প্রাথমিক শিক্ষা একটি জাতির শিক্ষার ভিত গড়ে দেয়। এজন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রশিক্ষক-শিক্ষাক্রমসহ নানাবিধ সংকটে শিক্ষক প্রশিক্ষণ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে দেখা যায় অনেক শিক্ষকই কোনো রকম প্রশিক্ষণ ছাড়াই পাঠদানে যোগ দেন। যার প্রভাব পড়ে শিশুদের ওপর। কারণ শিশুদের কোনো কিছু শেখানো খুব কঠিন। এক্ষেত্রে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের তুলনায় প্রশিক্ষণ নেননি এমন শিক্ষক শ্রেণীকক্ষে উপযুক্ত ভূমিকা রাখতে পারেন না। 

বণিক বার্তায় প্রকাশ, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণ গ্রহণ বাধ্যতামূলক। এজন্য জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির (নেপ) অধীনে ৬৭টি প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (পিটিআই) স্থাপন করেছে সরকার। যদিও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষকের অভাবে প্রয়োজনমাফিক কার্যক্রম চালাতে পারছে না পিটিআইগুলো। বাধ্যতামূলক হলেও দেশের প্রাথমিক শিক্ষকদের বড় একটি অংশ এখনো রয়ে গেছেন প্রশিক্ষণের বাইরে। এজন্য পিটিআইগুলোর জনবল ঘাটতির পাশাপাশি আবাসন সংকট ও কারিকুলাম-সংক্রান্ত জটিলতাকে দায়ী করছেন তারা। এছাড়া শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য ১৮ মাসের কোর্স চালু করা হয়। পরে এটি ১০ মাস করার সিদ্ধান্ত নেয় প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসন। যদিও পিটিআই থেকে ১০ মাস থেকে বাড়িয়ে এক বছর করার প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু সংস্থাটির শিক্ষক সংকটের ফলে এটি সম্ভব হয়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চের শিক্ষকরাও প্রশিক্ষণের সময়সীমা অন্তত এক বছর হওয়ার পক্ষে মত দেন। সেই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের সংকট তৈরি হওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করতে হবে। নেপের পক্ষ থেকে ১০ মাসের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ধারণা পোষণ করা হলেও দ্বিমত পোষণ করেছেন শিক্ষাবিদরা। এক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের সময়সীমা বাড়ানোর প্রতিই মত দেন তারা। অপ্রতুল প্রশিক্ষণে শিক্ষকরা প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ পাবেন না বলে ধারণা করা হচ্ছে। জানা যায়, ১০ মাসব্যাপী শিক্ষক প্রশিক্ষণ কোর্সের কারিকুলাম এমনকি ম্যাটেরিয়াল প্রণয়নেও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেয়া হয়নি। যদিও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব বলেছেন, যুগের চাহিদা অনুযায়ী মৌলিক প্রশিক্ষণ কোর্স করা হয়েছে। এক বছর ধরে বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে আলোচনা করে শিক্ষকদের দক্ষতা ও প্রয়োজনীয়তার নিরিখে কোর্স সাজানো হয়েছে। যাই হোক, দক্ষ শিক্ষক তৈরি করতে ভালো প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। আবার দেখা যায় অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকরা পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নিয়েও প্রয়োগ করছেন না। তাই প্রশিক্ষণ কীভাবে কার্যকর করা যায়, সেদিকে মনোনিবেশ করতে হবে। এজন্য প্রশিক্ষণের সময় না বাড়িয়ে উল্টো কমানো হলে তা কতটুকু ফলপ্রসূ হবে সেটি প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

প্রশিক্ষক সংকটের কারণেও প্রশিক্ষণে বিলম্ব হচ্ছে। পাশাপাশি আবাসন সমস্যাও রয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৭টি পিটিআইয়ে মোট প্রশিক্ষকের পদ আছে ১ হাজার ৪১টি। যদিও প্রতিষ্ঠানগুলোয় প্রশিক্ষক কর্মরত ৬০২ জন। প্রশিক্ষকের পদ ফাঁকা আছে ৪৩৯টি। এদিকে বিভিন্ন পিটিআইয়ের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে প্রায় ৬৫টি পিটিআইয়েই প্রশিক্ষকের সর্বনিম্ন একটি থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১০টি পর্যন্ত পদ শূন্য রয়েছে। যে কারণে যেখানে ১৫০ জন ভর্তি করা যেত, সেখানে এখন ৯০ জন ভর্তি করা হচ্ছে। আবার সময়মতো প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা না করার অভিযোগও রয়েছে। দেখা যায় যে পিটিআইয়ে কর্মরত জনবল কর্মহীন অলস সময় কাটান। এতে সরকারের রাজস্ব অপচয় হচ্ছে।

বিশ্বের অন্যান্য দেশে শিক্ষকদের এ প্রশিক্ষণ দেয়া হয় প্রি-সার্ভিস হিসেবে, অর্থাৎ চাকরিতে যোগদানের আগে। কিন্তু আমাদের দেশে প্রশিক্ষণ ছাড়াই শিক্ষকরা চাকরিতে যোগ দেন। এজন্য পিটিআইয়ে জনবল বৃদ্ধির যে আবেদন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দেয়া হয়েছে, সেদিকে মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। আবার নতুন কারিকুলাম অনুযায়ী শিক্ষকদের ভালো প্রশিক্ষণেরও বিকল্প নেই। কারণ এ কারিকুলামে যে পেডাগোজি, তাতে যে কেউ যেকোনো বিষয় পড়াতে পারবে এমনটি না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে মত পাওয়া গেছে।

অনেক শিক্ষক প্রশিক্ষণের বাইরে থেকে নিয়োগ পাচ্ছেন। আবার যোগদানের পর বিদ্যালয়ের বাইরে থাকলে পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হবে। এজন্য নিয়োগের পরই শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে পাঠানো প্রয়োজন। এক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ কতটুকু কাজে লাগবে সেটিও ভেবে দেখতে হবে। খোদ পিটিআই ইন্সট্রাক্টরদের মতে, শিশুদের পাঠদানের জন্য সক্ষম শিক্ষক তৈরি করতে হলে পেডাগোজির ওপর ব্যাপক অনুশীলন প্রয়োজন, যা স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণে সম্ভব নয়। এছাড়া প্রস্তাবিত মৌলিক প্রশিক্ষণের একটা অংশ পিটিআইয়ের বাইরে শিক্ষকদের নিজ উপজেলায় সম্পাদিত হবে, যার মনিটরিংয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের, যারা শিক্ষাবিষয়ক ডিগ্রি অর্জন করেননি। এর আগে গবেষণায় উঠে এসেছে, ১৮ মাস মেয়াদি প্রশিক্ষণের চতুর্থ টার্ম (শেষের ছয় মাস) পিটিআইয়ের বাইরে শিক্ষকদের নিজ বিদ্যালয়ে সম্পাদিত হওয়ায় উপযুক্ত মনিটরিংয়ের অভাবে তা সফল হয়নি। এক্ষেত্রে মৌলিক প্রশিক্ষণে পিটিআইয়ের তত্ত্বাবধানের বাইরের অংশের সফলতা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়ে রয়েছে।

এদিকে প্রশিক্ষণের মেয়াদ কমানোর সিদ্ধান্তকে আইনের লঙ্ঘন দাবি করে পিটিআই প্রশিক্ষকদের পক্ষ থেকে আইনি নোটিসও দেয়া হয়েছিল। শিক্ষাবিদরাও কমপক্ষে এক বছর মেয়াদ রাখার পক্ষপাতী। বর্তমানে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প-৪ (পিইডিপি-৪) চলমান রয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্তৃপক্ষ পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে তাদের সদিচ্ছা ব্যক্ত করেছে। আমরা এ আশ্বাসের প্রতি আস্থা রাখতে চাই। এজন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি সময়োপযোগী কারিকুলাম প্রণয়নসহ সব ধরনের সংকট নিরসন করা হবে, সেটিই আমাদের কাম্য।