ড. জাইদি সাত্তার বাংলাদেশভিত্তিক থিংক ট্যাংক পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান। বাংলাদেশ সরকারের ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নের বিশেষজ্ঞ দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি। বোস্টন ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি অব আমেরিকা, বোস্টন ইউনিভার্সিটি ও ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটসে অর্থনীতি পড়িয়েছেন। দেশের কর কাঠামো, রিজার্ভ পতন, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ইস্যুতে সম্প্রতি কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম
আমাদের কর কাঠামোয় কী কী সমস্যা আছে? আমাদের কর ব্যবস্থা সংস্কারে কাজ করেছেন, সে অভিজ্ঞতার আলোকে কর কাঠামোর কোথায় কোথায় সংস্কার জরুরি বলে মনে করেন?
আমাদের কর কাঠামো একটা মধ্যযুগীয় ব্যবস্থা। আমরা কীভাবে কর আহরণ করি: প্রত্যক্ষ কর, মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট এবং বাণিজ্য কর। সব মিলিয়ে আমাদের পুরো যে কর ব্যবস্থা দাঁড়িয়েছে তা অনেক পুরনো। এখানে মৌলিক কতগুলো সংস্কারের প্রয়োজন। কর আহরণ প্রক্রিয়া ও কর ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন করা প্রয়োজন। মান্ধাতার আমলের প্রক্রিয়া অনুসরণ বাদ দিয়ে ডিজিটালাইজ করা উচিত। ১৯৯০-এর দশকে আমরা বেশকিছু সংস্কার শুরু করেছিলাম। যেমন কাস্টমসের অটোমেশন আরম্ভ করেছিলাম; অটোমেশন হয়েছে তবে তাতে এখন শুধু ডাটা বের হয়। তবে হওয়ার কথা ছিল অটোমেটেড কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স।
আমদানি-রফতানি অটোমেটেড হওয়ার কথা ছিল। কাস্টমস অফিসে না গিয়েই যেন আমদানিকারক বা রফতানিকারক তাদের কারবার চালাতে পারে আমরা তেমন একটি বিষয় ভাবছিলাম। এসব বিষয় অটোমেটেড হওয়ার কথা থাকলেও আমাদের এসব বিষয়ে তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। এখনো সরকারি কর্মকর্তারা সেই পুরনো পদ্ধতিতেই রয়ে গেছেন। যার ফলে শুল্ক ফাঁকি দেয়ার রাস্তাগুলো প্রশস্ত হচ্ছে। তবে শুল্ক কমানোর তাগিদ থাকলে শুল্কের ফাঁকিবাজিটা বন্ধ করা যাবে। একদিকে শুল্ক বেশি, অন্যদিকে যেন শুল্ক ফাঁকি দেয়া না হয় সে বিষয়ে কথা বললে তো হবে না। শুল্ক কমালে শুল্ক ফাঁকি দেয়ার বিষয়টিও কমে যাবে বলে আমার ধারণা।
অন্যদিকে এখন পর্যন্ত আমাদের বাণিজ্য করের ওপর নির্ভরশীল। যদিও জাতীয় রাজস্ব আয়ের হিসাব অনুযায়ী বাণিজ্য করের পরিমাণ এখন ২৬ শতাংশ। সব মিলিয়ে এ সংখ্যা কম নয়। বাজারে সবচেয়ে বেশি অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে বাণিজ্য কর। এর কারণ হচ্ছে, এ কর কেউ আদায় করে কেউ করে না, কেউ কেউ ফাঁকি দেয়। আমদানীকৃত পণ্যের একেকটির দাম একেক রকম, সেক্ষেত্রে শুল্ক নির্ভর করে দামের ওপর।
১৯৯১ সালের পর ২০১২ সালে ভ্যাটের নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। তবে ভ্যাটের নীতিমালা ওভাবে মানা হচ্ছে না। ২০১২ সালের মূল যে নীতিমালা ছিল সেটা কিন্তু মানা হচ্ছে না। নানাভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে। এখন যে ভ্যাট চালু আছে সেটা সঠিক না। যে একটা দাম ছিল সেখানে অনেকগুলো দাম হয়ে গেছে। ভ্যাটের যে মৌলিক বিষয় সে অনুযায়ী এখন কাজ হচ্ছে না। ভ্যাট ট্যাক্সের ওপর আমাদের আরো বেশি নির্ভরশীল হতে হবে। এখানে করের মূল্য বাড়ানোর কোনো প্রশ্ন ওঠে না। আমাদের কর মূল্য কিন্তু মোটামুটি বেশিই বলা চলে। সবার কাছ থেকে ট্যাক্স নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া লোকজন যেন স্বেচ্ছায় ট্যাক্স আদায় করে সেজন্য নতুনভাবে কিছু করতে হবে। স্ব-উদ্যোগে ট্যাক্স প্রদান একটি মানসিক বিষয়। অন্যান্য দেশে যারা ব্যবসা-বাণিজ্য করছে তারা নিজেরাই ট্যাক্স প্রদান করে।
প্রায় দুই বছর ধরে আমাদের রিজার্ভ কমছে। এ নিম্নমুখী দৌড় কখন থামবে বলে আপনার মনে হয়?
বাংলাদেশ ব্যাংক সব সময় গ্রস রিজার্ভ ঘোষণা করে। গ্রস রিজার্ভটা এখন ব্যালান্স অব পেমেন্টের ৬ নং ধারা অনুযায়ী নির্ধারিত হচ্ছে। গ্রস রিজার্ভে আরো তিন-চারটি আইটেম রয়েছে, যেগুলো বাদ দিলে নিট রিজার্ভ আসে। এখন আপনার বক্তব্য হচ্ছে এটা কমছে কেন? এটা কমার দুটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, ২০২২ সালে অনেক বেশি আমদানি হয়েছে। এখন আমদানি কেন ৮০-৮২ বিলিয়ন ডলার হয়ে গেল ৬০ বিলিয়ন ডলার থেকে? কারণ এক্সচেঞ্জ রেটটা তখন ৮৫- ৮৬-তে রয়ে গেল। এক্সচেঞ্জ রেট যদি তখন অবমূল্যায়ন হতো তাহলে আমদানি ৭৫ বিলিয়নে হয়ে যেত। অবমূল্যায়ন তখন হয়নি বলে আমদানি বেশি হয়েছে। অবমূল্যায়ন না হলে আমদানি অনেক সস্তা মনে হয়। ৮৫ টাকা ডলারের আমদানি আর ১১৫ টাকা ডলারের আমদানির পার্থক্য আছে নিশ্চয়। যদিও ২০২২ সালে রফতানিও বেড়েছে ৩৪ শতাংশ। কিন্তু আমদানি যেহেতু অনেক বেশি হয়েছে, তাই রিজার্ভের ওপর চাপ পড়েছে বেশি। তখন আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি হয়ে গেল ৩৩ বিলিয়ন ডলার। কারেন্ট অ্যাকাউন্টে (চলতি হিসাবে) ঘাটতি হয়ে গেল সাড়ে ১৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। সামগ্রিকভাবে ব্যালান্স অব পেমেন্টে ঘাটতি হয়ে গেল ৮ বিলিয়ন ডলার। তার ওপর এক্সচেঞ্জ রেট বজায় রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে ছেড়ে দিল ১৩ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু পূর্বে প্রতি মাসে ১ বিলিয়ন ডলার করে ছাড়ছিল বাংলাদেশ ব্যাংক যা এখন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। কারণ এখন চেষ্টা করছে এক্সচেঞ্জ রেটকে একটু ছাড় দিতে, কিন্তু একটু ছাড় দিলে হবে না। কেননা এখনো আমদানির ওপর চাপ আছে। আপনারা বলছেন ডলার সংকট। ডলার সংকট কেন? কারণ আমাদের আমদানির তুলনায় ফরেন এক্সচেঞ্জ কম। আমদানির চাহিদা বেশি কারণ এক্সচেঞ্জ রেট বেশি। যদি ডলারের অবমূল্যায়ন কমে তবেই আমদানির চাহিদা কমবে। ডলার সংকট যদি মোকাবেলা করতে চান তাহলে আমদানির চাহিদা কমাতে হবে। আর আমদানির চাহিদা কমানোর উপায় হলো আমদানির মূল্য বাড়াতে হবে, শুল্ক দিয়ে বাড়াতে হবে। এছাড়া বর্তমানের মুক্তবাজার অর্থনীতিতে আমদানির ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে খুব বেশি সুফল পাওয়া সম্ভব হবে না। তবে এটা স্বাভাবিক যে রফতানি বেশি হলে আমদানিও বেশি হবে। রফতানি করতে এবং দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদন ধরে রাখতেও আমদানির প্রয়োজন আছে।
অনেক দিন ধরে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। এর পেছনের কারণ কী কী বলে মনে করেন?
২০২২ সালে মূলত দুটি ঘটনায় মূল্যস্ফীতি দেখা দেয়। প্রথমত, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তের মতো বাংলাদেশেরও সরবরাহ চেইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। দ্বিতীয়ত, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নে মূল্যস্ফীতির ওপর প্রভাব পড়ে। বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এলেও বাংলাদেশে আসেনি। দীর্ঘদিন ধরেই মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের কাছাকাছি থাকছে এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১২ শতাংশ ছাড়িয়েছে।
এখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে মুদ্রা সংকোচন নীতি অনুসরণ করতে হবে। বাংলাদেশ এরই মধ্যে সেদিকে এগোচ্ছে এবং সুদহার কয়েক দফা বাড়িয়েছে। ২০২৩ সালের জুলাই থেকে বাজেট ঘাটতি মোকাবেলায় নগদ অর্থ সরবরাহ বন্ধ রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। টাকার অবমূল্যায়নের ফলে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির ভূমিকা রয়েছে মূল্যস্ফীতির পেছনে। আবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে কড়াভাবে আমদানি নিয়ন্ত্রণ করছে তাতে সরবরাহ সংকটের কারণেও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে।
মূল্যস্ফীতির প্রধান কারণ হিসেবে যদি বলতে চাই তাহলে বলা যায় স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন। এ কারণে সমষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা স্মরণকালের সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে।
২০২৬ সালে আমরা এলডিসি থেকে বেরিয়ে আসব। বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে সম্ভাবনা কেমন আর ঝুঁকি কেমন?
সম্ভাবনা তো আছে। গ্র্যাজুয়েশন হয়ে যাবে। আন্তর্জাতিক বাজারে সুনাম হবে। ঋণ নিতে সুবিধা হবে। আর ঝুঁকি হলো স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে আমরা যেসব সুবিধা পেতাম, বিশেষ করে স্বল্প শুল্ক সুবিধা, সেখানে কিছু ঘাটতি হবে। কিন্তু আমি মনে করি যে এটা আমাদের বড় কোনো ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে না। আমাদের বেশির ভাগ রফতানি হয় ইউরোপে। তারা ২০২৯ সাল পর্যন্ত সুবিধাগুলো তো দিয়েই দেবে। এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও আমাদের রফতানির বড় খাত। তারাও অলরেডি আমাদের শুল্ক সুবিধা দিচ্ছে। আর অন্য যেসব দেশে আমাদের নতুন রফতানি বাণিজ্য গড়ে উঠেছে, যেমন জাপান, কোরিয়া, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, মিডল ইস্টসহ লাতিন আমেরিকায় আমাদের যেসব নতুন বাজার গড়ে উঠছে, সেখানেও শুল্ক খুব বেশি নয়। আমাদের আরেকটি রফতানি আছে, তা হলো রেমিট্যান্স। রেমিট্যান্সকে রফতানি বলছি, কারণ এটা আমাদের ম্যানপাওয়ার এক্সপোর্ট। এ দুটি রফতানি মিলে আমাদের ফরেন এক্সচেঞ্জ সুবিধা। আমাদের এক বছরে ফরেন এক্সচেঞ্জের একটি সোজা হিসাব বলি। এ বছর ৬০ বিলিয়ন ডলার পণ্য রফতানি হবে আর ২৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসবে। মোট ৮৩ বিলিয়ন ডলার। ১০ বিলিয়ন ডলার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে আসার কথা। সুতরাং বছরে ৯০ বিলিয়ন ডলার ফরেন এক্সচেঞ্জ আয় হওয়ার কথা। অনেকে বলেন, আমাদের রিজার্ভ অনেক কমে গেছে, চার মাসের বেশি আমদানির কাভার নেই। তাহলে চার মাস পর কি শূন্য হয়ে যাবে নাকি! শূন্য হবে না। এর মানে হলো যদি ৭০ বিলিয়ন ডলার আমদানি করতে হয় তাহলে চার মাসে ২০ বিলিয়নের মতো লাগবে। অন্যদিকে রেমিট্যান্স তো আসছেই। একই সঙ্গে রফতানিও হচ্ছে। প্রত্যেক মাসে ৭ থেকে সাড়ে ৭ বিলিয়ন ডলার তো আয় হচ্ছে। খরচও হচ্ছে অবশ্য। সেক্ষেত্রে ব্যয়ের পরিমাণটা তার চেয়ে কম রাখতে হবে। তাহলে ধীরে ধীরে রিজার্ভ বাড়বে।










