সংস্কৃতি এক বিরাট ও ব্যাপক আলোচনার বিষয়। স্বল্পপরিসরে সংস্কৃতি বিষয়ে বুঝিয়ে বলা অসম্ভব। সংস্কৃতির ব্যাপক পরিধির মধ্যে যে বিষয়গুলো সাধারণত বিবেচিত, তার মধ্যে মানুষের সামাজিক ও ধর্মীয় জীবন, শিল্প, সাহিত্য, সংগীত, ক্রীড়া প্রভৃতি অন্যতম। নৃতাত্ত্বিক বিচারে এ ধারণা জটিলতর হলেও সংস্কৃতির সঙ্গে আরো যুক্ত হয় মানুষের জ্ঞান-বিজ্ঞান, আচার-আচরণ, চিরায়ত প্রথা, সামষ্টিক মনোভাব এবং বোধ ও বিশ্বাস প্রভৃতি। বঙ্গীয় জনপদে নানা জাতি ও গোষ্ঠীর হাজার বছরের নানা নৃ-বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়েই সংস্কৃতি বিনির্মিত। নানা শ্রেণী, ধর্ম ও বর্ণের মিলন, দূরত্ব, নৈকট্য এবং পারস্পরিক বোঝাপড়াসহ পরস্পরবিরোধী মনোভাব সত্ত্বেও সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ ও সম্পর্ক স্থাপনের বৈশিষ্ট্যসূচক যে রীতিনীতি বিকশিত হয়েছে তা-ই বঙ্গীয় সংস্কৃতি। বঙ্গীয় জনপদ ও গণমানুষের এ রীতিনীতি বাংলা ভাষাভাষীদের সংস্কৃতি এমনকি বাঙালি সংস্কৃতিরূপে পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত।
একসময় একে ‘কৃষ্টি’ নামেও অভিহিত করার প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার সমকালে সংস্কৃতির পরিবর্তে কৃষ্টি শব্দটিকে মেনে নিতে পারেননি। তার ভাষায়, ‘কৃষ্টি কথাটা হঠাৎ তীক্ষ্ণ কাঁটার মতো বাংলা ভাষার পায়ে বিঁধেছে। চিকিৎসা করা যদি সম্ভব না হয় অন্তত বেদনা জানাতে হবে। ওই শব্দটা ইংরেজি শব্দের পায়ের মাপে বানানো। এতটা প্রণতি ভালো লাগে না।’ প্রসঙ্গত একই প্রবন্ধের অন্যত্র তিনি আরো বলেন, ‘ইংরেজি ভাষার কাছে আমরা এমন কী দাসখৎ লিখে দিয়েছি যে তার অবিকল অনুবর্তন করে ভৌতিক ও মানসিক দুই অসবর্ণ অর্থকে একই শব্দের পরিণয়-গ্রন্থিতে আবদ্ধ করব?’ বৈদিক সাহিত্যের ‘আত্মসংস্কৃতির্বাব শিল্পানি’ শ্লোক উদ্ধৃত করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এও বোঝাতে চেয়েছেন যে, সংস্কৃতির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক সুপ্রাচীনকালের। এরপর তিনি ওপরে বর্ণিত ‘কৃষ্টি’ ও ‘সংস্কৃতি’ শব্দের দৃষ্টান্ত সহযোগে নিম্নরূপ ব্যবহার উপস্থাপন করেন: ‘সংস্কৃত চিত্ত, সংস্কৃত বুদ্ধি ‘কালচারড মাইন্ড, কালচারড ইন্টেলিজেন্স’ অর্থে কৃষ্টচিত্ত কৃষ্টবুদ্ধির চেয়ে উৎকৃষ্ট প্রয়োগ সন্দেহ নেই। যে মানুষ কালচারড তাকে কৃষ্টিমান বলার চেয়ে সংস্কৃতিমান বললে তার প্রতি সম্মান করা হবে।’ তবে সংস্কৃতির সঙ্গে আমাদের নিত্য বসবাস ও সর্বদা শ্বাসবায়ু গ্রহণ-নির্গমন করলেও অতীতে সংস্কৃতিকে আমরা ততটা সচেতনভাবে চর্চায় রাখিনি। বিশাল বায়ুমণ্ডলে বাস করে আমরা যেমন বাতাসের অস্তিত্ব ভুলে বসে থাকি ঠিক যেন তেমনি। আমাদের নিত্যদিনের জীবনযাপন, চলাফেরা, মানুষের সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্কে-সূত্রে যোগাযোগ স্থাপন ও যোগযোগ স্থাপনের কৌশলের মধ্যেও আমরা আমাদের সংস্কৃতিরই প্রকাশ ঘটিয়ে থাকি। বলাবাহুল্য যে আমাদের সাংস্কৃতিক প্রকাশভঙ্গি অন্যান্য জাতি থেকে স্বতন্ত্র।
যখন বাঙালির শাশ্বত সংস্কৃতির ওপর আঘাত এসেছিল তখন থেকেই আমাদের সংস্কৃতিকে আমরা সচেতনভাবে উপলব্ধি শুরু করি। আর্যদের আগমনের পর থেকে যতবার বহিরাগতরা এ ভূমিতে এসেছে আমাদের ভূমিজ সংস্কৃতি ততবারই নানাভাবে আক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু জাতীয়ভাবে তা প্রতিরোধের ইতিহাস তেমন রক্তাক্ত নয়। কিন্তু সর্বশেষ ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের ফলে পাকিস্তান সৃষ্টির পর পশ্চিম পাকিস্তানিদের নানা ধরনের আক্রমণ ও আগ্রাসনের ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক জগতের ন্যায় সাংস্কৃতিক জগৎও অস্থির হয়ে উঠেছিল। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক শাসন ও শোষণের হাতিয়ার ছিল সংস্কৃতি। তারা বাঙালির সংস্কৃতির ওপর হেনেছিল তীব্র আঘাত। উর্দুকে বাঙালির মাতৃভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেয়ার মাধ্যমে তারা তাদের সেই প্রকল্প শুরু করেছিল। সেদিন থেকেই পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধেও শুরু হয়েছিল বাঙালির প্রতিবাদ ও আন্দোলন। যার পরিণতি ঘটে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে। এর পর থেকে বিভিন্ন ইস্যুতে পাকিস্তানের বিরোধিতা করতে করতে সচেতনভাবে আমরা আমাদের স্বাজাত্যবোধকে যেমন সংহত করেছি তেমনি সাংস্কৃতিক চেতনাকেও করেছি সমৃদ্ধ। অর্থাৎ পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে সমগ্র সময়জুড়ে বাঙালির সব আন্দোলন ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনাবোধও শাণিত হয়েছে। পরাধীনতা শৃঙ্খল থেকে বাঙালির মুক্তির আকাঙ্ক্ষা নস্যাৎ করার লক্ষ্যে পাকিস্তানি শাসকরা তাদেরই মনগড়া অদ্ভুত এক ধর্ম ও ইসলামী সংস্কৃতি এ দেশে প্রবর্তনের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সচেতন বাঙালি তা মেনে নেয়নি। পাকিস্তানিদের এরূপ ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলিষ্ঠ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। এ বিষয়ে তার হুঁশিয়ারি ছিল—‘ধর্ম ও জাতীয় সংস্কৃতির নামে আমাদের সংস্কৃতিকে ধ্বংসের চেষ্টা করা হয়েছে। বাংলা সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এ চক্রান্ত আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতি বিকাশে অন্তরায় সৃষ্টি করেছে। কিন্তু আমাদের জনগণ এ চক্রান্ত প্রতিহত করেছে। [...] বাংলা ভাষা ও বঙ্গ সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার জন্য জাতীয় পুনর্গঠন ব্যুরো স্থাপন করা হয়েছে। পাকিস্তান বেতার এবং টেলিভিশনও এ ষড়যন্ত্রের দোসর। তারা রবীন্দ্রসংগীত প্রচার বন্ধ করে দিয়েছিল এবং আজও এ ব্যাপারে উঁচু মহলে জোর আপত্তি রয়েছে। জনগণ তাদের ভাষা ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এ চক্রান্ত সহ্য করবে না।’ পাকিস্তানিরা এ দেশে রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করেছিল বটে, কিন্তু তার ফল হয়েছিল বিপরীত। আমরা উপলব্ধি করি যে রবীন্দ্রচর্চাও বাঙালির সংস্কৃতিচর্চার অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছিল।
যা-ই হোক, ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ এ কালপর্বে বাঙালির রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক চেতনার যে বিকশিত রূপ আমরা দেখি তা বাঙালির ইতিহাসে আর কোনো কালপর্বে দেখা যায় না। সংস্কৃতির এ জাগরণই ১৯৭১ সালে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। সাংস্কৃতিক এ জাগরণের পশ্চাতে আবার ভাষা আন্দোলনই ছিল অন্যতম নিয়ামক। বঙ্গবন্ধু তাই বলেছিলেন, ‘বাহান্নর ভাষা আন্দোলন শুধু বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আদায়ের আন্দোলন ছিল না, এ আন্দোলন ছিল বাংলার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির আন্দোলন।’
সংস্কৃতির আরেক রূপ আমরা প্রাত্যহিক জীবনে অনুভব করি। ধর্মীয়, পারিবারিক, সামাজিক এমনকি ব্যক্তিগত জীবনের বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসবে আমরা নানা আয়োজন সম্পন্ন করি। রুচিভেদে, স্থান-কাল ও পাত্রভেদে এ আয়োজনের ভিন্নতা কিংবা স্বাতন্ত্র্যও স্পষ্ট হয়। আমাদের সামাজিক জীবনে বিনোদনের লক্ষ্যে এবং কখনো-বা সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকি। স্কুল-কলেজেও অনুরূপ আয়োজনে সংগীত, নৃত্য, বাদ্য, আবৃত্তিসহ বিচিত্র রূপ পরিবেশনামূলক অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। আমাদের বর্তমান আলোচনার বিষয় শিল্প ও সাহিত্যকেন্দ্রিক সংস্কৃতিচর্চা তথা আনুষ্ঠানিক বা পরিবেশনামূলক প্রায় অনুরূপ সংস্কৃতির পূর্বাপর নিয়ে। আনুষ্ঠানিক সংস্কৃতি বলতে এরই মধ্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, বিভিন্ন দল, গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানে সাধারণত পরিবেশনামূলক যে ধরনের সংস্কৃতিচর্চা দেখা যায় তাকেই বোঝানো হয়েছে। সাম্প্রতিককালে সংখ্যায় স্বল্প হলেও এ দেশে এখনো শিল্প-সাহিত্য, ক্রীড়া এবং সংস্কৃতিচর্চার নিমিত্ত পাড়া-মহল্লায় গঠন হয়ে থাকে সামাজিক নানা সমিতি বা সংঘ। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে যেখানে ক্রীড়া, সংগীত ও চারুকলাসহ, ললিতকলার বিভিন্ন বিষয়ে চর্চা ও শিক্ষাদান করা হয়। যদিও এ সংখ্যা সারা দেশেই হাতেগোনা কয়েকটি মাত্র। এসব প্রয়াসের সঙ্গে জাতীয় মূল্যবোধের সংস্কৃতির সংযোগ ও সম্পর্ক থাকলেও এর বাণিজ্যিক প্রসার একেবারেই শূন্য। এ ধারার সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে যারা যুক্ত তাদের সম্পর্কে বাংলায় ‘ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো’-এর মতো জুতসই একটি প্রবাদও প্রচলিত হয়েছে! অর্থাৎ এ কথা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বাঙালির তথা বাংলাদেশের সংস্কৃতি হাজার বছরের ঐতিহ্যগুণে সমৃদ্ধ হলেও এ সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে অর্থযোগের সম্পর্কটি ধ্রুপদীকালের ট্র্যাজিক নিয়তিকেও হার মানায়! সুতরাং অকপটেই বলা যায়, বাংলাদেশের মূলধারার সংস্কৃতির বাজারেও নিত্য মন্দা বহমান। বর্তমানে যেকোনো নাট্যদলের একটি মঞ্চনাটক প্রযোজনায় মহামন্দার ঋণজর্জরিত এ অবয়ব আমাদের বিব্রত ও হতাশ করে।
আবার নয়া জমানার নয়া গণমাধ্যমের (নিউ মিডিয়া) মাথায় ভর করে যে ধরনের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাজারে চাপিয়ে দেয়া হয় তা আমাদের ঐতিহ্যিক রীতি ও নৈতিক আদর্শের সঙ্গে যথাযথ মিথস্ক্রিয়ায় উদ্ভূত নয় বটে; কিন্তু তা প্রবল আগ্রাসী, আবেশী ও মোহাবিষ্টকারী! একে চলতি বাংলায় তুচ্ছার্থে ‘বাজাইরা সংস্কৃতি’ বললেও হয়তো মন্দ বলা হবে না। কেননা এ জাতীয় সাংস্কৃতিক পণ্য মুহূর্তেই বাজার সয়লাব করে! ‘বাণিজ্যে বসতি লক্ষ্মী’—সুতরাং সরস্বতী (শিল্পগুণ কিংবা রবীন্দ্রনাথের ভাষায় সংস্কৃত চিত্ত, সংস্কৃত বুদ্ধি কালচারড মাইন্ড, কালচারড ইন্টেলিজেন্স এতে না থাকলেও) অর্থেরও আগমন ঘটে! ফলে, সংস্কৃতিচর্চার নামে বাজারে যে মিথ্যা ও ভার্চুয়াল কালচার বা সংস্কৃতির আগ্রাসন (এর সঙ্গে সিনথেটিক কালচারকে মেলানো যাবে না) চলছে তার সঙ্গে আমাদের মৌলিক সংস্কৃতিচর্চার ব্যবধান অনেক দীর্ঘ।
আমাদের জীবনযাত্রায় সম্প্রতি ‘ভাইরাল’ নামক সাংস্কৃতিক নয়া এক প্রত্যয়ের উদ্ভব ঘটেছে। এই ভাইরাসের প্রভাবে এবং নয়া মাধ্যমের কল্যাণে কেউ কেউ বাজারে কল্পনাতীত সাফল্য পেলেও সেখানে একদিকে ঐতিহ্যিক শূন্যতা যেমন অনুভূত, অন্যদিকে তেমনি রুচিগত মেজাজের অনুপস্থিতি পীড়াদায়ক ঘটনারও জন্ম দেয়। ফলে মূলধারার সংস্কৃতিকে সচল, সক্রিয় ও বহমান রাখার জন্য যারা জীবনপাত করেন তাদের পেশার বদলে নেশাকে সম্বল করেই যুক্ত থাকতে হয়। পুনশ্চ বলে রাখা ভালো যে ভাইরাল সংস্কৃতির ন্যায় ভোক্তা কিংবা ব্যবসায়িক মহলে ‘সিন্ডিকেট’ও এক ধরনের সাংস্কৃতিক প্রত্যয়ে পরিণত হতে চলেছে! অর্থাৎ ব্যবসায়িক মহলসৃষ্ট এ সিন্ডিকেট কর্তৃক সংস্কৃতিকে আকণ্ঠ গ্রহণের ফলে শুরু হয়েছে ভোক্তা সম্প্রদায়ের যন্ত্রণাদগ্ধ অনিঃশেষ জীবনসংগ্রাম! ভাইরাল ও সিন্ডিকেট শব্দ দুটি সর্বসাধারণের জীবনে সর্বক্ষণ এখন ‘নৈরাজ্যকর’ ও ‘ত্রাহি’ সংস্কৃতির দৌরাত্ম্য সৃষ্টিতে ব্যস্ত! প্রযুক্তিনির্ভর ভার্চুয়াল সংস্কৃতির আগ্রাসনে আমাদের যৌথ ও যূথবদ্ধ জীবন ব্যবস্থা ভেঙে সেখানে একাকীত্ব তথা নৈঃসঙ্গ সংস্কৃতির আবেষ্টন তৈরি হচ্ছে। এক সময় মানুষ দলবেঁধে নাটক-সিনেমা উপভোগে যেত। তথ্যপ্রযুক্তি হাতের মুঠোয় সেসব এনে দেয়ায় ভোক্তা এখন ভার্চুয়ালি মিলিয়ন বিলিয়ন হলেও সশরীরে একা ও নিঃসঙ্গ! এতে অন্তরের সম্পদ কতটুকু সে প্রশ্নও আছে।
আমরা বাঙালির মৌলিক সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত ঘটালেও আলোচনার কেন্দ্রে থাকিনি। নানা সামাজিক উৎপাতের জন্য শুধু সংস্কৃতি কেন কোনো আলোচনারই কেন্দ্রে নিবিড় মনোযোগ দেয়া কারো পক্ষে সম্ভব নয়। সামাজিক যোগাযোগের যে সংস্কৃতি সাম্প্রতিককালে ব্যাপৃতি লাভ করেছে তার মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর আবেশায়ন থেকে আমাদের আত্মরক্ষার উপায় কম, নেই বললেই চলে। ‘ভার্চুয়াল’ জগতের মধ্য থেকে ‘একচুয়াল’ তথ্য পাওয়া কঠিন। সঠিক ও যথার্থ বার্তা-বিভ্রান্তিতে কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমের দ্বারাও এক ধরনের নিপীড়নের সংস্কৃতি জন্ম নিচ্ছে। আমরা এরই মধ্যে যেন নিত্য নিপতিত হয়ে চলেছি। এ অপবার্তার পেছনেও থাকতে পারে সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব। মিথ্যা তথ্য পরিবেশন সংস্কৃতির সঙ্গে পূর্বোক্ত ভাইরাল ও সিন্ডিকেট সংস্কৃতি সক্রিয়। এ সংস্কৃতির অনিশ্চিত যাত্রার চূড়ান্ত পরিণতি আমরা জানি না। আবার এর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সাম্প্রতিকের জীবন নির্বাহ কষ্টকল্পনা মাত্র! এ এক উভয় সংকট! রবীন্দ্রনাথের গানের ভাষায়: ‘জড়ায়ে আছে বাধা, ছাড়ায়ে যেতে চাই, ছাড়াতে গেলে ব্যথা বাজে’। সংস্কৃতির এক মহাবিভ্রান্তির যুগ আমরা অতিক্রম করছি সন্দেহ নেই! ঐতিহ্যিক সংস্কৃতির মন্দা বাজারের বিপরীতে নয়া যুগের নয়া সংস্কৃতি কী বাজারমূল্যে সাধারণ গ্রহণ করে তা দেখার প্রত্যাশায় আছি।
ড. আহমেদ আমিনুল ইসলাম: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়










