প্রায় দেড় বছর ধরে মূল্যস্ফীতি বাগে আনতে পারছে না বাংলাদেশ। করোনা মহামারী ও গত বছর শুরু হওয়া ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে কয়েক মাস বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি চড়া ছিল। কিন্তু এরই মধ্যে বেশির ভাগ দেশ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে। গত বছর প্রায় দেউলিয়া হয়ে পড়া শ্রীলংকাও মূল্যস্ফীতি দুই অংকের ঘর থেকে ৪ শতাংশে নামিয়ে আনতে সমর্থ হয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতও গত মাসে বেশ নিয়ন্ত্রণে এনেছে খাদ্য মূল্যস্ফীতি। এছাড়া ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে প্রাথমিক ধাক্কা খেলেও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জার্মানির মতো উন্নত দেশগুলোও রাশ টেনে ধরতে সমর্থ হয়েছে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি। কিন্তু বাংলাদেশ যেন কোনো কূলকিনারা পাচ্ছে না। 

বণিক বার্তায় প্রকাশ, দেশে খাদ্যপণ্যের দামসহ জীবনধারণের খরচ ক্রমেই বেড়ে চলেছে। বাড়ছে মূল্যস্ফীতি। গত আগস্টে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৯২ শতাংশে। এর মধ্যে রেকর্ড বেড়েছে খাদ্য মূল্যস্ফীতি। গত মাসে এর হার ছিল ১২ দশমিক ৫৪ শতাংশ, যা জুলাইয়ের চেয়ে বেড়েছে ২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। সব মিলিয়ে দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি প্রায় ১২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। বিশ্ববাজারে যদিও খাদ্যপণ্যের দাম কমছে প্রতিনিয়ত। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য বলছে, বৈশ্বিক খাদ্য মূল্য সূচক আগস্টে গত দুই বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) গতকাল আগস্টের সার্বিক মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশ করেছে। তাতে দেখা যায়, আগস্টে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়লেও কমেছে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি। জুলাইয়ে ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি হলেও পরের মাসে তা ৭ দশমিক ৯৫ শতাংশে নেমেছে। সার্বিক বা গড় মূল্যস্ফীতি শূন্য দশমিক ২১ শতাংশ বেড়ে এখন ১০ ছুঁইছুঁই। জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৬৯ শতাংশ। এক মাসের ব্যবধানে তা বেড়ে হয়েছে ৯ দশমিক ৯২ শতাংশ। জুনে গড় মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ। 

আগস্টে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে রেকর্ড হারে, ১২ দশমিক ৫৪ শতাংশ, যা গত ১১ বছর সাত মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। গত বছরের একই সময়ে এ হার ছিল ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ। এর আগে ২০১২ সালের জানুয়ারি মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১২ দশমিক ৭৩ শতাংশে উঠেছিল। প্রায় ১২ বছরের মধ্যে আগস্টে হঠাৎ খাদ্য মূল্যস্ফীতি প্রথমবারের মতো দুই অংকের ঘরে উঠে যায়। 

বিবিএসের হিসাবে, একটি পরিবারে যত অর্থ খরচ হয়, তার ৪৮ শতাংশের মতো খরচ হয় খাবার কিনতে। সেই খাবারের খরচ জোগানোর ক্ষেত্রে অনেক সাধারণ মানুষ এখন চাপে পড়ছে। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তাদের আয় বাড়ছে না। ফলে তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে, প্রকৃত অর্থে তারা আরো গরিব হয়ে যাচ্ছে। গ্রাম-শহর নির্বিশেষে খাদ্য মূল্যস্ফীতি এখন ১২ শতাংশের বেশি। তবে এ হার আবার গ্রামাঞ্চলে বেশি। গত আগস্টে গ্রামে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ১২ দশমিক ৭১ শতাংশ। আর শহরে তা ছিল ১২ দশমিক ১১ শতাংশ। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে গ্রামাঞ্চলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ। তুলনায় শহরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ। 

এদিকে দেশের বাজারে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার বাড়লেও বিশ্ববাজারে ক্রমেই কমছে খাদ্য মূল্য সূচক। এফএওর ‘ফুড প্রাইস ইনডেক্স’ অনুযায়ী, ২০২০ সালে বৈশ্বিক খাদ্য মূল্য সূচক ছিল ৯৮ দশমিক ১ পয়েন্ট, যা ২০২১ সালে বেড়ে হয় ১২৫ দশমিক ৭ পয়েন্ট। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে তা আরো বেড়ে ১৪৩ দশমিক ৭ পয়েন্টে দাঁড়ায়। যদিও চলতি বছরের আগস্টে বৈশ্বিক খাদ্য মূল্য সূচক কমে ১২১ দশমিক ৪ পয়েন্টে নেমেছে, যা গত দুই বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০২২ সালের আগস্টেও এ সূচক ছিল ১৩৭ দশমিক ৬ পয়েন্ট। সে হিসাবে গত এক বছরে খাদ্য মূল্য সূচক কমেছে ১৬ দশমিক ২ পয়েন্ট। 

বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম কমলেও আমাদের দেশে চিত্র পুরো উল্টো। ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলংকা গত বছরেও এত খারাপ অবস্থায় ছিল, তারা এখন পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আমাদের এখানে ইউক্রেন যুদ্ধ ও করোনা মহামারীসহ সব বৈশ্বিক সংকটের দোহাই দেয়া হয়। বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, এ পরিস্থিতি থেকে অন্যরা কীভাবে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে? তারা বলছেন, আমাদের দেশে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিতে মূলত প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়া। আর টাকার মান কমে যাচ্ছে রফতানি আয় ও রেমিট্যান্স কমে যাওয়া এবং রফতানির আড়ালে টাকা পাচারের কারণে। সার্বিকভাবে তাই সবকিছুর দাম বেড়ে যাচ্ছে। এসব জায়গায় সরকারের নজরদারি বাড়ানোর কথা থাকলেও তা লক্ষ করা যায়নি। 

দুগ্ধজাত পণ্য, তেলবীজ, মাংস, দানাজাতীয় খাদ্যপণ্যসহ প্রায় সব ধরনের খাবারের দামই কমেছে বিশ্ববাজারে। যদিও চাল রফতানিতে ভারতের বিধিনিষেধের কারণে পণ্যটির দাম বেড়েছে। তবে রাশিয়া-ইউক্রেনের শস্য চুক্তি বাতিল হলেও গম বা ভুট্টার বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। পণ্যবাজারের মূল্য পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের নিয়মিত মাসিক প্রতিবেদনের (পিংকশিট) সেপ্টেম্বর সংস্করণের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে প্রতি টন সয়াবিন তেলের দাম ছিল ১ হাজার ৮৮৭ ডলার। কিন্তু গত আগস্টে তা ১ হাজার ১২৭ ডলারে নামে। ২০২২ সালের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে প্রতি টন ভুট্টার দাম ছিল ৩৪২ ডলার। যদিও গত আগস্টে তা কমে দাঁড়ায় ২০৭ ডলারে। গত বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে প্রতি টন গমের দাম ছিল ৪৯২ ডলার। গত মাসে তা ৩১৫ ডলারে নেমেছে।

বাংলাদেশের বাজারে অবশ্য এর প্রভাব পড়তে দেখা যায়নি। উল্টো বেড়েই চলেছে সব নিত্যপণ্যের দাম। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে, বর্তমানে রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে প্রতি কেজি মোটা চালের দাম ৪৮-৫০ টাকা। এছাড়া প্রতি কেজি খোলা আটা ৪৫-৫০ টাকা, দেশী পেঁয়াজ ৮০-৯০, আলু ৪২-৪৫, চিনি ১৩০-১৩৫, সয়াবিন তেলের লিটার ১৫৫-১৬০, ব্রয়লার মুরগির কেজি ১৭৫-১৮০ এবং গরুর মাংস ৭৫০-৭৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর এক হালি ডিম বিক্রি হচ্ছে ৫০-৫৩ টাকায়। অথচ ২০২১ সালের আগস্টে প্রতি কেজি চাল ৪৫-৫০ টাকা, প্রতি কেজি খোলা আটা ৩০-৩৩, দেশী পেঁয়াজ ৪২-৪৫, আলু ১৮-২২, চিনি ৭৫-৮০, সয়াবিন তেল ১২৬-১৩০, ব্রয়লার মুরগি ১৩০-১৪০ এবং গরুর মাংসের দাম ছিল ৫৮০-৬০০ টাকা। প্রতি হালি ডিম বিক্রি হয়েছে ৩৫-৩৭ টাকায়। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে কয়েকটি নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে দ্বিগুণ। 

বাজারে সিন্ডিকেট ও কৃত্রিমভাবে মূ্ল্য বৃদ্ধির কথা বলছেন সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তিসহ বিভিন্নজন। দেখা যায়, বিশ্ববাজারে কোনো পণ্যের দাম বাড়লে দেশের বাজারে সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে যায়। কিন্তু দাম কমলে তা আর কমতে দেখা যায় না। এটা একটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারি সংস্থাগুলোর তদারকির অভাবকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। 

দেশের বেশির ভাগ মানুষ মূল্যস্ফীতির চাপে নাজেহাল। বাজেট কমিয়ে, সঞ্চয় ভাঙিয়ে কায়দা করে বেঁচে আছে তারা। দেড় বছর ধরে মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী হলেও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি নীতিনির্ধারকদের। জরুরি খাদ্যপণ্য আমদানি বাড়িয়ে বাজার স্থিতিশীল করার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যশস্যে স্বনির্ভরতা অর্জনের দিকে এগোতে হবে। সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা প্রান্তিক মানুষ, নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত যেন টিসিবি থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে খাদ্যপণ্য কিনতে পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে। বাজারে কৃত্রিমভাবে যারা দাম বাড়াচ্ছেন, মজুদদারি করছেন তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে সমন্বয় জরুরি।