ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান এবং ‘উন্নয়ন অন্বেষণ’-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারপারসন। মূল্যস্ফীতির দৌরাত্ম্য, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা, খাদ্যনিরাপত্তাসহ দেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম ও তৌফিকুল ইসলাম

স্মরণকালের সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি দেখা যাচ্ছে। দেড় বছরেও আমরা মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরতে পারিনি কেন? 

মূল্যস্ফীতি নিয়ে আলোচনায় তিনটি বিষয় প্রাসঙ্গিক। প্রথমত, কী কারণে দাম বেড়েছে? দ্বিতীয়ত, নীতি পদক্ষেপের মাধ্যমে দাম বাড়ানোর হার কমানো যেত কিনা? তৃতীয়ত, উপশম করার কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে কি? মূল্যস্ফীতির ফলে সবার ওপর সমান প্রভাব পড়ে না। খাদ্য মূল্যস্ফীতি এক যুগের মধ্যে সর্বোচ্চ। নিম্ন, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ খাদ্যে বেশি পরিমাণে খরচ করে বিধায় তাদের ওপর অভিঘাতের মাত্রা বেশি। একইভাবে গ্রামাঞ্চলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি (৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ) শহরের সার্বিক মূল্যস্ফীতি (৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ) থেকে বেশি হওয়ায় বৈষম্যমূলক প্রভাব বিরাজমান। এক বছরের বেশি সময় ধরে বাজারে প্রতিটি পণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। বিশেষ করে চিনি, মাছ, সবজি, বিভিন্ন মসলা, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রতিটি পণ্যের দাম কোনো কোনো ক্ষেত্রে দ্বিগুণ-তিন গুণও হয়েছে। প্রকৃত খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বা বিবিএসের দেয়া তথ্যের চেয়ে বেশি। বিবিএস মূল্যস্ফীতির তথ্য গণনায় ২০০৫ সালকে ভিত্তি বছর হিসেবে বিবেচনায় নিচ্ছে। এ ভিত্তি বছরে খাদ্যপণ্যের ওপর কম গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। অথচ এখন সরকারের হাতে খানা জরিপের নতুন তথ্য আছে। মূল্যস্ফীতির সময়কাল বেশি হওয়ায় তাদের জীবনযাত্রায় ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা তৈরি হয়েছে। সরকারি আয় তলানিতে। বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন তথা জিডিপিতে করের পরিমাণ দক্ষিণ এশিয়ায় যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান ছাড়া অন্য সব দেশের নিচে। এছাড়া দিন দিন কর-জিডিপি অনুপাত হ্রাস পেয়েছে। আয় কম থাকায় ঋণ বাড়ছে।

সরকারের ঋণ গ্রহণ কি মূল্যস্ফীতিতে ভূমিকা রাখছে?

২০২২ সালের জুলাই-পরবর্তী এক বছরের হিসাব লক্ষ করলে দেখা যাবে সরকারের ঋণের মাত্রা ৩৮ দশমিক ৩০ শতাংশ বেড়ে ১ লাখ ৭ হাজার ৯২৬ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক রেকর্ড পরিমাণ টাকা ছাপিয়ে সরকারকে ঋণ দেয়ায় মূল্যস্ফীতি উসকে দিতে বড় ভূমিকা রাখছে। মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী হলে প্রথাগতভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রা সরবরাহ কমিয়ে দেয়ার কথা। কিন্তু এক্ষেত্রে তা না করে সরকারকে ঋণ দিতে বাধ্য হচ্ছে। মূল্যস্ফীতির ভার লাঘবে সরকার নিম্ন বা নির্দিষ্ট আয়ের মানুষকে সহায়তা করে। কিন্তু বাংলাদেশে যে সামাজিক নিরাপত্তা জাল বা কর্মসূচি আছে সেগুলো বহু খণ্ডে খণ্ডিত এবং ত্রুটিযুক্ত। যার থাকার কথা না তিনি অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন; যার অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা তিনি থাকছেন না। এতে কোনো প্রকার সহায়তা সঠিকভাবে কাজ করছে না। অন্যদিকে মজুরি হার না বাড়ার কারণে সাধারণ মানুষ দাম বাড়ার কশাঘাতে জর্জরিত। ডলারের চলমান চাপ থাকার কারণে মুদ্রা বিনিময় হারের কারণেও বাজারে মূল্যস্ফীতি ঘটছে। আবার অন্যদিকে দেখা যাবে যে সম্পদের কেন্দ্রীভবন ঘটছে। এমনটা ঘটলে বাজারের ওপর বড় রকমের দখল তৈরি হয়। বাংলাদেশের বাজার ব্যবস্থাপনার বড় রকমের ঘাটতি সবারই জানা। তার মাধ্যমে গোষ্ঠীতান্ত্রিক পন্থায় ক্ষমতার ব্যবহার করে বাজারকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি ঘটে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম কমায় অন্যান্য দেশে মূল্যস্ফীতির হার নিম্নমুখী হলেও বাংলাদেশে ঊর্ধ্বমুখী। দেশীয় পণ্যগুলোর ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং অন্যদিকে আমদানির বাজারকে কাজ করতে না দেয়ার কারণে দ্রব্যমূল্য বেড়েই চলছে। অন্যান্য দেশে এমনকি শ্রীলংকায়ও মূল্যস্ফীতি হ্রাস পাচ্ছে, কিন্তু বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি কমছে না। দেখা যাচ্ছে কভিড-পরবর্তী সময়ে যে মূল্যস্ফীতি ঘটছে, তার সঙ্গে রাজস্ব নীতি এবং মুদ্রানীতির ক্ষেত্রে কার্যকারণ জানা সত্ত্বেও সঠিক নীতিনির্ধারণ না করার জন্যই মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে সংকটের ওপর পর্দা না দিয়ে গভর্নরের দায়িত্ব নেয়া উচিত।

আমদানি কমিয়ে মূল্যস্ফীতি কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, এটি তো কোনো সুফল দিচ্ছে না। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

বাংলাদেশ নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে দুটো ক্ষেত্রে। একটি হচ্ছে জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তা। খেয়াল করলে দেখা যায়, খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেশি এবং এক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতাও অধিক। আমদানি উৎসস্থলে বৈচিত্র্য না থাকায় খাদ্যপণ্যের আমদানি নির্দিষ্ট কিছু দেশ থেকে করা হচ্ছে। রফতানির ওপর বিধিনিষেধ জারি অথবা অধিক শুল্ক ধার্য করায় বাজারে দাম বেড়ে যায়। সাম্প্রতিক কালে চাল, পেঁয়াজ, মরিচের ক্ষেত্রে তা লক্ষ করা গেছে। আমদানি নীতিকাঠামোর মধ্যে গলদ রয়ে গেছে। আমদানি উৎস্যে বৈচিত্র্য না থাকায় বড় রকমের ঝুঁকি তৈরি হয় এবং মাঝেমধ্যেই সে ঝুঁকির বড় রকমের অভিঘাত সাধারণ মানুষের ওপর পড়ে। যেহেতু বিশ্ববাজারে খাদ্যের উৎপাদন এবং দাম সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়, তা খাদ্য মন্ত্রণালয়সহ অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের জানা থাকা সত্ত্বেও সঠিক সময়োপযোগী কার্যক্রম না নেয়ার কারণে খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মধ্যে পড়ে। জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা অনেক বেশি এবং জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি অতীব গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে উৎপাদন খরচ বাড়ছে। পরিবহন থেকে শুরু করে সর্বস্তরে প্রভাব পড়ে। ডলারের রিজার্ভ ধরে রাখার জন্য জোর করে আমদানি কমিয়ে রাখায় বিদেশী পণ্যগুলোয় সরবরাহজনিত ঘাটতির কারণে দাম বেড়ে যাচ্ছে। ডলারের সরবরাহ কম থাকায় টাকার বিপরীতে ডলারের দাম বাড়ায় তথা টাকার অবমূল্যায়নে আমদানি ব্যয় বেড়েছে। এভাবে উৎপাদনের খরচ বাড়ায় মূল্যস্ফীতি ঘটেই চলছে। অর্থাৎ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ক্রমহ্রাসমান চাপ, ডলারের অভাব ও ডলারের মানের বৃদ্ধি ক্রমাগত মূল্যস্ফীতির অন্যতম প্রধান নিয়ামক। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আগে থেকেই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমছিল। গত বছরের আগের বছর আমদানির মাধ্যমে পুঁজি পাচারে বড় উল্লম্ফনের অভিযোগ রয়েছে। আবার গত অর্থবছরে রফতানির মাধ্যমে পুঁজি পাচারের অভিযোগ আছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হুন্ডি ও হাওলা। পুঁজি পাচার, হুন্ডি, হাওলাসহ অন্যান্য যেসব অভিযোগ রয়েছে সেগুলোর ব্যাপারে ব্যবস্থা না নেয়ার কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমেই চলছে। এটি মোকাবেলার জন্য সঠিক পদক্ষেপ না নিয়ে জোর করে আমদানি কমিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে। ৩১ দশমিক ১৯ শতাংশ আমদানি হ্রাস পেয়েছে। কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমায় ভবিষ্যতে রফতানি বাণিজ্যের ওপর প্রভাব পড়বে। তেমনি বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফলে জনমানুষের আয়ের ওপর প্রভাব পড়বে। একদিকে মূল্যের বৃদ্ধি অন্যদিকে আয় হ্রাস হলে আরেকটি দুষ্টচক্র তৈরি করবে। 

এ অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা সম্পর্কে বলুন। বিশেষ করে টাকা ছাপিয়ে সরকারকে ঋণ দেয়ার সিদ্ধান্ত মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব রাখছে কিনা।

মূল্য স্থিতিশীলতা রক্ষা করাই বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল ম্যান্ডেট। মূল্যের স্থিতিশীলতা রক্ষার মূল দায়িত্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর বর্তায়। এই মৌল ম্যান্ডেট বাস্তবায়নে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে মুদ্রা সরবরাহ, বৈদেশিক লেনদেন বিনিময় ও সুদের হার নির্ধারণসহ বিভিন্ন ইনস্ট্রুমেন্ট ব্যবহার করে। প্রথমত, ডলারের ক্রমাবনতিশীল অবস্থাসংশ্লিষ্ট তথা পুঁজি পাচার, হাওলা ও হুন্ডিসংক্রান্ত যে অভিযোগগুলো করা হয়েছে, তা নিরসনে সঠিক কার্যকর পদক্ষেপের অনুপস্থিতি রয়েছে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রা সরবরাহকে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সাযুজ্য বিচার না করে বড় অংকের অর্থ ছাপিয়ে সরকারকে সরবরাহ করছে। তা দাম স্তরের ওপর বিপ্রতীপ প্রভাব ফেলছে। মূল্যস্ফীতি ঘটাচ্ছে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশ ব্যাংক কোনোভাবেই ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বিরাজমান বিশৃঙ্খল অব্যবস্থাপনায় লাগাম টানতে পারেনি। ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা আমদানি বাণিজ্য ও সাধারণ মূল্যস্ফীতির ওপর অভিঘাত রাখছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংকের মৌলিক ম্যান্ডেট তথা মূল্য স্থিতিশীলতা আনয়ন করতে পারছে না। বেশ অনেক বছর ধরে চলমান আর্থিক খাতের বিশৃঙ্খলার সঙ্গে নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল ম্যান্ডেট তথা মূল্য স্থিতিশীলতা রক্ষা না করার পারঙ্গমহীনতা। এজন্য গোষ্ঠীতন্ত্রকে সুবিধা দেয়ার নীতি অনুসরণ না করলে মুদ্রানীতি কাজ করবে। 

এক যুগের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ খাদ্য মূল্যস্ফীতির কারণে প্রান্তিক ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের অনেক কষ্ট হচ্ছে। সাধারণ মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকার কি ভূমিকা নিচ্ছে?

মূল্যস্ফীতির কশাঘাতে নিম্ন আয়ের, নির্দিষ্ট আয়ের এবং দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসরত মানুষের ওপর নিদারুণ প্রভাব পড়ে। বৈষম্যমূলক অভিঘাতে মানুষ জর্জরিত হয়। এই অমানিশা লাঘবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথা রাজস্ব নীতির বড় ভূমিকা থাকে। জনমানুষ যখন দুর্দশায় নিমজ্জিত হয়, তখন রাজস্ব নীতি তথা রাষ্ট্রীয় সহায়তার মাধ্যমে তাদের জীবন ধারণ চালিয়ে যাওয়ার বিধান সারা পৃথিবীতেই করা হয়। তা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নামে অভিহিত হয়। তার বিস্তৃতি, প্রকৃতি একেক দেশে একেক রকম। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে যে সামাজিক সুরক্ষা জাল ব্যবস্থা বাংলাদেশে খণ্ড-বিখণ্ড। এটা বেশ বিক্ষিপ্ত এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নয়। 

তার মানে সামাজিক সুরক্ষাও তো ভালোভাবে কাজ করছে না।

এই ত্রুটি দূর করতে এখন পর্যন্ত কোনো সঠিক তালিকা করা যায়নি। কার্যকর তালিকা থাকলে নগদ সহায়তা বা যতটুকু সহায়তা দেয়া হয় তা নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে। দ্বিতীয়ত, আপৎকালে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিশেষ কর্মসূচি নেয়া হয়। সরকারের আর্থিক ক্ষমতা না থাকায় বিশেষ কর্মসূচি নিতে পারেনি। তৃতীয়ত, মূল্যস্ফীতি দীর্ঘমেয়াদি হওয়ার কথা ছিল না। এর পেছনের কারণগুলো সবই জানা। সরকার যদি সঠিক ব্যবস্থা নিত তাহলে এতদিন পর্যন্ত নিম্ন আয়ের, নির্দিষ্ট আয়ের দরিদ্র মানুষের এ রকম অবস্থায় নিপতিত হতে হতো না। কিন্তু ত্রুটিযুক্ত ব্যবস্থা থাকার কারণে দেখা যাচ্ছে যে অনেক ক্ষেত্রে দরিদ্র মানুষের পরিমাণ বেড়ে গেছে। যেমন বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশিমাত্রায় অর্থ ব্যয় হয় ঢাকা বিভাগে। সাম্প্রতিক খানা জরিপে দেখা গেছে,  ঢাকায় দরিদ্র মানুষের পরিমাণ বেড়েছে। তার মানে দারিদ্র্য বিমোচনের যে কৌশলের কথা বলা হচ্ছে তা কতটুকু ‌কার্যকর তা বড় ধরনের প্রশ্নসাপেক্ষ হয়েছে। প্রকল্প ব্যয় অযাচিত বৃদ্ধিতে ঋণের পরিমাণ অনেক বেড়েছে। অন্যদিকে রাজস্ব আয় বাড়েনি। যে কারণে ঋণ বাবদ অর্থ প্রদান এক নম্বর পরিচালন ব্যয় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ফলে সরকারের আসলেই মূল্যস্ফীতির সময়ে কোনো বিশেষ পদক্ষেপ নেয়ার অবকাশ থাকছে না। বরং লক্ষণীয় বিষয় দারিদ্র্য বিমোচন বা এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের বিশেষ ধরনের উদ্যোগ নেয়ার সক্ষমতা কমছে। তেমনি শিক্ষা স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে ব্যয় বরাদ্দ হ্রাস পেয়েছে। দুষ্টচক্র তৈরি হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে যে অঞ্চলে রাজধানী অবস্থিত সেই অঞ্চলেই নতুন দরিদ্রের সংখ্যা বাড়ছে।  

বিদ্যমান পরিস্থিতি মোকাবেলা নিয়ে সরকার কি আন্তরিক? এ সময়ে সরকারের কী করণীয় রয়েছে?

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সব সূচকে বড় ধরনের ক্ষয় ধরেছে। কার্যকারণগুলো সবই জানা। প্রতিটি বিষয়েরই সমাধান আছে। মুশকিল হচ্ছে যে প্রতিষ্ঠানের যে দায়িত্ব পালন করা দরকার, সে দায়িত্ব পালনে তারা তাদের সক্ষমতা প্রমাণ করতে পারছে না। তার মাত্রা আরো বেড়ে যায় যখন জবাবদিহিহীনতার সংস্কৃতি বিরাজমান থাকে। প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতার সঙ্গে রাজনৈতিক বন্দোবস্তের বড় রকমের সম্পর্ক আছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে দুটি মূল সংস্থার একটি বাংলাদেশ ব্যাংক। তাদের মূল ম্যান্ডেন্ট হচ্ছে প্রাইস স্ট্যাবিলিটি। কার্যকর সক্ষমতার প্রকাশ ঘটছে না। অন্যদিকে নিম্ন আয়ের বা নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। দারিদ্র্যসীমার নিচে ধাবিত হওয়া মানুষের সংখ্যা অনেক এলাকায় বাড়ছে। তাদের মধ্যে পুষ্টিহীনতা বাড়ছে, খাদ্য গ্রহণ হ্রাস পাচ্ছে। তাদের শিক্ষা বাবদ ও স্বাস্থ্যগত ব্যয় হ্রাস পাচ্ছে। আবার ঠিক হারে মজুরি পাচ্ছে না সংশ্লিষ্টরা। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে সঞ্চয় হার কমে যাওয়ায় কারণে বিনিয়োগও কমছে। এতে আনুষ্ঠানিক খাতে নতুন কর্মসংস্থানও বাড়ছে না। যেটুকু কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে তা অনানুষ্ঠানিক খাতে হচ্ছে। অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মসংস্থান কখনই টেকসই হতে পারে না। অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা এক নিম্নগামী দুষ্টচক্রের ফাঁদ তৈরি করেছে।