কয়েক বছর ধরেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মূল্যস্ফীতির ভয়াল দশা দৃশ্যমান ছিল। প্রথমে করোনা মহামারী এবং তারপর গত বছর শুরু হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মূল্যস্ফীতি লাগামহীন হয়ে পড়ে। জার্মানি, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কয়েক দশকের সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি দেখা যায়। খাদ্য, জ্বালানিসহ আমদানিনির্ভর আফ্রিকা ও এশিয়ার দেশগুলো সবচেয়ে ভুক্তভোগী হয়। ইউরোপের বেশির ভাগ দেশই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে সঠিক নীতি গ্রহণের মাধ্যমে। দক্ষিণ এশিয়ায় মূল্যস্ফীতিতে ধুঁকছে ভারতসহ শ্রীলংকা ও পাকিস্তানের মতো দেশ। গত বছর শ্রীলংকা দেউলিয়া হয়েছে এবং পাকিস্তান প্রায় দেউলিয়াত্বের দ্বারপ্রান্তে চলে গেছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে নাকাল হওয়া সত্ত্বেও সম্প্রতি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও রিজার্ভ সক্ষমতা বাড়িয়েছে শ্রীলংকা। যে বাংলাদেশ শ্রীলংকাকে ২০০ মিলিয়ন ডলার রিজার্ভ সহায়তা দিয়েছে সে দেশ এখন মূল্যস্ফীতিতে নাকাল। গত মে মাসে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ, যা এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যে আরো জানা যায়, গত জুনে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
গতকাল বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘দেউলিয়া শ্রীলংকার মূল্যস্ফীতি হার এখন বাংলাদেশের কম!’ এতে বলা হয়, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত শ্রীলংকার মূল্যস্ফীতি গত সেপ্টেম্বরে বেড়ে দাঁড়ায় ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৬৯ দশমিক ৮ শতাংশে। কিন্তু বছর ঘুরে এখন বিপরীত পরিস্থিতি দেশটিতে। দোকানপাটে খাদ্য ও জ্বালানির জোগান পর্যাপ্ত। সরকারের পাশাপাশি কয়েকটি বিদেশী কোম্পানিও সেখানে সুলভ মূল্যে জ্বালানি বিক্রির অনুমোদন পেয়েছে। গভর্নর নন্দলাল বীরাসিংহের নেতৃত্বাধীন সেন্ট্রাল ব্যাংক অব শ্রীলংকা (সিবিএসএল) মূল্যস্ফীতির হার জুলাইয়ে ৬ দশমিক ৩ শতাংশে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে বলে দেশটির পরিসংখ্যান বিভাগের তথ্যে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, একসময় ক্রমাগত রুপি ছাপিয়ে বাজারে তারল্য বাড়িয়ে তুলছিল সিবিএসএল। দেশটির মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার পেছনে এটিকেও দেখা হচ্ছিল অন্যতম বড় কারণ হিসেবে। বর্তমানে দেশটির পরিস্থিতি পাল্টে যাওয়ার পেছনে বড় কৃতিত্ব দেয়া হচ্ছে সিবিএসএলের গভর্নর নন্দলাল বীরাসিংহকে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে মুদ্রা ছাপানো এখন পুরোপুরি বন্ধ রেখেছেন তিনি। সুদহার বাড়িয়ে নিয়ন্ত্রণ করেছেন ঋণের প্রবাহ। আবার এ বর্ধিত সুদহার নির্ধারণের ক্ষেত্রে অনুসরণ করা হয়েছে বাজারভিত্তিক পদ্ধতিকে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা (বিশেষ করে ডলার) ক্রয়-বিক্রয়ের প্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে রুপির বিনিময় হারে পতন ঠেকিয়েছেন। গত সেপ্টেম্বরে দ্বীপদেশটিতে মূল্যস্ফীতি যখন প্রায় ৭০ শতাংশ, সে সময় বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ১ শতাংশ। ১০ মাস পর শ্রীলংকা যেখানে বড় আকারের ধাক্কা সামাল দিয়ে উঠেছে সেখানে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ শতাংশের ঘরেই। বিবিএসের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জুনে দেশে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
স্পষ্টতই মূল্যস্ফীতিতে নাকাল নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষ। অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রেই অনুভূত হচ্ছে মূল্যস্ফীতির ঝাঁজ। মূল্যস্ফীতি হলে খাদ্যপণ্য, পোশাকাদি, বাসা ভাড়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্যান্য জিনিসের দাম বেড়ে যায়। মানুষকে এসব সেবা বা পণ্য কিনতে আগের চেয়ে বেশি টাকা খরচ করতে হয়। আয়ের পরিবর্তন না হলে তখন মানুষ এগুলো প্রয়োজনের চেয়ে কম কিনতে বাধ্য হয়। তাদের সঞ্চয় কমে যায় এবং অন্যান্য খাতের খরচ কমিয়ে ফেলতে হয়। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে সীমিত এবং নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর ওপর। কারণ জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ার ফলে অনেক দ্রব্য তাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। মূল্যস্ফীতি অনেক সময় একেকজনের ওপর একেকভাবে প্রভাব ফেলে। অনেক সময় মৃদু মূল্যস্ফীতি হয়, অনেক সময় অতিমূল্যস্ফীতি। যখন জিনিসপত্রের দাম ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে, মানুষ তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়, সেটা মৃদু মূল্যস্ফীতি। কিন্তু জিনিসপত্রের দাম রাতারাতি বেড়ে গেলে তাকে অতিমূল্যস্ফীতি বলা হয়। আমাদের এখানে রাতারাতি যেভাবে পেঁয়াজ, মরিচ ও গরুর মাংসের দাম বাড়ে তাতে বলা যায়, আমরা অতিমূল্যস্ফীতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির জন্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রায়ই আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিকে দায়ী করা হলেও বেশ কিছুদিন ধরে বিশ্ববাজারে বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দাম কমছে। তবে এর প্রভাব বাংলাদেশের বাজারে খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। আমদানিকারকরা এর জন্য মূলত ডলার সংকট এবং আমদানির এলসি খোলার ওপর কড়াকড়িকে দায়ী করেন।
নীতিনির্ধারকসহ অর্থনীতিবিদদের একাংশ বিভিন্ন সময় বলেছেন, বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি আমদানীকৃত। বৈশ্বিক ভোগ্যপণ্যের বাজারে মূল্যের অস্থিতিশীলতার কারণে আমদানীকৃত পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না বলে দাবি করেছেন ব্যবসায়ীরাও। এজন্য কভিডের প্রাদুর্ভাব থেকে শুরু করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অভিঘাত, বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের ব্যাঘাতসহ নানা কারণকে দায়ী করা হয়েছে। যদিও কয়েক মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি থেকে শুরু করে অধিকাংশ পণ্যের দাম অব্যাহত হারে কমেছে। কোনো কোনো পণ্যের দাম এরই মধ্যে প্রাক-কভিড পর্যায়ে নেমে এসেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্য ক্রমেই কমতে থাকায় বিশ্বের প্রায় সব দেশেই মূল্যস্ফীতির চিত্রে দেখা গেছে বড় পরিবর্তন। যদিও দেশের বাজারে দেখা যাচ্ছে পুরোপুরি বিপরীত চিত্র। বাংলাদেশে ভোগ্যপণ্যসহ সব পণ্যের দাম এখনো অস্থিতিশীল। নিয়ন্ত্রণে আসছে না মূল্যস্ফীতির হার।
শ্রীলংকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাকা ছাপানোর পথ পরিহার করলেও বাংলাদেশ ব্যাংক এখনো তা জারি রেখেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসার অন্যতম কারণ হিসেবে বিভিন্ন সময়ে এ বিষয়কেও দায়ী করছেন অর্থনীতিবিদরা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১৮ দিনেই সরকারকে সহায়তা করতে ট্রেজারি বিল ও ট্রেজারি বন্ডের মাধ্যমে ১০ হাজার ৮০০ কোটি টাকা সরকারকে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
দেউলিয়া হয়ে পড়া শ্রীলংকার ঘুরে দাঁড়ানো নিয়ে সন্দিহান ছিলেন অর্থনীতিবিদসহ বিশেষজ্ঞরা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও (আইএমএফ) এ অনিশ্চয়তার কারণে চলতি বছরের মার্চের আগে শ্রীলংকার জন্য বেইলআউট প্যাকেজ ছাড় করেনি। যদিও ওই সময়ের পর থেকে এখন পর্যন্ত অর্থনৈতিক পরিস্থিতির বেশ উন্নতি করতে সক্ষম হয়েছে দেশটি।
সব মিলিয়ে চলমান তীব্র মূল্যস্ফীতি দেশের অর্থনীতিতে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর এ সংকট ব্যাপক চাপ তৈরি করেছে। অর্থনীতির ভাষায় মূল্যস্ফীতিকে বলা হয় এক ধরনের কর, যা ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবার ওপর আরোপ হয়। তবে মূলত সীমিত আয়ের মানুষ এর চাপে পড়ে। মূল্যস্ফীতি অর্থনীতির একটি স্বাভাবিক চিত্র হলেও বড় ধরনের মূল্যস্ফীতিকে অর্থনীতির জন্য অভিঘাত হিসেবে দেখা হয়।
মূল্যস্ফীতির প্রভাবে সমাজের একশ্রেণীর মানুষ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয় তেমনি আরেক শ্রেণী লাভের মুখ দেখে। বাজার সিন্ডিকেট যেখানে রাতারাতি কোটি টাকা পকেটে পুরছে, সেখানে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠে গেছে। বাজার-সদাই কমিয়ে, সঞ্চয় ভেঙে, ঋণ করে দিনাতিপাত করছে তারা। অনতিবিলম্বে বাজার ব্যবস্থা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরার বিকল্প নেই। প্রত্যাশা করব, সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে যথোপযুক্ত পদক্ষেপ নেবে।










