চিকিৎসা ব্যবস্থায় অ্যান্টিবায়োটিক বা অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধ অতীব জরুরি। তবে এর প্রয়োগ ব্যবস্থাপত্র মেনে এবং যথাযথ মাত্রায় হওয়া উচিত। নয়তো একসময় অণুজীব, ভাইরাসসহ অন্য পরজীবীবিরোধী অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধগুলোর কার্যকারিতা হ্রাস পায় এবং শরীরে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) অর্থাৎ ওষুধে সাড়া না দেয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়। এ প্রবণতা বেড়ে গেলে সংক্রামক রোগের চিকিৎসা ভয়াবহ আকার ধারণ করে এবং মৃত্যুহার বেড়ে যায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, শীর্ষ স্বাস্থ্য হুমকির মধ্যে অন্যতম একটি হলো অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স। ২০১৯ সালে বিশ্বে ১২ লাখ ৭০ হাজার মানুষ মারা যায় এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে। আর ৪৯ লাখ ৫০ হাজার মানুষ মারা যায় এর পরোক্ষ প্রভাবে। আশঙ্কা রয়েছে, এএমআর যদি সঠিকভাবে চিহ্নিত এবং প্রতিহত না করা যায় তবে ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বব্যাপী এক কোটি মানুষ মারা যাবে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক অভিঘাত পড়বে। বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলিত তথ্য অনুযায়ী, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বাড়ার ফলে ২০৫০ সালে বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসেবা খাতে অতিরিক্ত ব্যয় হবে ১ ট্রিলিয়ন ডলার। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে ২০ বছর বছরের কম বয়সী রোগীদের মধ্যে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের রেজিস্ট্যান্স বেড়ে গেছে।
বণিক বার্তার প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে যেসব রোগের জীবাণুতে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের সক্ষমতা রয়েছে তার মধ্যে তীব্র শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ, যক্ষ্মা, মূত্রনালির সংক্রমণ, নবজাতকের সংক্রমণ, কানের সংক্রমণ, টাইফয়েড জ্বর এবং ত্বক ও নরম টিস্যুর সংক্রমণ উল্লেখযোগ্য। ৫২ শতাংশ রোগীই অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করছে এবং শিশুদের ওপর এর প্রয়োগ সবচেয়ে বেশি।
দেশের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)-এর ‘ন্যাশনাল এএমআর সার্ভিল্যান্স ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৬ হাজার ৮৬৮ জন রোগীর মধ্যে ৮ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে প্রায় কোনো অ্যান্টিবায়োটিকই কাজ না করার মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে। এছাড়া ৫৬ শতাংশ রোগীর শরীরে বেশকিছু অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা নেই।
অনিয়ন্ত্রিতভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার এর পেছনে দায়ী বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। জানা যায়, যে সময় অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার হয়েছে, ঠিক তখনই অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স চিহ্নিত হয়েছে। অর্থাৎ ১৯৪০ সালে বাণিজ্যিকভাবে পেনিসিলিন ব্যবহার শুরু হলে সে সময়ই পেনিসিলিন প্রতিরোধী জীবাণু স্টেফাইলোকক্কাস চিহ্নিত করা হয়। বর্তমানে এর ব্যাপ্তি চিকিৎসা খাতের বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জিনগতভাবে অনেক সময় অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়ে থাকে। কিন্তু ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার রেজিস্ট্যান্স প্রক্রিয়াকে আশঙ্কাজনকভাবে ত্বরান্বিত করছে। সঠিক ডায়াগনসিস ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কিংবা নিয়ম না মেনে এ ওষুধ গ্রহণের ফলে এএমআর বেড়ে যাচ্ছে। কেননা মানুষের মল-মূত্রের সঙ্গে অ্যান্টিবায়োটিক নির্গমন হয়, যা প্রথমে মাটিতে যায় এবং মাটি থেকে পরবর্তী সময়ে গাছপালা ও প্রাণিকুলে ছড়িয়ে পড়ে। আবার পানিতেও এর উপস্থিতি পাওয়া যায়। গাছপালায় ব্যবহৃত পেস্টিসাইড বৃষ্টির পানিতে মিশে নদী-নালায় গিয়ে মেশে। ফলে জলজ প্রাণীতেও অ্যান্টিবায়োটিক প্রবেশ করে। মাছ যখন মানুষ খায় তা পুনরায় মানুষের মধ্যে প্রবেশ করে। এভাবে চক্রাকারে এর বিচরণ হয়। ফলে অবস্থা দিন দিন বেগতিক হচ্ছে।
এ অবস্থার পেছনে আরো দায়ী অনিয়ন্ত্রিত বিপণন ব্যবস্থা, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং রোগীদের অসচেতনতা। পৃথিবীর কোনো উন্নত দেশেই চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ক্রয় করা যায় না। কিন্তু দেশে ভিন্ন চিত্রের দেখা মেলে। যেকোনো রোগ হলে অ্যান্টিবায়োটিক খেতে তৎপর হয় সাধারণ মানুষ এবং তারা তা ক্রয় করতেও সক্ষম হয় স্থানীয় ফার্মেসি থেকে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কঠোর তদারকি ছাড়া এর বিপণন বন্ধ করা প্রায় অসম্ভব।
বাংলাদেশ সরকার অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স সমস্যা মোকাবেলায় বিভিন্ন পদক্ষেপ এরই মধ্যে নিয়েছে। ২০১৬ সালে ওষুধ বিক্রির নীতিমালায় মডেল ফার্মেসি ও মডেল ফার্মেসি শপের প্রবর্তন করা হয়। যেখানে সুনির্দিষ্টভাবে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। ওই নীতিমালায় ফার্মেসিগুলোয় ফার্মেসি কাউন্সিল অব বাংলাদেশের লাইসেন্সপ্রাপ্ত ফার্মাসিস্ট (গ্রেড এ, বি ও সি) ব্যতীত ওষুধ ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন হলে অনেকাংশে অ্যান্টিবায়োটিকের বিপণন ও যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধ করা যাবে বলে আশা করা যায়। বাস্তবায়নে যেমন কঠোর নজরদারি প্রয়োজন তেমনি আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে ড্রাগ লাইসেন্স বাতিল করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।
অবশ্য অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স প্রতিরোধে রাজনৈতিক সদিচ্ছাও গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব অংশীদারের জড়িত হওয়া অত্যাবশ্যকীয়। ওষুধ কোম্পানি থেকে প্রাপ্ত মুনাফা গ্রহণ থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি চিকিৎসকদের পেশাদারি মনোভাব বজায় রাখতে হবে। এছাড়া প্রাথমিক পর্যায়েই রোগ নির্ণয় নিশ্চিত করা গেলে তা এএমআর প্রতিরোধে হতে পারে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল।
এএমআরের ভ্যাকসিন ও অন্যান্য চিকিৎসার জন্য গবেষণা ও উদ্ভাবনের চেষ্টা বাড়তে হবে। দেশের সরকারিসহ বেসরকারি খাতকেও এগিয়ে আসতে হবে ইতিবাচক প্রণোদনা প্রদানে। যেভাবে এএমআরের প্রকোপ বাড়ছে, এতে অদূরভবিষ্যতে অধিকাংশ মানুষ মারা যাবে এর প্রভাবেই। এ থেকে উত্তরণের জন্য ওয়ান হেলথ ধারণাকে প্রতিষ্ঠার দিকে অগ্রসর হওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। মানুষ, প্রাণী, গাছপালা ও পরিবেশকে সমন্বিত করে অনুকূল স্বাস্থ্য নিশ্চিত করলে চিকিৎসা ব্যবস্থায় ঝুঁকি অপেক্ষাকৃত হ্রাস করা সম্ভব বলে আশা করা যায়।










