সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের পর বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার ওমান। তবে দেশটি গত বছরের ৩১ অক্টোবর থেকে বাংলাদেশী নাগরিকদের ভিসা দেয়া বন্ধ ঘোষণা করে। কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশী প্রবাসীরা বিপুল টাকা খরচ করে ওমানে গিয়ে ঠিকমতো কাজ পান না। অভিবাসীরা প্রতিশ্রুত কাজ না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে রাস্তাঘাটে এমন সব কাজ করতেন, যা দেশটির প্রচলিত আইনে বিধিসম্মত নয়। অনেকে বাধ্য হয়ে অনৈতিক কাজেও জড়িয়ে পড়েন। ওমানের একটি সূত্র জানায়, ভিসার এসব অপব্যবহার রোধ করতে ওমান কর্তৃপক্ষ ভিসা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। যদিও সম্প্রতি সে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে তারা। এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা যেন পুনরায় না আসে সে বিষয়ে সরকারের তৎপরতা প্রয়োজন। কর্মসংস্থান যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে বৈধভাবে দক্ষ কর্মী পাঠাতে সচেষ্ট থাকতে হবে। তবেই ওমানের শ্রমবাজার ধরে রাখা সম্ভব হতে পারে।
বণিক বার্তার প্রতিবেদন অনুযায়ী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, নার্স, শিক্ষক, হিসাবরক্ষক ভিসা, বিনিয়োগকারী ভিসা এবং সব ধরনের অফিশিয়াল ভিসাসহ ১২ ক্যাটাগরিতে দক্ষ লোক নেয়ার পাশাপাশি ৯৬ হাজার বাংলাদেশী অভিবাসীকে বৈধতা প্রদানের আশ্বাস দিয়েছে ওমান কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে অবৈধ অভিবাসীদের জরিমানা মওকুফের বিষয়ে মৌখিকভাবে সম্মতি জানিয়েছে।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, আগে অল্পসংখ্যক প্রবাসী ওমানে কর্মসংস্থানের জন্য পাড়ি জমালেও ২০০৮ সাল থেকে বাংলাদেশী অভিবাসীদের জন্য বড় গন্তব্য হয়ে ওঠে। গত বছর ভিসা স্থগিত করার আগে ১০ মাসে অন্তত ১ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশী ওমানে যান। ওমানে কর্মরত অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশী কর্মী সর্বোচ্চ। বর্তমানে প্রায় ১০ লাখ বাংলাদেশী দেশটিতে কাজ করছেন।
শুধু কর্মক্ষেত্রই নয়, দেশটি প্রতি বছর গড়ে ১ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্সের বড় উৎস। গত বছর যখন দেশটির শ্রমবাজার বন্ধ ঘোষণা করা হয়, তখন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, যে সংকট এখনো চলমান। ওই সময় ভিসা স্থগিত করার ফলে অভিবাসী ও রেমিট্যান্স খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। আশা করা যায়, পুনরায় শ্রমবাজার খুলে দেয়া সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে সহায়ক হবে। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সংকট বিবেচনায় সরকারের ওমানের শ্রমবাজার ধরে রাখার বিষয়ে মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন।
এর আগে ২০১২ সালে বাংলাদেশী শ্রমিকদের জন্য ভিসা কার্যক্রম স্থগিত করেছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত। দীর্ঘ নয় বছর বন্ধ থাকার পর ২০২১ সালে দেশটি ভিসা প্রক্রিয়া আবার চালু করে। চলতি বছর মে মাসে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চতুর্থবারের মতো বন্ধ হয়েছে। এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে অবৈধ অভিবাসন ও অদক্ষ শ্রমিকের কথা। বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অধিকাংশ কর্মী তুলনামূলকভাবে কম দক্ষতাসম্পন্ন, অর্থাৎ কায়িক শ্রমে যুক্ত হয়। ফলে বেশি কর্মী পাঠিয়েও রেমিট্যান্স অর্জনের পরিমাণ কম।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) বিশ্ব অভিবাসন প্রতিবেদন ২০২৪ অনুযায়ী, অভিবাসীর উৎস দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ। যদিও রেমিট্যান্স আয়ের দিক থেকে অষ্টম। অন্যদিকে অভিবাসী শ্রমিক পাঠানো ও রেমিট্যান্স আয়ের ক্ষেত্রে পাকিস্তান যথাক্রমে সপ্তম ও ষষ্ঠ এবং ফিলিপাইন যথাক্রমে নবম ও চতুর্থ স্থানে রয়েছে। এ তথ্য স্পষ্টভাবে জানায় যে বিপুলসংখ্যক জনশক্তি বিদেশে পাঠানোর পরও দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ কম। ২০২২ ও ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে ১০ লাখের বেশি মানুষ প্রবাসে গেলেও রেমিট্যান্সের প্রবাহ ২১-২২ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এর পেছনে অন্যতম কারণ অদক্ষ জনশক্তি রফতানি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুসারে, সংশ্লিষ্ট কাজে কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই বিদেশ পাড়ি জমাচ্ছেন দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ কর্মী। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিদেশে গেছেন ১১ লাখ ২৬ হাজার ৬০ কর্মী। তাদের মধ্যে ৭ লাখ ৪১ হাজার ৮৮ জন অর্থাৎ ৭৭ শতাংশ কর্মীই গেছেন অদক্ষ হিসেবে। যদিও বিদেশের শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তি রফতানির লক্ষ্য নিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ১০৪টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) ও ছয়টি ইনস্টিটিউট অব মেরিন টেকনোলজি (আইএমটি)। সার্বিকভাবে শ্রমবাজার ধরে রাখার কথা বিবেচনা করলে মোটাদাগে বৈধ পথে দক্ষ কর্মী প্রেরণের বিকল্প নেই। জনশক্তি রফতানি ও রেমিট্যান্স আয়ে প্রবৃদ্ধি করতে হলে দক্ষ কর্মী পাঠানো অতি আবশ্যক। তাছাড়া সম্প্রতি ওমানও কেবল দক্ষ কর্মীকে ভিসা প্রদানের কথাই উল্লেখ করেছে।
জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের অতি গুরুত্বপূর্ণ খাত হলো দক্ষ জনশক্তি রফতানি। প্রবাসে কর্মীদের দক্ষতা অনুযায়ী আয়ের পরিমাণ নির্ধারণ হয়ে থাকে। তাদের আয় বাড়লে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহও বাড়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। দেশে ক্রমান্বয়ে সরকারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বেড়েছে। কিন্তু সে অনুপাতে কেন দক্ষ কর্মীর সংখ্যা বাড়েনি তা খতিয়ে দেখা দরকার। প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার মূল্যায়ন ও নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগী দেশগুলোর দক্ষ কর্মীদের অংশীদারত্ব বাড়ছে। শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ ও সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনে সরকারকে বাজার চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় জোর দিতে হবে। পাশাপাশি জোর দিতে হবে অবৈধ অভিবাসন রোধে। তবেই হয়তো অভিবাসীদের প্রতিশ্রুত কাজ ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করা যাবে।










