মুদ্রানীতি কার্যকরের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা পরিস্থিতি সৃষ্টির পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড) ও ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ইসিবি) সরাসরি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নগদ অর্থ সরবরাহ করেছে। মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখার স্বার্থে এটা করতে গিয়ে তারা তাদের ব্যালান্স শিট বড় করে ফেলেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, আগের ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার, আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার পুনরুজ্জীবনের এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যালান্স শিট সংকোচনের? নাকি কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর নতুন এ বন্দোবস্তই ‘নিউ নরমাল’ বা নতুন বাস্তবতা হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে?
নিশ্চিতভাবেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এরই মধ্যে তাদের ব্যালান্স শিট সংকোচনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। প্রাথমিকভাবে, ধীরে ধীরে বন্ডের মজুদ কমিয়ে সংকোচনের আভাস দিয়েছে ফেড ও ইসিবি। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ব্যালান্স শিট সম্প্রসারণের যে প্রধান কারণ তারই কোনো সুরাহা হয়নি। আর্থিক খাতে রিজার্ভ সরবরাহ থেকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর দায় বেড়েছে। যদিও-বা ফেডারেল রিজার্ভ এটিকে নতুন কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করেছে তথাপি ইসিবি এই পলিসি কেবল পর্যালোচনা করে দেখছে।
মৌলিক যে প্রশ্ন এখানে উত্থাপন করা জরুরি সেটি হচ্ছে, আর্থিক স্থিতিশীলতা আনতে ব্যাংক ও আর্থিক খাতে যে নগদ অর্থ সরবরাহ করা হয়েছে তা কি ঝুঁকি আরো বাড়াল? এখানে শুরুতে একটি বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে তা হলো, কেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো প্রথম সারির ব্যাংকগুলোকে রিজার্ভ প্রদান শুরু করেছে। ২০০৮ সালের মন্দা পরিস্থিতিতে ব্যাংকের ঋণযোগ্যতার ওপর মানুষের প্রবল আস্থা সংকট তৈরি হয়। যার ফলস্বরূপ আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার স্থবির হয়ে পড়ে এবং এর ক্রমবিকাশমান হুমকি কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে উল্লিখিত পদক্ষেপ গ্রহণে বাধ্য করে। বর্তমানে প্রত্যেক মার্কেট অংশীজনকে সুচারুভাবে তারল্য সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো (কর্তৃপক্ষ) তাদের ব্যালান্সশিট আর্থিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতিস্থাপন করছে।
কিন্তু নতুন পলিসির সঙ্গে প্রথাগত বা পুরনো আর্থিক পলিসির একটি সুস্পষ্ট পার্থক্য থাকা উচিত ছিল যা এখানে অনুপস্থিত। ফেড ও ইসিবি উভয়ই এ সমস্যার আপাত সুরাহা করেছে রিজার্ভের ওপর সুদ প্রদানের মাধ্যমে। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় রিজার্ভের পরিমাণ বাড়ানো বা কমানোর জন্য বাজারের কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করার পরিবর্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যালান্সের ওপর সুদের হার প্রয়োগ করে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রাতারাতি সুদের হার নির্ধারণ করে। এটিই তাদের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজনীয় রিজার্ভ সরবরাহে সহযোগিতা করে। একই সঙ্গে প্রয়োজনে আর্থিক নীতির মধ্যেই স্বল্পমেয়াদি সুদের হার নির্ধারণ অব্যাহত রাখে।
আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এ “‘পর্যাপ্ত রিজার্ভ’ পদ্ধতির ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যালান্স শিট এরই মধ্যে ফুলেফেঁপে উঠেছে। এটাও লক্ষণীয় যে এই সিস্টেমের অধীনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যালান্স শিট বাজারের তারল্য চাহিদার ওপর নির্ভরশীল। লক্ষণীয় হচ্ছে, চাহিদা ও ব্যালান্স শিট উভয়ই পরিবর্তনশীল ও অননুমেয়।
বর্তমানে অনেক বিশেষজ্ঞ মত প্রকাশ করেন যে সংকট-পরবর্তী আর্থিক পলিসি কাঠামো একটি উদ্ভুত ক্রেডিট সংকট মুহূর্তের জন্য উপযুক্ত ছিল, কিন্তু স্বাভাবিক অবস্থায় এটি কার্যকর নয়। এটিকে এখনো কার্যকর রাখা আন্তঃব্যাংক আর্থিক বাজারকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সুবিধার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল করে তুলছে।
যা-ই হোক, এ ঝুঁকিগুলো কাটিয়ে মোকাবেলা করা একেবারে অসম্ভব নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেকোনোভাবে বিনামূল্যে তারল্য সুবিধা দেয়ার মাধ্যমে এর সহজ সমাধান সম্ভব। অতীতের উদাহরণ থেকে স্পষ্ট যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভের মুখাপেক্ষী হওয়া আর্থিক বাজারের নতুন কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যের একটি। যেখানে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, যে রেগুলেশনগুলো তাদের আর্থিক নিরাপত্তা প্রদান করেছে সেগুলোই একই সঙ্গে কম তারল্য সম্পদ রাখাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
এখানে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে আর্থিক পলিসিগত ঝুঁকি। যেহেতু বৃহৎ রিজার্ভের বিপরীতে অ্যাসেট (প্রধানত ট্রেজারি) থাকতে হয় এবং সুদের হার বাড়াতে হয়, তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের আর্থিক পলিসিগত প্রভাব রয়েছে। পলিসিগত এ অস্থিরতার ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিট আয়ে প্রভাব পড়ছে এবং কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানের মোট নিট মূলধনও নেতিবাচক সূচকে নেমে গেছে।
এটি কোনোভাবে সমস্যাপূর্ণ কিনা? যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো একক আর্থিক পদ্ধতিতে সরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে ঝুঁকির পুনর্বণ্টন অনেকটা অস্বাভাবিক ঘটনা। যেহেতু এ ধরনের পলিসি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় সংশয় ত্বরান্বিত করে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতাকে আরো দারুণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে, তাই উল্লিখিত ঝুঁকি খুব বেশি প্রণিধানযোগ্য নয়।
ইউরোজোনে বাস্তবতা একটু ভিন্ন, যেখানে কোনো একক রাজস্ব কর্তৃপক্ষ বা ইউরো নির্ধারিত নিরাপদ সম্পদ (ইউরোজোনের যৌথ রাজস্ব সংরক্ষিত একটি নিরাপদ বন্ড) নেই, তাই ঝুঁকিগুলোর প্রভাব দেশজুড়ে সমানভাবে পরিলক্ষিত হয় না। এটি আর্থিক সমস্যার সঙ্গে জড়িত, রাজস্ব সমস্যা নয়। তা সত্ত্বেও, ইউরোজোন, তার বর্তমান শাসন কাঠামোয়, বাজার অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে নিরাপত্তার উচ্চ চাহিদা মেটাতে পারে কিনা তা নিয়ে সংশয়ের আবির্ভাব হয়েছে।
সার্বিকভাবে সংকট-পরবর্তী আর্থিক নীতি পদ্ধতির স্বাভাবিকীকরণ বিতর্কে দুটো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের প্রতি নজর রাখা জরুরি। প্রথমত, যেটি সব বিষয়ে সঙ্গে প্রাসঙ্গিক, তা হলো আর্থিক ব্যবস্থা এবং কোষাগারের মধ্যে প্রবাহ বৃদ্ধি পেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা মসৃণ হবে কিনা? দ্বিতীয়ত, যেটি শুধু ইউরোজোনের জন্য প্রাসঙ্গিক, আর্থিক ইউনিয়নের বিভক্ত শাসন কাঠামো আর্থিক সংকট-পরবর্তী বিশ্বের পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা? অতীতের বিভাজননীতি রাজস্ব ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করার জন্য একটি বাধা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল; বর্তমানে এটি একটি ইসিবি অপারেশনাল ফ্রেমওয়ার্কের ডিজাইনের জন্য একটি শক্তিশালী সমস্যা হিসেবে পুনরায় আবির্ভূত হচ্ছে, যা আর্থিক স্থিতিশীলতা ও জুতসই আর্থিক নীতিকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
লুক্রেজিয়া রিচলিন: ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গবেষণা পরিচালক, লন্ডন বিজনেস স্কুলের অর্থনীতির অধ্যাপক এবং ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ডস ফাউন্ডেশনের ট্রাস্টি
ভাষান্তর: রায়হান উদ্দীন










