তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (বিএইচটিপিএ)। প্রতিষ্ঠার পর হাই-টেক শিল্পের বিকাশে দেশব্যাপী কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে খাতটিতে কিছু দেশী বিনিয়োগ মিললেও কাঙ্ক্ষিত বিদেশী বিনিয়োগের দেখা মেলেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় দশকের বেশি সময়ে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিদেশী বিনিয়োগ এসেছে মাত্র ১৮ কোটি ডলার। ২০২৫ সালের মধ্যে এ খাতে ৫ বিলিয়ন ডলার বিদেশী বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে সরকারের নীতিনির্ধারকরা জানিয়েছেন।
বিদেশী বিনিয়োগ কেন আকৃষ্ট করা যাচ্ছে না—এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের দাবি, দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাত এখনো ডেভেলপমেন্টের পর্যায়ে রয়েছে। যে কারণে কাঙ্ক্ষিত বিদেশী বিনিয়োগ পাওয়া যায়নি। তবে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশ বেশ সম্ভাবনাময় দেশ। যথাযথ পরিকল্পনা ও বিশ্বমানের দক্ষতা অর্জন করতে পারলে ভবিষ্যতে বিদেশী বিনিয়োগ পাওয়া সম্ভব হবে।
এজন্য সুনির্দিষ্ট পন্থায় লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে সামনে এগোতে হবে। কেননা প্রযুক্তিজ্ঞানে সীমাবদ্ধতা, দক্ষ জনশক্তি ও সঠিক পরিকল্পনার অভাবে প্রযুক্তি খাতে প্রত্যাশা অনুযায়ী উন্নয়ন হচ্ছে না বলে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তারা মনে করছেন। তাদের ভাষ্যমতে, বিদেশী বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হওয়ার অন্যতম বড় কারণ দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে ধীরগতি ও বিশ্বের চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে না পারা। এক্ষেত্রে আমাদের পরিকল্পনায় ঘাটতি রয়েছে।
এক্ষেত্রে বিদেশীদের আকৃষ্ট করতে কমপক্ষে ২০ বছরের বিজনেস প্রবৃদ্ধি মডেলও দেখানো সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া বর্তমান সময়ে বিদেশীদের চাহিদার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে। অন্যদিকে যথাযথ দক্ষতা না থাকায় অন্য দেশগুলোর তুলনায় কম মূল্যে কাজ করতে হচ্ছে। এজন্য সময়োপযোগী প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের বিকল্প নেই। প্রযুক্তি খাতের বিস্তারে শিক্ষিত তরুণদের কাজে লাগানো প্রয়োজন।
চীনভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেটি যেন বাস্তবায়ন হয় সে প্রচেষ্টা চালাতে হবে। কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, সৌদি আরবের প্রতিনিধি দলের সফরও যেন ফলাফল বয়ে আনতে পারে সেদিকে মনোযোগ নিবদ্ধ করা দরকার। এরই মধ্যে বিদেশী কোম্পানিগুলো অ্যাসেম্বল করছে, যা ইতিবাচক। এটি অব্যাহত রাখার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এর ধারাবাহিকতা আরো প্রসারিত করার পদক্ষেপ নিতে হবে।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৯২টি তথ্যপ্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট পার্ক গড়ে তোলা হচ্ছে, যেগুলো বিদেশী বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত রাখা হবে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত স্মার্ট বাংলাদেশ সামিটের পর নতুন নতুন স্টার্টআপ আসছে, এসব স্টার্টআপে বিদেশীরা বিনিয়োগ করবে। এ প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে যথাসাধ্য চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে ফুটে উঠছে। তবে এসব উদ্যোগ ও প্রয়াসের সুফল তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিদেশী বিনিয়োগের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৬ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত কম্পিউটার, সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নিট বিদেশী বিনিয়োগ এসেছে ১৮ কোটি ডলার। এর মধ্যে ২০২০ সালে ৫৮ লাখ ডলার, ২০২১ সালে ১ কোটি ৪৪ লাখ এবং সর্বশেষ ২০২২ সালে ১ কোটি ১৭ লাখ ডলার বিদেশী বিনিয়োগ আসে। পরিসংখ্যানে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে রফতানি আয়ের অংশটি সার্বিক সেবা খাতের ‘টেলিকমিউনিকেশন, কম্পিউটার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসের’ অংশ হিসেবে দেখানো হয়। ২০২০-২১ অর্থবছরে এ বাবদ রফতানি আয় হয়েছিল ৪৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার। ২০২১-২২ অর্থবছরে এখান থেকে রফতানি হয়েছে ৭৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার।
বিএইচটিপিএর অধীনে বর্তমানে হাই-টেক পার্ক, আইটি পার্ক, সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক, আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টারসহ মোট ৯২টি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। আইসিটি খাতের বৃহৎ পরিসরের উৎপাদন হাব হিসেবেই গড়ে তোলার লক্ষ্য থেকেই এসব প্রতিষ্ঠান নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়।
কয়েক বছর ধরে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু হাই-টেক সিটিতে প্রযুক্তি খাতের ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া সিলেট ও রাজশাহীতে নির্মিত হাই-টেক পার্কে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান স্বল্প পরিসরে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করেছে। এসব পার্কে খুব সামান্য পরিমাণে বিদেশী বিনিয়োগ এসেছে।
বাংলাদেশে বর্তমানে ৬ লাখ ৫০ হাজার ফ্রিল্যান্সার রয়েছেন, যা বিশ্বব্যাপী অনলাইন শ্রমের জন্য দ্বিতীয় বৃহত্তম। এদের যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের সম্ভাবনা বেশ উজ্জ্বল। এজন্য প্রশিক্ষণযোগ্য বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে গড়ে তুলতে হবে।
বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ অনলাইন ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালু করেছে। এর ফলে বিদেশী কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ করতে চাইলে খুব সহজে এবং দ্রুত সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবে। এছাড়া বিনিয়োগের পরিবেশ বজায় রাখা হয়েছে বলেও কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে। আমরা হাই-টেক কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে আস্থা রাখতে চাই। বৈদেশিক সরাসরি বিনিয়োগ (এফডিআই) যেন আইসিটি খাতকেও সমৃদ্ধ করে সেটিই আমাদের কাম্য। এজন্য সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার আলোকে প্রযুক্তি খাতে বিশ্বমানের দক্ষতা অর্জন করতে হবে।










