মোহাম্মদ জমির সাবেক রাষ্ট্রদূত ও প্রধান তথ্য কমিশনার। অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশনের (ওআইসি) আওতাধীন ইনডিপেনডেন্ট পার্মানেন্ট হিউম্যান রাইটস কমিশনের (আইপিএইচআরসি) সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন (২০১৮-২০২১) করেছেন। দীর্ঘ কূটনীতিক জীবনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে কাজ করেছেন ইতালি, সুইজারল্যান্ড, লুক্সেমবার্গসহ বেশ কয়েকটি দেশে। ২০০৩ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদর দপ্তর ব্রাসেলসে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন মোহাম্মদ জমির। মিয়ানমারে সাম্প্রতিক সংঘাত ও বাংলাদেশে তার অভিঘাত নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম

মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তে ফের উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। প্রতিবারই বাংলাদেশ ভুক্তভোগী হয়ে থাকে। বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকায় মিয়ানমারের এ অভ্যন্তরীণ সংঘাত আমাদের জন্য কতটা উদ্বেগের?

মিয়ানমারে বর্তমান যে সরকার আছে তাদের আমি কোনোভাবেই মনে করি না তারা বৈধ সরকার (লিগ্যাল সরকার)। সাম্প্রতিক সংঘাতে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষীসহ বিভিন্ন নাগরিকের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। এবার আমাদের পাল্টা জবাবটা অনেক ভালো হয়েছে। যারা এসেছিল তাদের ফেরত দেয়া হয়েছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, মিয়ানমারে একটি সংঘর্ষ হওয়া মানেই পরিবেশটি সম্পূর্ণ ভিন্নতর হয়ে যাচ্ছে। সেই কারণে বাংলাদেশের মনে রাখা দরকার, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে আমরা সচেষ্ট রয়েছি, এখন সেটা হয়তো কিছুদিন পিছিয়ে যাবে। আমাদের উচিত হবে, মিয়ানমার থেকে আর কাউকে ঢুকতে না দেয়া। সে রাখাইন, হিন্দু কিংবা মুসলমান হোক—কাউকেই বাংলাদেশে ঢুকতে দেয়া উচিত হবে না। তবে আমি মনে করি, আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ চীন ও রাশিয়া তিনটি দেশই এবার একটু চাপ দেবে। আশা করি, তারা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে সচেষ্ট হবে। রোহিঙ্গারা যাতে তাদের দেশে ফেরত যায় সেটা খেয়াল রাখতে হবে। আর যুক্তরাষ্ট্র যতই কথা বলুক না কেন, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখনো পুরোপুরি সমর্থন দেয়নি। তারা বিভিন্ন সময়ে বলেছে, কিন্তু তারা লাগাম টেনে ধরেনি। 

মিয়ানমারে কোনো সমস্যা হলে প্রতিবেশী হিসেবে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হই। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ কি সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারছে? 

বাংলাদেশ সবসময় একটি শান্তিপূর্ণ দেশ। আমরা কখনো প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে অহেতুক বিরোধে জড়িয়ে পড়ি না। এখন ইস্যু হলো সম্প্রতি আমাদের এখানে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে গত বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে আমাদের রাজনৈতিক পরিস্থিতি একটু অস্থিতিশীল ছিল। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিরোধিতা সত্ত্বেও শান্তিপূর্ণ একটি নির্বাচন আয়োজন হয়েছে। এরপর সামনে উপজেলা নির্বাচন রয়েছে। আর বিভিন্ন নির্বাচন সম্পন্ন হয়ে গেলে তখন আরো স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ হবে। ততদিনে তা করা যাবে। আমরা আসলে জাতীয় নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত থাকায় মিয়ানমার ইস্যু আমাদের ফোকাস ছিল না। মিয়ানমারের কিছু সীমান্তরক্ষী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। আমরা কিন্তু তাদের দেখাশোনা করে মিয়ানমারে ফেরত পাঠিয়েছি। এটা কিন্তু সরকারের বড় একটা সাফল্য। 

মিয়ানমার সংকটে অনেক আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরাশক্তির ভূমিকা রয়েছে। আমরা তাদের সঙ্গে কীভাবে আলোচনা করতে পারি?

খনার বচন আছে, ‘‌এক গামলা দুধে, এক ফোটা চোঁনা পড়লে পুরো দুধ নষ্ট হয়ে যায়’। মিয়ানমারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, তাদের অনেক তেল ও গ্যাসের খনি আছে। চীন শান প্রদেশ হয়ে সরাসরি বঙ্গোপসাগরে সংযুক্ত হতে পারে। ভারতও একইভাবে কিছু ক্ষেত্রে অনেক সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে। সেসব ক্ষেত্রে মিয়ানমারের এখন উচিত হবে এটা অনুধাবন করা, একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির পেছনে তারা নিজেরাই দায়ী। তাদের নিজেদেরই এর সমাধান বের করতে হবে। বিদ্রোহী জোট কিন্তু ধীরে ধীরে জান্তা নিয়ন্ত্রণ থেকে বিভিন্ন জায়গা দখলে নিচ্ছে। মিয়ানমারের জান্তার অনেক উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা নিয়মিত প্রাণ হারাচ্ছেন। আবার বিদ্রোহীদের কাছে অবস্থান ত্যাগের কারণে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, কর্নেল ও লে. কর্নেল পর্যায়ের অনেক সেনা অফিসারকে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হচ্ছে। জান্তা সরকারের অবস্থান দিন দিন খারাপ থেকে খারাপতর হচ্ছে। এ অবস্থায় সংকট নিরসনে চীন ও আসিয়ানসহ আঞ্চলিক জোটের অংশগ্রহণ জরুরি। 

মিয়ানমারের সঙ্গে চীনের ভালো সম্পর্ক। আবার বাংলাদেশের সঙ্গেও চীনের ভালো সম্পর্ক। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্বকে এক্ষেত্রে কীভাবে কাজে লাগানো যায়? 

মিয়ানমার সংকটে জাতীয় স্বার্থ চীনেরও আছে। এর আগে মিয়ানমারের শান প্রদেশ থেকে প্রায় ৫৫ হাজার মিয়ানমারের নাগরিক চীনে ঢুকেছিল। বহু কষ্ট করে চীন তাদের ফেরত পাঠিয়েছে। তাই চীন এখন চাচ্ছে না, এখন আরেকটি অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হোক। যদি মিয়ানমারের পরিস্থিতি আরো জটিল হয় তাহলে চীনের ওপরও কিন্তু চাপ পড়বে। তারা অবশ্যই চাইবে না, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাক। 

বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আমরা আহামরি সাফল্য দেখাতে পারিনি কেন? 

আমরা আসলে রোহিঙ্গাদের প্রতি মানবিক থেকেছি। তাদের দেশে ফেরত না পঠিয়ে ভাসানচরে নিয়ে গিয়েছি। এ কারণে সাফল্য দেখাতে পারিনি। তখন মনে করা হয়েছিল, ভাসানচরে তাদের নিয়ে সেখান থেকে ধীরে ধীরে জাহাজে করে পাঠিয়ে দেয়া হবে। কিন্তু রোহিঙ্গারা দাবি করেছে, তাদের দুটো জিনিস দরকার। একটি নাগরিকত্ব এবং অন্যটি যেখানে তাদের জমিজমা ছিল সেখানে তাদের ফেরত পাঠাতে হবে। আর এসবের কোনোটিই এখনো হয়নি। আমরা যখন আটকে পড়া ওই রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবসন নিয়ে দেনদরবার চালাচ্ছিলাম এর মধ্যেই সেখানে ক্যু হয়ে গেল। এখন তো জান্তা ও বিদ্রোহীদের মধ্যে তীব্র লড়াই হচ্ছে। আমরা তো নিরস্ত্র রোহিঙ্গাদের এ রকম যুদ্ধক্ষেত্রে ফেলে দিয়ে আসতে পারি না। 

কিন্তু বিশালাকার শরণার্থী উপস্থিতির কারণে অনেকেই বাংলাদেশের নিরাপত্তা ঝুঁকি দেখছেন। আপনি এটাকে কীভাবে দেখছেন? 

নিশ্চয়ই নিরাপত্তা হুমকি রয়েছে। এখন আমরা তা মোকাবেলা করছি। কারণ এবার আমরা মিয়ানমারের কাউকে বাংলাদেশে ঢুকতে দিইনি। আর এখনো ঢুকতে দিচ্ছি না। এরই মধ্যে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে নাফ নদীর পাড়ে এবারো মিয়ানমারের মানুষজন জড়ো হয়েছিল বাংলাদেশে আসার জন্য। কিন্তু এবার বাংলাদেশে তাদের প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। অল্প কজন যারাই আসছে তাদের আমরা ফেরত পাঠাচ্ছি। 

আর মিয়ানমারের জান্তার অবস্থা তো খুবই কাহিল। তারা নতুন সেনাসদস্য নিয়োগ পলিসি ঘোষণা করেছে। আঠারো বছরের ওপরে নাগরিককে আর্মিতে যোগদান করতে হবে। এমনকি রাখাইন রাজ্যে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদেরও সেনাবাহিনীতে যোগদানের অফার দিয়েছে তাদমাদাও। তবে মিয়ানমার সরকার এটা পরিষ্কার করতে পারেনি কীভাবে এ নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে তারা।  

মিয়ানমার ইস্যু সমাধানে জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা মিত্রদের ভূমিকাকে কীভাবে দেখছেন? 

তারা তো এ বিষয়ে কিছুই করছে না। গাজায় যেমন কিছুই করছে না, তেমনি এখানেও কিছু করছে না। বরং পশ্চিমারা রোহিঙ্গা ইস্যু জিইয়ে রাখতে চাচ্ছে।