সম্প্রতি দেশে মূল্যস্ফীতির সর্বশেষ উপাত্ত বের হয়েছে। এতে দেখা গেছে, গত আগস্টে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৯২ শতাংশ। শহর ও গ্রামের মধ্যে তুলনা করলে দেখা যাচ্ছে, গ্রামে এর ধকল বেশি। গ্রামাঞ্চলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ। অন্যদিকে শহরের সার্বিক মূল্যস্ফীতি হচ্ছে ৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ। এটা হচ্ছে আমাদের সার্বিক মূল্যস্ফীতির চিত্র। অন্যদিকে প্রান্তিক আয়ের মানুষের কথা চিন্তা করলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি সবার আগে আমলে নিতে হয়। গ্রাম ও শহর মিলিয়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১২ দশমিক ৫৪ শতাংশ। আলাদাভাবে দেখলে গ্রামাঞ্চলের খাদ্য মূল্যস্ফীতি শহরের থেকে বেশি। মূল্যস্ফীতি সরকারি হিসাবে যা এল তা অনেক বেশি। বাস্তবতা হয়তো আরো ভিন্ন। উন্নয়নশীল দেশের ক্ষেত্রে, সরকারের একটা প্রবণতা থাকে মূল্যস্ফীতির ফিগার একটু কমিয়ে দেখানো। একাডেমিক দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করলে বাংলাদেশেও হয়তো তা-ই হয়েছে। প্রকৃত মূল্যস্ফীতি হয়তো তার চেয়েও বেশি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি গণনা করার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশে একই ধরনের প্রবণতা লক্ষ করা যায়। 

সরকার যে মূল্যস্ফীতির উপাত্ত প্রকাশ করেছে প্রকৃত চিত্র তা হলেও কিন্তু প্রান্তিক আয়ের মানুষের জন্যে তা ভয়ানক। মূল্যস্ফীতির হার মাঝেমধ্যে একটু কমতেই পারে। কিন্তু এর পুঞ্জীভূত বিরূপ প্রভাব সর্বদা বহমান। গড় দাম কিংবা দামস্তর একবার বাড়লে তা তো নেমে আসবে না যদি না মূল্যস্ফীতি ঋণাত্মক হয়। আনুপাতিক হারে আয় না বাড়লে ভোগের ওপর এর বিরূপ প্রভাব বিদ্যমান থাকবেই। আর উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলতে থাকলে জীবনযাপন কঠিন থেকে কঠিনতর হবে, এটাই স্বাভাবিক। মূল্যস্ফীতির যে চাপ তা সবার ওপরই পড়ে এবং সেটা বুঝতে কোনো বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। কোনো দেশে যখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি থাকে তা সবাইকে প্রভাবিত করে। তার পরও উচ্চ ও মধ্যম আয়ের মানুষেরা চাপ থাকলেও মানিয়ে নেয়। কিন্তু যারা নিম্ন আয়ের মানুষ এমনিতেই তাদের নুন আনতে পানতা ফুরায়, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির মানে হলো সামগ্রিকভাবে অতিরিক্ত চাপ। জীবন ধারণের জন্য যে ন্যূনতম ভোগ প্রয়োজন তাদের জন্য তা ধরে রাখা কঠিন। মূল্যস্ফীতি সহসাই যে নেমে আসবে সে রকম আশাব্যঞ্জক কিছু সামনে দেখছি না। 

এখন প্রশ্ন হলো এ মূল্যস্ফীতির কারণ কী? মূল্যস্ফীতি কয়েকটা কারণে হতে পারে। প্রথম কারণ হচ্ছে, আমরা যখন উচ্চপ্রবৃদ্ধি অর্জন করতে চাই অর্থাৎ আমরা যখন সেবা ও দ্রব্যসামগ্রী বেশি উৎপাদন করতে চাই, তখন উৎপাদনের উপকরণগুলো বেশি নিয়োগ করতে হয়। বেশি উৎপাদন চাইলে উপকরণের বাড়তি চাহিদার সঙ্গে সঙ্গে এসবের দামও বাড়ে। এ মূল্যবৃদ্ধির ফলে আমাদের উৎপাদন খরচও বেড়ে যায়। আর এ খরচ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে পণ্য ও সেবাসামগ্রীর দাম বেড়ে মূল্যস্ফীতি দেখা দেয়। বাজার ব্যবস্থাপনায় প্রতিযোগিতার অভাবে খরচের তুলনায় দাম একটু বেশিই বাড়ে। সেটা একটা কারণ। বর্তমানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার তুলনামূলক কম হওয়ায় উচ্চ মূল্যস্ফীতির মূল কারণ এটা না। প্রবৃদ্ধি কম কিন্তু মূল্যস্ফীতি বেশি—সেটা আমাদের অর্থনীতির জন্য বিপজ্জনক। 

এদিকে আমাদের উৎপাদন খরচ বাড়ছে। এর একটা কারণ হচ্ছে, জ্বালানি ও সারের দামের সমন্বয়। এগুলো উৎপাদনে চাপ তৈরি করেছে। অন্যদিকে আমরা বাইরে থেকে উৎপাদনের যে উপকরণ বা কাঁচামাল আমদানি করি, বিশ্ববাজারে সেসবের দাম এবং ডলারের দাম বাড়ায় আমদানি ব্যয় বেড়েছে। যা আমাদের উৎপাদনের খরচ বাড়িয়ে পরোক্ষভাবে দাম বাড়িয়েছে। বাহির থেকে উপকরণ আমদানি করা হোক কিংবা সরাসরি ভোগের জন্য চূড়ান্ত দ্রব্য আমদানি করা হোক সবই পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে পণ্যসামগ্রীর দাম বাড়িয়ে দিয়েছে এবং দিচ্ছে, যা উচ্চ মূল্যস্ফীতির একটা মূল কারণ। এখন আরেকটা বিষয় মাথায় রাখতে হয়, দাম বাড়বে বলে মনে করাটাও দাম বাড়ার ক্ষেত্রে প্রভাব রাখছে। সেটা ঘটছে মূল্যস্ফীতিজনিত প্রত্যাশার কারণে। যাদের পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়েনি, তারাও দেখে যে সবকিছুর দাম বেড়ে যাচ্ছে, তখন তারাও দাম বাড়িয়ে দেয়। উৎপাদন খরচ না বাড়লেও কিন্তু দাম বাড়নোর কিছু যুক্তি আছে। যেমন আমি যদি আগের সমান লাভ করি, আর মূল্যস্ফীতি যদি সাড়ে ১২ শতাংশ হয়, তাহলে আমাকে তো দাম বেশি দিয়ে কিনে খেতে হবে, তাই না? আমি যা কিনব সেগুলোর জন্য আমাকে বেশি খরচ করতে হবে। সে জন্য আমারও লাভ বেশি করতে হবে, আনুপাতিক হারে। ফলে আমার উৎপাদন উপকরণের দাম না বাড়লেও কিন্তু আমি খানিকটা দাম বাড়িয়ে দেব। সেটাই কিন্তু বাংলাদেশে হচ্ছে। প্রায়ই আমরা সংবাদমাধ্যমে দেখি যে কিছু কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে যাদের দাম বাড়ানোর কোনো কারণ নেই, যাদের উৎপাদন খরচ বাড়েনি, তারাও দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর পেছনে যুক্ত কী? যুক্তি এটাই যে তাকেও তো বেশি দাম দিয়ে কিনে খেতে হবে। বেশি দাম দিয়ে কিনে খেতে হলে তো তাকে বেশি লাভ করতে হবে। তো এভাবেই দাম বাড়ছে। 

উৎপাদন খরচ যদি নাও বাড়ে তার পরও দাম বাড়তে পারে। যেমন চাহিদার সাপেক্ষে সরবরাহের ঘাটতি হলে দাম বাড়তে পারে। যেমন আমরা এখন ডলারের রিজার্ভ ধরে রাখার জন্য আমদানি খুব কমিয়ে দিয়েছি। এ কম আমদানির কারণে আমরা যে বিদেশী পণ্যগুলো ভোগ করি তার দাম বেড়ে যাচ্ছে। বাজারে যে পরিমাণ চাহিদা আছে, দেখা যাচ্ছ তার চেয়ে সরবরাহ কম। তো এটা একটা কারণ। অন্যদিকে কাঁচামাল বা উপকরণ আমদানি কম করছি মানে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন যদি আনুপাতিক হারে কম বাড়ে তাহলে বাজারে যে সরবরাহ থাকার কথা সেটাও একটু শ্লথ হবে। সরবরাহ যদি চাহিদার তুলনায় কম হারে বাড়ে তাহলে বাজারে চাহিদা ও জোগানের মধ্যে একটা ফারাক তৈরি হবে। তার কারণে, অর্থাৎ ঘাটতির কারণে কিন্তু খানিকটা দাম বাড়বে। শুল্ক বাড়িয়ে পণ্য আমদানি কমানোর নীতিও কিছু পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। এগুলোর সব এখানে কাজ করছে। 

অন্যদিকে সরকারের যে আর্থিক ব্যবস্থাপনা তাও মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিচ্ছে। যেহেতু অর্থনীতি চাপের মুখে আছে, আমাদের রাজস্ব সংগ্রহ চাপের মুখে পড়েছে। আমরা জানি যে বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা ছাপাচ্ছে সরকারের ব্যয় নির্বাহের জন্যে। সেটার একটা প্রভাব আস্তে আস্তে পড়বে। এখন মানি প্রিন্টিংয়ের দিক থেকে হয়তো অতটা প্রভাব আসেনি। কেন? কারণ, যদিও সরকার মানি প্রিন্ট করেছে, আগে যেহেতু অনেক ডলার বিক্রি করেছে সেহেতু অনেক টাকা বাংলাদেশ ব্যাংক তুলে নিয়েছিল। সেই হিসেবে এখন টাকা প্রিন্ট করে বাজারে একটু সাপ্লাই বাড়ালেও এর প্রভাব খুব একটা পড়ছে না মূল্যস্ফীতির ওপর। সামনের দিকে টাকা ছাপানোর ফলে যে মূল্যস্ফীতির প্রভাব সেটাও কিন্তু আসবে। সরকার যেহেতু রাজস্ব সংগ্রহে চাপে আছে, সরকারি মেশিনারিজ সচল রাখতে, ঋণ শোধ করতে এবং অন্যান্য দায় মেটাতে সরকার অবশ্যই টাকা ছাপানো অব্যাহত রাখবে। ফলে ক্রমাগত যদি আমরা টাকা প্রিন্ট করে যাই, তাহলে কিন্তু এর একটা প্রভাব মূল্যস্ফীতির ওপর পড়বে। পাশাপাশি অন্যান্য প্রভাব তো থাকবেই। ফলে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘায়িত হবে এবং নিম্ন আয়ের মানুষের ভোগান্তি চলতেই থাকবে। সাময়িক চাপ একটু আধটু কমলেও এর বিরূপ প্রভাব চলমান থাকবে। 

শিগগিরই যুদ্ধাবসান হয়ে যাবে মনে হচ্ছে না। বিশ্ব অর্থনীতি যে চাপের মুখে আছে তা যে এখনই কমে আসবে তাও কিন্তু আমরা বলতে পারছি না। সেই হিসেবে কিন্তু এই চাপটা কন্টিনিউ করবে। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতাও পরিস্থিতি আরো জটিল করে তুলতে পারে। শিগগিরই মূল্যস্ফীতিকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করে ফেলতে পারব, এ কথা মনে করা বাস্তবসম্মত হবে না। এক কথায় এর সমাধানও হুট করে কেউ বলে দিতে পারবে না। বৈশ্বিক অর্থনীতির চাপ আছেই, এছাড়া নিকট অতীতে আমরা যে ভুলগুলো করেছি, পলিসিগত ভুল এবং আমরা অনেক বেশি বাস্তবমুখী চিন্তা না করে অনেকটা উচ্ছ্বাসে ভেসে গিয়ে যে বড় ধরনের প্রজেক্টগুলো নিয়েছি, টাকা অতিমূল্যায়িত রেখেছি, বেশি বেশি ঋণ করেছি, সেগুলোর একটা চাপও আমাদের এখন নিতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে সামষ্টিক অর্থনীতি চাপের মধ্যেই থাকবে অনেক দিন। এখন প্রশ্ন আসতেই পারে যে করণীয় কী? করণীয় হলো কোনো না কোনোভাবে যারা নিম্ন আয়ের মানুষ, প্রান্তিক মানুষ, দেশের এই ২৫-৩০ শতাংশ মানুষকে অনেক দিন ধরে, বেশি পরিমাণে নিত্যপণ্যের ক্ষেত্রে সহায়তা করা যেতে পারে। এখন যেটা দেখতে পারছি, তা আরো বাড়াতে হবে, বড় আকারে করতে হবে। যদিও সরকারের ওপর এটা আরো বাড়তি চাপ তৈরি করবে। 

ড. মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ,

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

অনুলিখন: অনি আতিকুর রহমান