণী গড়ে না ওঠে এবং উন্নয়নের সুফল নিয়মতান্ত্রিকভাব দেশের তৃণমূলে পৌঁছানোর।
এ কারণেই বিএনপির ৩১ দফা ও রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি সব শ্রেণী-পেশার মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন, সমস্যা সমাধান তথা অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন।
বিএনপির বিরুদ্ধে বিভিন্ন জায়গায় চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। বিএনপি এটা নিয়ে কি অস্বস্তিতে আছে বা কীভাবে বিষয়টা মোকাবেলা করছে?
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপি একমাত্র দল যে অভিযোগ পাওয়া মাত্র তদন্ত করেছে এবং সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছে। আমাদের প্রায় দুই হাজারের মতো স্থগিতাদেশ রয়েছে, বহিষ্কার আদেশ রয়েছে। এর অর্থ হলো, কেউ যদি অনৈতিক বা দলের শৃঙ্খলা পরিপন্থী কাজ করে, বিএনপি তার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে পিছপা হয় না। এক্ষেত্রে আমরা সাংগঠনিকভাবে কঠোর অবস্থানে রয়েছি। পাশাপাশি এও সত্য যে অনেক সময় অতিরঞ্জিত ও অসত্য অভিযোগ করা হয়। প্রপাগান্ডা ক্যাম্পেইন চলছে যার একটি লক্ষ্য বিএনপিকে বিতর্কিত করা। এ কারণেই অনেকের লুণ্ঠিত সম্পদ বা ব্যবসা পুনরুদ্ধার করতে গেলে তাকে চাঁদাবাজি বলা হচ্ছে। বিএনপির নাম ব্যবহার করে অন্যান্য দলের নেতাকর্মী ও পতিত স্বৈরাচারের দোসররা এ ধরনের অপকর্মে লিপ্ত হচ্ছে। এরই মধ্যে বিএনপির কঠোর সাংগঠনিক অবস্থান চলমান রয়েছে।
সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে শত্রুতা নয়—এটা ষাটের দশকের একটা পররাষ্ট্র নীতি। বর্তমানে এটা কতটুকু প্রযোজ্য? বিএনপির পররাষ্ট্রনীতি কী হবে?
সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখা অবশ্যম্ভাবী। বিএনপির পররাষ্ট্রনীতি হলো সবাই বন্ধু, কিন্তু কোথাও কোনো প্রভু নেই। সুতরাং আমাদের বিদেশনীতির মূল হলো সবার আগে বাংলাদেশ। আমাদের লক্ষ্য অন্য দেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক যেন বন্ধুত্বপূর্ণ হয়, যেখানে সমতা ও ন্যায্যতা থাকে, পারস্পরিক স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব বজায় থাকবে। বিএনপি বরাবর এটাকেই প্রাধান্য দিয়ে আসছে। সেই সঙ্গে প্রাধান্য দিয়েছে যেন বহির্বিশ্বের সঙ্গে স্থিতিশীলতা বজায় থাকে এবং সুন্দর পরিবেশ বজায় থাকে যার ভিত্তি হবে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ যেখানে সমতা, ন্যায্যতা, বাকস্বাধীনতা, আইনের অনুশাসন, মানবাধিকারকে মৌলিক ভিত্তি করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে এগিয়ে নেয়া হবে।
মানবিক করিডোর নিয়ে বিএনপির কী মত?
আমাদের নেতা তারেক রহমান স্বয়ং বলেছেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত গণতান্ত্রিক সরকার ও সংসদের থেকে আসা উচিত। বাংলাদেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার দিয়ে এবং জনমত নিয়ে এ ধরনের নীতি নেয়া উচিত। অন্তর্বর্তী সরকারের এ সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার নেই বলেই আমরা মনে করি।










