বর্তমান সময়ে কারিগরি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে। কিন্তু কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থা সেভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে না। যে কারণে দেশে দক্ষ জনশক্তি তৈরি না হওয়ায় বেকারত্ব বাড়ছে। প্রবাসেও দক্ষ কর্মী পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। প্রথাগত শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরি হচ্ছে। কিন্তু পেশাগত জীবনের প্রয়োজনীয় দক্ষতা কতটুকু অর্জিত হচ্ছে তা প্রশ্নবিদ্ধ থাকায় কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। এক্ষেত্রে সরকারি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা পালনের সুযোগ থাকলেও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ঘাটতির বিষয়টি লক্ষণীয়। এমনকি শিক্ষার্থী সংকটে প্রতিষ্ঠানগুলোয় আসন ফাঁকা থাকছে।

বণিক বার্তায় প্রকাশ, শিক্ষার্থী সংকটে ভুগছে দেশের সরকারি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। কোনো কোনো কোর্সে ফাঁকা আসনের হার ৯০ শতাংশও ছাড়াচ্ছে। সর্বশেষ গত ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষেও দেশের সরকারি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় প্রায় ৩৭ শতাংশ আসন ফাঁকা ছিল। শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মতে, কারিকুলামের দুর্বলতা, প্রচারণার অভাব, শিক্ষক সংকট ও ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটির কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোয় বিপুলসংখ্যক আসন ফাঁকা থাকছে। এদিকে আসন ফাঁকা থাকলেও সরকার কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়িয়ে তুলছে। এমনকি বিষয়টি নিয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) থেকে আপত্তি জানানো হলেও ফাঁকা আসন পূরণের উদ্যোগ না নিয়েই সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ নতুন কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করে চলেছে। ফলে ফাঁকা আসনের হারও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

মূলত ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলা পর্যায়ের সরকারি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী সংকটে ভুগছে। বিশেষ করে টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার (টিটিসি) ও নতুন প্রতিষ্ঠিত টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজগুলোয় (টিএসসি) এ সংকট বেশ প্রকট হয়ে উঠেছে। প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পেলেও কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট না করতে পারার পেছনে শিক্ষক সংকট ও প্রচারণার অভাবকে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ স্বল্পসংখ্যক শিক্ষক দিয়ে একটি প্রতিষ্ঠান ভালোভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। এজন্য উপযুক্ত জনবলের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত প্রচারণা চালালে শিক্ষার্থীদের কারিগরি শিক্ষায় আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়। কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-সংশ্লিষ্টরা এমনটিই মত দিয়েছেন।

বস্তুত উন্নত বিশ্বের দেশগুলো যেমন চীন, জাপান, জার্মানি এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারত কারিগরি শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে সর্বোচ্চ ফলাফল নিশ্চিত করতে পেরেছে। আমাদের দেশেও প্রথাগত শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষায় জোর দেয়ার সময় এসেছে। সে ধারাবাহিকতায় যেসব সরকারি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা হচ্ছে, সেগুলো সঠিকভাবে পরিচালনা করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বর্তমান সময়ে পৃথিবীকে ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ বলা হয়। সে হিসেবে পৃথিবী যেভাবে এগোচ্ছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। এজন্য তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি ব্যবহারিক জ্ঞানের বিকল্প নেই। তাই কারিগরি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। কিন্তু আমরা এর সুফল গ্রহণ করতে পারছি না। তাছাড়া কারিগরি শিক্ষা নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণাও রয়েছে। এক্ষেত্রে প্রকৃত বিষয়টি শিক্ষার্থীদের কাছে তুলে ধরতে হবে।

শিক্ষাবিদদের মতে, দেশে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের ভর্তির হার বাড়ানোর জন্য নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের চেয়ে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতে বেশি গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। আর এটিই সব নেতিবাচক প্রচারণার উপযুক্ত জবাব হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কেননা কারিগরি শিক্ষা গ্রহণ করে শিক্ষার্থীরা সফল হলে তা উদাহরণ হিসেবে গণ্য হবে। আর এ সফল উদাহরণ তৈরির জন্য শিক্ষার্থীদের উপযুক্ত প্রক্রিয়ায় গড়ে তুলতে হবে।

অবশ্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন আইএমইডির পক্ষ থেকে বিদ্যমান টিটিসিগুলোর মানোন্নয়ন না করে নতুন করে সেন্টার স্থাপন না করার সুপারিশ করা হয়েছিল। গত জুনে দেশে নতুন প্রতিষ্ঠিত ২৭টি টিটিসি নিয়ে এক প্রতিবেদনে এ সুপারিশ করেছিল সংস্থাটি। কিন্তু তাদের সুপারিশ রাখা হয়নি।

শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের দাবি, কারিকুলামের দুর্বলতা, প্রচারণার অভাব, শিক্ষক সংকট ও ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণেই প্রতিষ্ঠানগুলোয় আসনসংখ্যা শূন্য থাকছে। যেখানে বেকারত্ব নিরসনে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার কথা, সেখানে এ রকম দৈন্যদশা কিছুতেই কাম্য নয়। এতে একদিকে যেমন সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে, সেই সঙ্গে কাঙ্ক্ষিত ফলও মিলছে না। দীর্ঘদিন এমন অব্যবস্থাপনা জিইয়ে রাখা উচিত না। যেহেতু অর্থ বিনিয়োগ হচ্ছে, তাই বিনিয়োগের সুফল ঘরে তুলতে হবে। এজন্য যথোপযুক্ত পরিকল্পনার ভিত্তিতে দেশের কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। আমরা প্রত্যাশা করব, সময়ের চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে কারিগরি শিক্ষার প্রতি শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো যথোপযুক্ত ভূমিকা পালন করবে। এক্ষেত্রে কারিগরি শিক্ষার মান বৃদ্ধিতে সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক, এটিই সবার কাম্য।