দেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বা এসএমই খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। নিম্ন আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণে এসএমই খাতের অবদান অনস্বীকার্য। তবে এ খাত বেশ চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে খাতসংশ্লিষ্ট দক্ষতা ও তথ্যের অবাধ প্রবাহ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ ‍উঠেছে।

বণিক বার্তায় প্রকাশ, দক্ষতার ঘাটতি এবং যথাযথ তথ্যের অভাবে এসএমই উদ্যোক্তারা পিছিয়ে পড়ছেন। কোথায় কীভাবে ঋণ পাওয়া যাবে, পণ্যের সুনির্দিষ্ট রফতানি গন্তব্য, সময়সীমা এবং প্রাসঙ্গিক তথ্য সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব, পরিচালন দক্ষতার ঘাটতিসহ বেশকিছু কারণে এসএমই খাতের উদ্যোক্তারা নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। সম্প্রতি ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘এসএমইদের রফতানির সক্ষমতা বৃদ্ধি; এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা’ শীর্ষক সেমিনারে এসব তথ্য উঠে আসে। 

বস্তুত দেশের শিল্প উন্নয়নের মূল শক্তিই হচ্ছে এসএমইসহ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প। জিডিপিতে এসএমইদের অবদান প্রায় ৩০ শতাংশ, কিন্তু তারা নানামুখী প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছে। এজন্য এসএমই খাতের উন্নয়নে উদ্যোক্তাদের মূলধনের জোগান, প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নয়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও নীতিসহায়তা দেয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে এসএমই খাতের অবস্থান আরো দৃঢ় করার জন্য পণ্যের বৈচিত্র্য নিয়ে আসতে হবে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন বাজারে উদ্যোক্তাদের যোগাযোগ বাড়াতে হবে।

ভবিষ্যতে এলডিসি-পরবর্তী সময়ে এসএমই খাতের উদ্যোক্তারা সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, আর্থিক ও নীতিসহায়তা, যথাযথ অবকাঠামো এবং দক্ষ মানবসম্পদের স্বল্পতার মুখোমুখি হবেন। এ অবস্থায় কার্যকর দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, আর্থিক ও নীতিসহায়তা প্রদান, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী শ্রম আইনের সংশোধন, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর, অবকাঠামো খাতের টেকসই উন্নয়নসহ নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মেগা প্রকল্পগুলোর কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হবে।

যেকোনো দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি হিসেবে কাজ করে এসএমই খাত। প্রতিটি দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের সিংহভাগ অংশীদার অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। উন্নত দেশগুলোর মধ্যে জাপানের জিডিপির ৯০ শতাংশ এসএমই খাত থেকে আসে। চীনের মতো শীর্ষ অর্থনীতির জিডিপিতে ৭০-৭৫ শতাংশ ভূমিকা রাখে এ খাত। এগুলো বৃহৎ অর্থনীতির উদাহরণ। তবে ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রায় ৬০ শতাংশ ভূমিকা রয়েছে এসএমই খাতের। সারা দেশে যে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তা বা অতিক্ষুদ্র উদ্যোক্তা আছেন, তারা যে উদ্ভাবনী ক্ষমতা নিয়ে ব্যবসা করতে আসেন তা অর্থনীতিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি যেকোনো দেশের শিল্পায়ন ও পরিষেবা খাতে কর্মসংস্থানে ৮০-৯০ ভাগ ভূমিকা রাখেন এসএমই উদ্যোক্তারা। বাংলাদেশের শিল্প খাতে শ্রমশক্তির প্রায় ৮০ শতাংশই এসএমই খাতের। মূলত দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে মূল ভূমিকা পালন করছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। এজন্য এসএমইদের মূল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সংযুক্ত করা হলে তা দেশের জন্য গঠনমূলক ভূমিকা রাখবে।

এসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে কাজ করতে হয়। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংযোগ প্রাপ্তি নিয়ে নানা জটিলতায় পড়তে হয়। এজন্য সেক্টরভিত্তিক অবকাঠামোগত সমস্যা সমাধানে নীতিনির্ধারকদের এগিয়ে আসা উচিত বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। এক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা অনুকূল পরিবেশ পাচ্ছেন না। যেকোনো সহযোগিতার জন্য উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন জায়গায় ভোগান্তি পোহাতে হয়। এজন্য এসএমইদের জন্য ওয়ান স্টপ সার্ভিস (ওএসএস) চালু করার দাবি ব্যবসায়ীদের। এতে উদ্যোক্তাদের সমস্যা কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। 

বহির্বিশ্বে ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য দেশের এসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের আর্থিক, প্রযুক্তিগত ও দক্ষতার অভাব রয়েছে বলে মত পাওয়া গেছে। তাই এসএমই উদ্যোক্তাদের পণ্য বহুমুখীকরণ, বাজার সম্প্রসারণ এবং সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আরো বেশি হারে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার ওপর জোর দিতে হবে। 

এজন্য কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষা ব্যবস্থায় জোর দেয়ার পাশাপাশি রফতানি বাজার অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। আরো বৃহৎ পরিসরে এসএমই বিস্তৃত করার পরিকল্পনার স্বার্থে দেশের এসএমইদের উন্নয়ন ও এলডিসি-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আর্থিক ও নীতিসহায়তার লক্ষ্যে এসএমইর সংজ্ঞায় সংশোধন আনার ওপর সংশ্লিষ্টরা জোর দিচ্ছেন। বিশেষ করে মাঝারি আকারের ব্যবসা পৃথককরণ, রফতানি উন্নয়ন ফান্ড প্রবর্তন, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ সাধনে প্রশিক্ষণ প্রদান, এসএমইদের ডাটাবেজ তৈরিসহ বাজার সম্প্রসারণে বহির্বিশ্বে অনুষ্ঠিত বাণিজ্য মেলা ও পণ্য প্রদর্শনীগুলোয় অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণের ওপর জোর দিতে হবে। 

একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, বর্তমান সময়ে অবাধ তথ্যপ্রবাহ যেকোনো খাতের বিস্তারে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এছাড়া প্রতিযোগিতামূলক বাজারে দক্ষতা বৃদ্ধিরও বিকল্প নেই। এজন্য এসএমই খাতের বিকাশে অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে তা এ খাতের উত্তরোত্তর বিকাশে পরিপূরক হবে, এ প্রত্যাশা করা যায়।