দেশের উচ্চ মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক এ পর্যন্ত নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু সেসব পদক্ষেপ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। দাম বেঁধে দেয়া, কিছু পণ্যের আমদানি শুল্ক হ্রাস বা প্রত্যাহার, বাজার তদারকি এবং দফায় দফায় নীতি সুদহার বাড়ানোর কোনো প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে লক্ষণীয় নয়। উল্টো দিন দিন মূল্যস্তর আরো স্ফীত হচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর শেষে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৮৭ শতাংশে, যা এর আগের মাসে ছিল ৯ দশমিক ৯২ শতাংশ। গত মাসে দেশে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি হয়েছে ১২ দশমিক ৬৬ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩৪ শতাংশে। এ পরিস্থিতিতে সরকারের বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। নয়তো জনগণের ওপর আর্থিক চাপ আরো বাড়তে থাকবে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানো কঠিন হবে।

দীর্ঘকাল ধরেই দেশের অর্থনীতি বহুমুখী চাপের মধ্যে রয়েছে। টানা দুই বছরেরও অধিক সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজমান। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বের অনেক দেশেই মূল্যস্ফীতি বেড়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বড় অর্থনীতির দেশগুলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমাতে সফল হলেও বাংলাদেশ তা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমিয়ে আনতে পারেনি। যেখানে দেউলিয়া হয়ে যাওয়া শ্রীলংকাও মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনতে পেরেছে।

বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচলিত পদক্ষেপ হলো সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি, বিশেষ করে নীতি সুদহার বাড়িয়ে অর্থপ্রবাহে লাগাম টানা। এদিকে দেশে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি নেয়ার পরও দীর্ঘদিন ঋণ ও আমানতের সুদহার যথাক্রমে নয়-ছয় করে রাখা হয়েছিল। উপরন্তু সে সময় বিগত সরকারের অন্যতম ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে বাংলাদেশ ব্যাংক। এভাবে সেই পদক্ষেপের কার্যকর সুফল পাওয়া যায়নি। আবার বর্তমানে যখন সুদহার বাড়ানো হচ্ছে, সংকটে থাকা অর্থনীতি আরো ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। বাড়তি সুদের কারণে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা ঋণ গ্রহণে নিরুৎসাহিত হয়েছে। গত আগস্টে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এক ধরনের শ্লথগতি নেমে এসেছে, যা উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে। চাহিদামাফিক পণ্য সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক বন্যার কিছুটা প্রভাব থাকলেও বাস্তবে সংকট তৈরি হয়েছে অদক্ষ বাজার ব্যবস্থাপনার কারণে। যে কারণে আমদানি প্রক্রিয়া সহজ করেও এর প্রভাব বাজারে দৃশ্যমান নয়। এ অবস্থায় সরকারকে বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নিতে হবে যাতে মূল্যস্তর সহনীয় পর্যায়ে আনা যায়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে জনসম্পৃক্ততা সেভাবে না থাকায় বাংলাদেশে উন্নত বিশ্বের মতো কেবল সুদহার বাড়ানোর পদক্ষেপে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধের মাধ্যমে কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা এবং রাজস্বনীতির পরিবর্তনের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

বর্তমানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে হবে। পাশাপাশি বাজারকে প্রতিযোগিতা সক্ষম করতে তুলতে হবে। এর জন্য কেবল বাজার তদারক করলেই চলবে না। সমস্যার মূল চিহ্নিত করে তা সমাধান করতে হবে। নিত্যপণ্যের বাজারে চাহিদামাফিক সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। সেজন্য উৎপাদন পর্যায়ে ঘাটতি থাকলে আমদানির ব্যবস্থা নিতে হবে। আমদানি ব্যয় কমাতে শুল্ক হার যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার কথা সংশ্লিষ্টরা হরহামেশাই বলে থাকেন। তবে শুল্ক কমিয়ে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে যথাসময়ে শুল্ক কমানো প্রয়োজন। কারণ শুল্ক কমিয়ে তৎক্ষণাৎ এর ফলাফল পাওয়া যায় না। যেহেতু আমদানি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ব্যাপার। এছাড়া সরবরাহ শৃঙ্খলে বিশৃঙ্খলা থাকলে শুল্ক ছাড়ের সুফল ভোক্তারা পাবে না। শুল্ক ছাড়ের টাকা সিন্ডিকেটের পকেটে ঢুকে যাবে। তাই দক্ষ বাজার ব্যবস্থাপনা ও বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিযোগিতা থাকলে কেউ সহজে দাম বাড়াতে পারে না। প্রতিযোগিতা কমিশনকে এক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। আমদানিকারকদের সংখ্যা বাড়িয়ে বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে যেন বাজার কোনো সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি হয়ে না পড়ে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে সরকারের রাজস্ব নীতিতে পরিবর্তন আনা। করজালের আওতা বাড়লে মানুষের ব্যয়যোগ্য আয়ের পরিমাণ কমে যায়। তবে করারোপের ক্ষেত্রগুলো খুব সতর্কভাবে নির্ধারণ করতে হবে, যাতে নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের ওপর আরো আর্থিক চাপ না পড়ে। এছাড়া সরকার বিভিন্ন অনুৎপাদনশীল খাতে খরচ কমিয়ে উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় বাড়াতে পারে। এতে বাজারের চাহিদামাফিক নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ বাড়াতে উৎপাদনশীল খাতে ভর্তুকি বাড়িয়ে উৎপাদন ব্যয় কমানো সম্ভব। এর প্রভাবে বাজারদর কমে আসতে পারে।

বাজারদর ক্রমাগত বাড়ার ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে এসেছে। বিগত সরকারের আমলে দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারা এ মূল্যস্ফীতির জন্য দায়ী করা হয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ অর্থনীতির বহিঃস্থ উপাদানগুলোকে। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মূল্যস্ফীতি জেঁকে বসেছে মূলত অভ্যন্তরীণ উপাদানগুলোর কারণেই।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সফলতা দেখালেও বাংলাদেশ বারবার ব্যর্থ হওয়ার অন্যতম কারণ অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো আমলে নিয়ে সমাধানের পথে হাঁটা হয়নি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও সবগুলোই ছিল খাপছাড়াভাবে নেয়া। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি নেয়া হলেও বাজেট ছিল সম্প্রসারণমূলক। ফলে বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার দেশের ব্যাংক খাত থেকে ঋণের পরিমাণ বাড়িয়েছে। এতে বঞ্চিত হয় বেসরকারি খাত এবং এক ধরনের কোণঠাসা অবস্থায় পড়তে হয়েছে খাতটিকে। বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত পদক্ষেপ নেয়া যথোচিত হবে। মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতির সমন্বয় ও কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মূল্যস্তর নিচে নামিয়ে আনতে হবে।