বিভিন্ন পর্যায়ে শুল্ক হ্রাস করে পণ্যের বাজারদর সর্বসাধারণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা বেশ কঠিন। পণ্যের দাম নির্ধারণে আমদানি শুল্ক ছাড়াও অন্যান্য বিষয় জড়িত থাকে। যেমন পণ্য পরিবহন ব্যয়, সরবরাহ-শৃঙ্খল, মজুদ ইত্যাদি। দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে স্রেফ শুল্ক হ্রাস যথেষ্ট নয়। আমদানির সঙ্গে সম্পর্কিত অন্য বিষয়গুলোর ওপরও সরকারকে জোর দিতে হবে।
দেশের আমদানি বাজার গুটিকয়েক বড় আমদানিকারকের হাতে নিয়ন্ত্রিত হয়। দেশের বাজারে পণ্যের দাম স্বাভাবিক রাখতে বাজার সিন্ডিকেট ভাঙতে উদ্যোগী হতে হবে। এক্ষেত্রে আমদানিকারকের লাইসেন্স সংখ্যা বাড়াতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের নির্বিঘ্নে আমদানির জন্য ব্যাংকিং ও বন্দর ব্যবহারে সুবিধা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। এছাড়া বাজারদর স্বাভাবিক রাখতে বাজারে দেশীয় পণ্যের প্রতিযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। পণ্য রক্ষা করতে সরকারিভাবে মজুদ বাড়াতে পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। এভাবে পণ্যের চাহিদা অনুপাতে সরবরাহ ঠিক রাখতে পারলে বাজারের দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার আওতায় থাকবে বলে আশা করা যায়।
বণিক বার্তায় প্রকাশিত তথ্যমতে, দেশে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত দুই ধরনেরই চিনি আমদানি হয়। টনপ্রতি অপরিশোধিত চিনির আমদানি শুল্ক নির্ধারিত ছিল ৩ হাজার টাকা। গত নভেম্বরে তা কমিয়ে অর্ধেক অর্থাৎ দেড় হাজার টাকা করা হয়। এর বাইরে অপরিশোধিত চিনি আমদানিতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট, ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর (এআইটি), ৩ শতাংশ অগ্রিম কর (এটি) এবং ৩০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক (আরডি) রয়েছে। আর পরিশোধিত চিনিতে বর্তমানে আমদানি শুল্ক নির্ধারিত ৩ হাজার টাকা, ভ্যাট ১৫ শতাংশ, এআইটি ৫ শতাংশ, এটি ৫ শতাংশ এবং আরডি রয়েছে ৩০ শতাংশ। এক্ষেত্রে আমদানি শুল্ক কমলেও অন্য বিষয়গুলো অপরিবর্তিত রাখা হয়।
গত অর্থবছরে প্রতি টন খেজুরের শুল্কায়ন মূল্য ছিল ৫০০ থেকে ১ হাজার ডলার। বর্তমানে তা বেড়ে দ্বিগুণ থেকে তিন গুণ হয়েছে। পাশাপাশি কাস্টমস ডিউটি ২৫ শতাংশ, রেগুলেটরি ডিউটি ৩ শতাংশ ও ভ্যাট ১৫ শতাংশ। এ তিন খাতে ব্যবসায়ীদের আগে কখনো রাজস্ব দিতে হতো না। চাল আমদানিতে শুল্ক দিতে হয় ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ।
রমজান সামনে রেখে এরই মধ্যে বাড়তে শুরু করেছে বিভিন্ন পণ্যের দাম। বর্তমানে রাজধানীর খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মোটা চাল ৫০-৫৪ টাকা, মাঝারি চাল ৫০-৫৫ ও সরু চাল ৬২-৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক মাস আগে প্রতি কেজি মোটা চাল ছিল ৪৮-৫০ টাকা, মাঝারি চাল ৫২-৫৬ ও সরু চাল ৬০-৭৫ টাকা। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে মোটা চাল ৬ দশমিক ১২ শতাংশ, মাঝারি চাল ২ দশমিক ৮৬ ও সরু চালের দাম বেড়েছে ১ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
এদিকে নিম্ন, মধ্যম, উচ্চ আয়সহ অধিকাংশ দেশের তুলনায় বাংলাদেশে গড় আমদানি শুল্ক বেশি। বাংলাদেশে গড় শুল্কের পরিমাণ ২৭ দশমিক ৬ শতাংশ, যা শ্রীলংকায় ২২ দশমিক ৪, ভারতে ১৮ দশমিক ১, থাইল্যান্ডে ৯ দশমিক ৭, ভিয়েতনামে ৯ দশমিক ৬ ও ইন্দোনেশিয়ায় ৮ শতাংশ। উচ্চ শুল্ক রফতানির তুলনায় অভ্যন্তরীণ বাজারভিত্তিক শিল্পের জন্য সুবিধাজনক। তবে তা বিদেশী বাজারের জন্য উৎপাদনকে নিরুৎসাহিত করে। ফলে এটি রফতানি বহুমুখীকরণে প্রধান বাধা হিসেবে কাজ করে।
বাংলাদেশে চিনি, ডাল, তেলসহ ১৭টি পণ্যকে নিত্যপণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। এসব পণ্যের বাজার দেশের বড় কয়েকজন আমদানিকারকের হাতে। তারা আমদানি থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত নিজেদের বলয় তৈরি করেছে। ফলে নিজেরা ইচ্ছামতো বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করছে। কয়েক বছর ধরেই আমদানির ক্ষেত্রে এ পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। তবে এ নিয়ন্ত্রণ ভাঙতে হলে আমদানিকারকদের লাইসেন্স সংখ্যা বাড়াতে হবে। বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যবসায়ীদের রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম চালু করে ব্যাংক লেনদেনের আওতায় আনার ওপর জোর দেয়া প্রয়োজন। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে ভোগ্যপণ্যের দাম এখন কিছুটা নিম্নমুখী হয়েছে। যদি এভাবে থাকে তাহলে আসন্ন রমজানে পণ্য ঘাটতি হবে না।
পণ্যের দাম নির্ধারণে ব্যবসায়ীদের পণ্য ক্রয় ও মজুদের বিষয়টিও প্রভাব বিস্তার করে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরাও বাজার অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের টিকিয়ে না রাখতে পারলে ভোক্তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ বিষয়ে সরকারকে যেমন সচেষ্ট থাকতে হবে তেমনি তাদের প্রতি নজরদারিও শক্ত করতে হবে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত পণ্য ক্রয় করে এরা যাতে মজুদ না করতে পারে সে বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। একই সঙ্গে এদের টিকিয়ে রাখতে হলে দেশীয় পণ্যের বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি করা ভিন্ন অন্য পথ নেই। এছাড়া বাজারে দেশীয় পণ্যের সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকলে তা বাজারদর স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হবে। ফলে আমদানি শুল্ক কম বা বেশি হলেও তা আমাদের বাজারদর নির্ধারণে খুব বেশি প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হবে না। আর কোনো ব্যবসায়ী পণ্য মজুদ করে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে তৎপর হলে তার আমদানি লাইসেন্স বাতিলসহ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আশার কথা হলো, এখন থেকে আমদানি সরবরাহ ও দর তদারকি করলে রমজানে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।










