বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এ বছর গ্রীষ্মের শুরুতেই তীব্র দাবদাহের সম্মুখীন হয়েছে দেশবাসী। পাবনার ঈশ্বরদীতে দেশের ৫৮ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। দেশের সড়ক ও রেলযোগাযোগ ব্যবস্থার ওপরও এ দাবদাহের প্রভাব পড়েছে। এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একই জায়গায় দুবার রেললাইন বেঁকে যায়। যে কারণে দীর্ঘ সময় রেল যোগাযোগ ব্যাহত হয়। রেল কর্মকর্তাদের ভাষ্য মতে, শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়া নয়, অতিরিক্ত গরমে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট রুটসহ অধিকাংশ রেললাইন বেঁকে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ঢাকার আশপাশে প্রতিদিন বেঁকে যাচ্ছে রেললাইন। রেললাইন বেঁকে বগি লাইনচ্যুত হচ্ছে ট্রেন আর সেজন্য রেললাইনে পানি ঢালা ও কচুরিপানা দেয়ার মাধ্যমে ঠাণ্ডা রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত অংশে রেললাইন কাটার কাজ করছে রেলকর্মীরা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অতিরিক্ত তাপমাত্রায় বেঁকে যাওয়া প্রতিরোধে ১২৬ ফুট পরপর রেললাইন কাটা হচ্ছে। ফলে ওই ক্ষতিগ্রস্ত রেললাইন কাটা শেষে কাঠের স্লিপার পরিবর্তন করে পিসি স্লিপার অর্থাৎ সিমেন্টের স্লিপার লাগানো হবে। প্রতিনিয়ত এ রেললাইন বেঁকে যাওয়ার শঙ্কার মধ্যে বিশেষ কিছু স্থান চিহ্নিত করে ২০-৪০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চালানোর নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ রেল কর্তৃপক্ষ।
এ বিষয়ে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রেলপথের সঙ্গে দেশের সড়ক যোগাযোগ ক্ষেত্রেও তাপমাত্রা বৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা রয়েছে। আমাদের দেশের ৬০ শতাংশ রেললাইন মেয়াদোত্তীর্ণ, যে কারণে পরিবর্তিত আবহাওয়ায় বেঁকে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে প্রতিটি রেল রুটেই। বাংলাদেশ রেলওয়ের সূত্র বলছে, রেলের বেঁকে যাওয়ার শঙ্কার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে পূর্বাঞ্চলের মিটার গেজ রেললাইন। মূলত অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে কেবল রেললাইন লম্বা হয়ে যায় তা নয়, সমানভাবে পিচ ঢালা সড়কপথে রাস্তার মান নষ্ট হয়ে নিরাপত্তা এবং যাতায়াতে বিঘ্নতা দেখা দেয়।
বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দেশে রাস্তাগুলো তৈরির প্রধান উপকরণ হলো অ্যাসফল্ট, যা বিটুমিনের সঙ্গে অন্যান্য উপকরণ মিশিয়ে তৈরি করা হয়। আর এই অ্যাসফল্টের রাস্তা তাপ শোষণ করে বেশি। এ ধরনের সড়কে গাড়ির টায়ারের ক্রমাগত ঘর্ষণ যুক্ত হওয়ায় বাতাসের চেয়ে রাস্তার তাপমাত্রা বেশি হয়ে থাকে। বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, তাপপ্রবাহের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ সূর্যের উত্তাপ শোষণ করায় রাস্তার তাপমাত্রা কখনো কখনো ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছতে পারে। অ্যাসফল্টের মূল উপকরণ বিটুমিন অর্থাৎ পিচ গলতে শুরু করে ৫৪ ডিগ্রি তাপমাত্রায়। বিটুমিনের সঙ্গে মানহীন উপকরণের ব্যবহার করা হলে অ্যাসফল্ট গলে রাস্তা দ্রুত ডেবে যাওয়া ও যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ার বড় আশঙ্কা থেকে যায়। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বৃদ্ধির প্রভাবে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় খরা ও তাপপ্রবাহ এখন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি দীর্ঘায়িত হচ্ছে। আগামীতে এর মাত্রা আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই আমাদের এখন থেকেই এ বিষয়ে কাজ শুরু করে দেয়া দরকার। যেহেতু রেললাইনগুলো ইস্পাত থেকে তৈরি করা হয়, সেগুলো অতিমাত্রার গরমের সঙ্গে প্রসারিত হয় এবং বাঁকানো শুরু করে এটি ‘বাকলিং’ নামে পরিচিত। যুক্তরাজ্যে রেল ও সড়কসহ উভয় পথে গ্রীষ্মকালীন তাপপ্রবাহের এসব সমস্যা মোকাবেলায় রেলের ক্ষেত্রে লাইন গরম না হওয়ার জন্য সাদা রঙ করে থাকে যাতে রেললাইন কম তাপ শোষণ করতে পারে, এর সঙ্গে রেলের স্থানীয় গতির ওপর বিধিনিষেধ প্রবর্তন করে। আর সড়কের জন্য স্থানে স্থানে যানবাহনের গতি সীমিত করা এবং পাশাপাশি তাদের অ্যাসফল্টের রাস্তাগুলোকে কংক্রিটের রাস্তায় পরিবর্তনের আলোচনা করা হচ্ছে। এ উপায়গুলো আমাদের দেশেও প্রয়োগ করা দরকার, রেলের ক্ষেত্রে পুরনো মেয়াদোত্তীর্ণ রেললাইনগুলোকে বদলানো প্রয়োজন আর অন্যদিকে সড়ক পরিবেশবান্ধব কংক্রিট দিয়ে বানানোর দিকে এগোনো দরকার। নিয়ম অনুযায়ী একটি সড়ক নির্মাণের ১০-১৫ বছরের মধ্যে রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় হওয়ার কথা নয়, কিন্তু আমাদের বিটুমিন দিয়ে তৈরি করা সড়কগুলো টেকসই হচ্ছে না আর সেই সঙ্গে এমন তীব্র গরমে বিটুমিন গলে পরিবেশ দূষণও তৈরি করছে। এ ধরনের রাস্তা এমনিতেই তাপ শোষণ করে তাপ ধরে রাখে, যে কারণে সড়কে তাপমাত্রা অনেক সময় বাতাসের তাপমাত্রার চেয়ে বেশি হয়। তাই আমাদের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে কংক্রিটের রাস্তা বানানোর সিদ্ধান্তে আসতে হবে।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেললাইন বেঁকে যাওয়া বা গরমে রাস্তার পিচ গলে ডেবে যাওয়া এমন সব সমস্যার অন্যতম কারণ হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তির অনুপস্থিতি, মেয়াদোত্তীর্ণ রেললাইন, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থায় সড়ক নির্মাণ। এদিকে এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই, দেশের বিদ্যমান রেলপথের অর্ধেকের বেশি দীর্ঘদিন ধরেই চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। অনেক স্থানে রেলপথের অবস্থা জরাজীর্ণের পাশাপাশি রেলব্রিজগুলোর অবস্থাও শোচনীয়। প্রায়ই ঘটছে ট্রেন লাইনচ্যুতির ঘটনা। ঝুঁকিপূর্ণ লাইনের কারণে কমিয়ে দেয়া হয়েছে রেলের গতি, অনেকটা একই অবস্থা সড়কপথের ক্ষেত্রেও। জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে সড়ক নির্মাণে আধুনিক পন্থা গ্রহণ করতে হবে এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি সড়ক ও রেল উভয় ক্ষেত্রে মেরামত ও সংস্কার জরুরি হয়ে উঠেছে।
বণিক বার্তার প্রতিবেদন থেকে আরো জানা যায়, রেলের লাইন বেঁকে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রেল কর্তৃপক্ষ বলছে অতিরিক্ত উত্তাপে প্রসারিত হয়ে বেঁকে গেছে ইস্পাতে নির্মিত রেললাইন। এ কারণেই ঘটেছে রেললাইন বাঁকা হওয়া ও ট্রেনের লাইনচ্যুতির ঘটনাটি। তবে শুধু রেললাইন বেঁকে যাওয়ার কারণ রোদের তাপ নয় বলছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, নিয়মিত প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, মেয়াদোত্তীর্ণ, ত্রুটিপূর্ণ রেল ব্যবহার ও রেলপথে পর্যাপ্ত পাথর না থাকার বিষয়টিও এখানে বড় প্রভাব ফেলেছে। বিষয়গুলো নিয়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের এখনই যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। অন্যথায় ভবিষ্যতে আরো অত্যধিক তাপমাত্রায় বড় কোনো দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
অত্যধিক তাপে রেললাইনের বেঁকে যাওয়া নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নানা আলোচনা হলেও বাংলাদেশ রেলওয়ে এ ব্যাপারে কোনো কার্যকর দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। রেল কর্তৃপক্ষ এজন্য জনবল সংকটকে প্রধান সমস্যা হিসেবে দেখাচ্ছে। তীব্র দাবদাহে রেল ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, সেটি দূর করতে এখন থেকেই রেলের জনবল বাড়ানোর সঙ্গে আধুনিক পদ্ধতি অবলম্বন করে মেয়াদোত্তীর্ণ রেললাইন মেরামত বা প্রয়োজনে পরিবর্তন করতে হবে। সেই সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণের দিকে মনোনিবেশের পাশাপাশি রেল ও সড়কপথের নিরাপদ মান ধরে রাখতে যথাযথ ব্যবস্থাপনা ও সংস্কার গ্রহণ প্রয়োজন।










