যেকোনো গণনা বা শুমারি জরিপে ২-৩ শতাংশ ভুল থাকতে পারে। এর সঙ্গে প্রাথমিক হিসাব সমন্বয় করে চূড়ান্ত হিসাব বের করা হয়। জনশুমারির তথ্যের ওপর ভিত্তি করে একটি দেশের অনেক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। যেমন মাথাপিছু আয় নির্ধারণ, জাতীয় বাজেট প্রণয়ন, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দেশের খাদ্য উৎপাদন ও মজুদ ইত্যাদি। এ কারণে সঠিক ও নির্ভুল তথ্যের গুরুত্ব অপরিসীম।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএসের) খানা আয় ও ব্যয় জরিপ ২০২২ অনুসারে, ২০১০ সালে ছিল সাড়ে ৩১ শতাংশ। ছয় বছরের মাথায় ২০১৬ সালে তা নেমে আসে ২৪ দশমিক ৩ শতাংশে। এর সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের তথ্যের গরমিল রয়েছে। তাই বিবিএসকে আরো সঠিক ও নির্ভুল তথ্য প্রকাশে উদ্যোগী হতে হবে। ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ফলপ্রসূ হবে না। 

বিশ্বব্যাংক দারিদ্র্যের হার নির্ধারণে বিবিএসের খানা আয় ও ব্যয়-২০২২ জরিপের তথ্য সংগ্রহ এবং বিশ্লেষণে কারিগরি সহায়তা প্রদান করে। ২০২২ সালের তথ্যের ভিত্তিতে পূর্ববর্তী সময়ের দারিদ্র্যের হার পুনরায় যাচাই করে চলতি মাসে ‘রিকনস্ট্রাক্টিং ২০১০-২২ ‌পভার্টি অ্যান্ড ইনইকুয়ালিটি ট্রেন্ডস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১০ সালে দেশে দারিদ্র্যের গড় হার ছিল বিবিএসের তথ্যের চেয়ে ২১ শতাংশ বেশি। ২০১৬ সালে দারিদ্র্যের গড় হার ছিল বিবিএসের চেয়ে ১৯ শতাংশ বেশি। 

বিবিএসের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের তথ্যের সামান্য গরমিল থাকতে পারে। বর্তমানে সংস্থাটি যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে—বিবিএসের সঙ্গে বিশাল ব্যবধান রয়েছে। বিবিএসের তথ্যের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের বিশাল ব্যবধান কমিয়ে আনতে হবে। সঠিক, নির্ভরযোগ্য এবং সময়োপযোগী পরিসংখ্যান টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। পরিসংখ্যানের গুরুত্ব সবসময়ই রয়েছে। কিন্তু এখন আরো অনেক বেড়েছে। কারণ দেশের অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি বুঝতে হলে পরিসংখ্যানের বিকল্প নেই। তাছাড়া জাতির উন্নয়ন আর অগ্রগতি যা-ই বলি, সবকিছুর সঙ্গেই তথ্য-উপাত্ত জড়িত। মানুষের সুষম উন্নয়নের জন্যও তথ্য-উপাত্তের প্রয়োজন। 

দেশের বিভিন্ন খাতে কিংবা উন্নয়নে যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে সঠিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। সিদ্ধান্ত গ্রহণ এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে কোনো সমস্যা সমাধানের সঠিক ও সর্বোত্তম উপায় নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। সিদ্ধান্তকে নির্ভরযোগ্য করার জন্য পর্যাপ্ত তথ্যের প্রয়োজন হয়। তথ্য ও উপাত্তের বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিলে তা ফলপ্রসূ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে যে ধরনের তথ্যই হোক সেটা হতে হবে নির্ভুল, নির্ভরযোগ্য ও বাস্তবসম্মত। 

এছাড়া বিবিএসের দুটি জরিপের মধ্যে সময়ের ব্যবধানও কমিয়ে আনতে হবে। পাঁচ-ছয় বছর পরপর না করে এটা কয়েক বছর পরপর করতে হবে। সময়ের ব্যবধান কমিয়ে আনা হলে জরিপে সঠিকভাবে তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন হবে বলে আশা করা যায়। বর্তমান পরিসংখ্যান পদ্ধতিতে দারিদ্র্যের হার হ্রাস-বৃদ্ধির কারণ নিয়ে পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা বা পর্যালোচনা উল্লেখ করা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে দারিদ্র্যের হ্রাস-বৃদ্ধির হার নিয়ে সঠিক তথ্য জানা যাবে ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হবে। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নও সহজ হবে। বিবিএসের প্রতিবেদনে তথ্যগত ভুল নাকি পদ্ধতিগত পরিবর্তনের কারণে এমনটা হয়েছে তা বের করা দরকার। শুধু ভোগের ভিত্তিতে নয়, বহুমাত্রিক ও সমন্বিত পদ্ধতিতে দারিদ্র্যের হার পরিমাপে উদ্যোগী হতে হবে। এ ধরনের দুটি জরিপের মধ্যে সময়ের ব্যবধানও কমিয়ে আনা প্রয়োজন। 

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১০ ও ২০১৬ সালে দারিদ্র্যের হার কমিয়ে দেখানো হলেও চরম দারিদ্র্যের হারের ক্ষেত্রে বেশি দেখানো হয়েছিল। সরকারি হিসাবের চেয়ে দুই মেয়াদেই চরম দারিদ্র্যের হার ৬ শতাংশ কম ছিল। 

বিবিএসের তথ্যের তুলনায় দেশে দারিদ্র্য পরিস্থিতি আরো গভীর ও ব্যাপক। এ তথ্য নিয়ে অর্থনীতিবিদদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় নানা আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের পর্যালোচনা সেখানে একটি বাড়তি তথ্যগত ভিত্তি দিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য দারিদ্র্য নিরসনে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। 

সরকার যদি সঠিক তথ্য উপস্থাপন না করে দারিদ্র্য জরিপে ইতিবাচক অবস্থান বজায় রাখতে চেষ্টা করে এবং দারিদ্র্য অগ্রগতির অবস্থান প্রকাশ করা হয়, তাতে মূলত হিতে বিপরীত হবে। কারণ অনুল্লেখিত দারিদ্র্য জিইয়ে রেখে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে তাতে সঠিক নীতির প্রতিফলন ঘটবে না। বিবিএসের এ ধরনের তথ্যের গরমিল ভবিষ্যতের জন্যও ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াবে, সেই সঙ্গে অতিদারিদ্র্যের সংখ্যা বাড়াবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের দারিদ্র্যের হার বেশি থাকার কারণে যেসব বিদেশী অনুদান আসে, সেক্ষেত্রে প্রভাব পড়বে। প্রকৃতার্থে দরিদ্ররা বিভিন্ন সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, বিবিএস ও বিশ্বব্যাংকের কোথায় গরমিল হয়েছে তা বের করা দরকার। 

এদিকে জরিপে দারিদ্র্যের হার কম হলে সরকারের সাফল্যের বিষয়টি উঠে আসে। বাংলাদেশে সোশ্যাল সিকিউরিটি প্রোগ্রাম (এসএসপি) যেমন—বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, ভিজিডি, ভিজিএফ, প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর জন্য ভাতা, দরিদ্রদের জন্য আয়বর্ধক কর্মসূচি, আশ্রয়ণ প্রকল্প, কৃষি পুনর্বাসন কর্মসূচি ইত্যাদি দারিদ্র্য কমাতে অবদান রেখেছে। অর্থনীতিবিদদের ভাষ্য, ১৯৯০ সাল-পরবর্তী সময়ে শিল্প-কারখানার প্রসারের ফলে দেশে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগে। সেই উন্নতির সুবিধার ফলে দারিদ্র্যের হার কমেছে। কিন্তু একই সঙ্গে এ বাস্তবতাও তারা স্মরণ করিয়ে দেন যে দারিদ্র্য যতটুকু কমার কথা ছিল, সে তুলনায় কমেনি।

বিবিএস প্রকাশিত খানা আয় ও ব্যয় জরিপ ২০২২ অনুসারে, দেশে সার্বিক দারিদ্র্যের হার কমে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে নেমেছে। ছয় বছর আগে ২০১৬ সালে এ হার ছিল ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ। অতিদারিদ্র্যের হার এখন ৫ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে, যা ছয় বছর আগে ছিল ১২ দশমিক ৯ শতাংশ।

বিবিএস প্রকাশিত দারিদ্র্যের হারের তথ্য-উপাত্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, দুই বছর ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলছে। এর প্রভাব দারিদ্র্যের হার কমে যাওয়ার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। এ সময়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে গরিব ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের খাদ্যতালিকা ছোট হয়েছে। তাহলে ক্যালরি গ্রহণ বাড়ে কীভাবে? আবার শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত বরিশালে দারিদ্র্য বাড়বে কেন? জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বেশি খুলনা জেলায়। সেখানে দারিদ্র্য বেশি বাড়ার কথা, অথচ দারিদ্র্য কমেছে। অন্যদিকে শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত বরিশাল বিভাগে দারিদ্র্য সবচেয়ে বেশি। দেশের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র ঢাকায়ও দারিদ্র্য বেড়েছে। কিন্তু কীভাবে দারিদ্র্য বাড়ল, তা দেখা উচিত।

দারিদ্র্য কমানোর প্রক্রিয়ায় দারিদ্র্যসীমার কিছুটা ওপরে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য সুরক্ষা বেশি জরুরি। কারণ হঠাৎ আসা যেকোনো ধরনের আঘাতে তারা দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যেতে পারে। তাদের সুরক্ষা দিতে পারলে দারিদ্র্য বিমোচন টেকসই হবে। মূল্যস্ফীতি সমন্বয় করে পরিবারের আয় দেখালে হয়তো দারিদ্র্য পরিস্থিতির আরেকটি চিত্র পাওয়া যেত।

দেশকে উন্নয়নশীল থেকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করতে প্রতিটি সেক্টরে নির্ভুল ও সময়ানুগ তথ্য-উপাত্তের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। দেশের সব খাতে পরিসংখ্যানের তথ্য-উপাত্তের প্রয়োগ বাড়লে অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি আরো বাড়বে। টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সঠিক, নির্ভরযোগ্য এবং সময়োপযোগী তথ্য-উপাত্ত ভিত্তি হিসেবে কাজ করে এবং আমাদের পরিবর্তিত বিশ্বকে বুঝতে সাহায্য করে। সঠিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্তকে গুরুত্ব দিতে হবে। মানুষের সুষম উন্নয়নের জন্যও সঠিক পরিকল্পনার জন্য নির্ভুল তথ্য-উপাত্ত প্রয়োজন। যেকোনো দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে সঠিক ও সময়োচিত তথ্য-উপাত্তের ব্যবহার অপরিহার্য। নির্ভুল ও সঠিক তথ্য প্রকাশে বিবিএসকে আরো দায়িত্বশীল হতে হবে।