দেশের পুঁজিবাজারে ফ্লোর প্রাইস বা সর্বনিম্ন মূল্যস্তর নির্ধারণের কারণেই লেনদেন স্থবির হয়ে পড়ে। এতে লেনদেনের হার কমেছে এবং সূচকের ওঠা-নামাও নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এতে ফটকা কারবার বেড়েছে এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তবে ফ্লোর প্রাইস তুলে নেয়ায় দেশের পুঁজিবাজারে গতিশীলতা ফিরবে। শেয়ারের দাম নিজস্ব শক্তিতেই ঘুরে দাঁড়াবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, শেয়ারের ওপর থেকে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের আদেশ জারি করেছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। ২০২২ সালের ২৮ জুলাই কমিশনের জারি করা আদেশ অনুসারে ফ্লোর প্রাইস ও অন্যান্য শর্ত শুধু ৩৫ কোম্পানির শেয়ারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। এছাড়া শেয়ারদরের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন সীমাসংক্রান্ত ২০১৯ সালের ১৪ নভেম্বর জারি করা কমিশনের আদেশ ফ্লোর প্রাইস বহাল রাখা ৩৫ কোম্পানি বাদে বাকি সব কোম্পানির শেয়ারের জন্য প্রযোজ্য হবে। বিএসইসির আদেশে বলা হয়েছে, ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের পর ২০১৯ সালের ১৮ নভেম্বর জারি করা আদেশ অনুসারে শেয়ারদরের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন সীমা হিসাব করা হবে।
কমিশন বলছে, বেশকিছু বিষয় বিবেচনা করে ৩৫টি কোম্পানির ওপর ফ্লোর প্রাইস বহাল রাখা হয়েছে। তিনটি বাদে ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের সব কোম্পানির ওপর ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফ্রি ফ্লোট শেয়ারের ভিত্তিতে যেসব কোম্পানি সূচকের ওঠা-নামায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে সেগুলোর ওপর ফ্লোর প্রাইস বহাল রাখা হয়েছে। যে কোম্পানিগুলোর ওপর ফ্লোর প্রাইস বহাল রাখা হয়েছে তার মধ্যে আটটি হচ্ছে ফ্রি ফ্লোট বাজার মূলধনের ভিত্তিতে শীর্ষে থাকা ২০ কোম্পানির অন্যতম।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের যেসব চেম্বার অব কমার্স রয়েছে তাদের পুঁজিবাজারের দিকে গুরুত্ব দেয়া উচিত। তারা পুঁজিবাজারে জোর না দিয়ে ব্যাংকগুলোকে শোষণ করছে। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসায়ীরা খেলাপি হচ্ছেন। ব্যাংকগুলোও এ সুযোগ করে দিচ্ছে। আবার পুঁজিবাজারে এসেও তারা বিনিয়োগকারীদের ঠকাচ্ছে। তার পরও তো কিছু জবাবদিহির বিষয় রয়েছে। এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থার সম্মতি থাকায় চার-পাঁচজন মিলে জুমের মাধ্যমে এজিএম করে ফেলছে প্রতিষ্ঠানগুলো। এটি কোনো ছোটখাটো ইস্যু নয়। সেগুলোকে আমলে নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া উচিত। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা আরো শক্তিশালী হওয়া উচিত। আর পরিচালনা পর্ষদকে নিজেদের স্বার্থ না দেখে ব্যাংকের স্বার্থকে গুরুত্ব দেয়া উচিত।
দেশের পুঁজিবাজারকে গতিশীল করতে একটি ব্যবস্থাপনার মধ্যে আনা জরুরি। ভালো কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারের সঙ্গে সম্পর্কিত করতে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। দেশের কিছু কোম্পানি হাজার কোটি টাকার ব্যবসা করলেও তাতে জনগণের কোনো মালিকানা নেই। অথচ আমরা তাদের পণ্য কিনছি। পৃথিবীর কোথাও এভাবে বাজার অর্থনীতি দাঁড় করানো হয়নি। এজন্য এ অর্থনীতি কিছুটা এগিয়ে থমকে যাবে। ব্যাংকের অর্থ ও বড় তহবিল দিয়ে বেশি দূর এগোনো যাবে না। গত সাত-আট বছরে সরকার যেসব অবকাঠামো বাস্তবায়ন করেছে, সেগুলো থেকে টোল আদায় করছে। এটি অনেক আগে থেকে হয়ে আসছে। কিন্তু এগুলোকে কোম্পানি করে মার্কেটে তালিকাভুক্ত করা হয়নি। উদাহরণস্বরূপ বম্বে বিমানবন্দর অথবা হিথরো বিমানবন্দর—এগুলো তালিকাভুক্ত কোম্পানি। আমাদের দেশে তা নেই। আমরা বিমানবন্দরকে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ফেলে দিয়েছি, এভাবে আসলে মুক্তবাজার অর্থনীতি চলে না। সরকারি সহায় সম্পত্তি যদি অকার্যকর করে রাখা হয়, তাহলে এটি দেশের জন্য ক্ষতি।
শেয়ার মার্কেট বিস্তৃত করা, অংশগ্রহণমূলক করা ও মধ্যবিত্তদের বিনিয়োগের সুযোগ দেয়ার জন্যই নীতি গ্রহণ করতে হবে। মধ্যবিত্তরা শুধু জমি কিনবে, সঞ্চয়পত্র কিনবে, ফ্ল্যাট কিনবে এটি দুর্বল নীতি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য এগুলো ভালো পলিসি নয়। এজন্য প্রয়োজন ব্যবসা। ব্যবসার একটা সিংহভাগ পুঁজিবাজারে যেতে হবে। সব শ্রেণী যেন সেখানে বিনিয়োগ করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন ফাউন্ডেশন শেয়ারবাজারে রয়েছে। সরকার একটা পেনশন ফান্ড চালু করেছে। বিদেশে কিন্তু পেনশন ফান্ড শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে। যেসব কোম্পানিতে এই ফান্ড বিনিয়োগ করলে লাভ হতো বা নিরাপদ থাকত সেগুলো আমাদের শেয়ারবাজারে নেই; যা আছে খুব কম। এসব নিয়ে সরকারকে ভাবতে হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন বিশ্বের ৩৫তম বৃহত্তম অর্থনীতি হলেও আমাদের এখানে পুঁজিবাজারকে গুরুত্বসহকারে নেয়া হয়নি। বরং যে সুযোগ-সুবিধা ছিল সেগুলো তুলে নেয়া হয়েছে। ফলে আমাদের অর্থনীতির আকার বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুঁজিবাজারে কাঙ্ক্ষিত সম্প্রসারণ হয়নি। শুধু বাজার মূলধন আমাদের জিডিপির মাত্র ১৫ শতাংশ, ভারতে ৩৩ শতাংশের বেশি আর যুক্তরাষ্ট্রে তো আরো বেশি। এশিয়ায় বাজার মূলধনে আমরা সর্বনিম্ন স্তরে থাকা দেশগুলোর সারিতে অবস্থান করছি।
দেশের পুঁজিবাজারকে গতিশীল করতে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) আরো শক্তিশালী হওয়া দরকার। পুঁজিবাজারের আকার বিস্তৃত করতে নীতিনির্ধারকদের সঠিক পলিসি গ্রহণ করতে হবে এবং তা কার্যকরে কঠোর হতে হবে। দেশের ভালো কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে অন্তর্ভুক্তির কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া যেসব বহুজাতিক কোম্পানি বাংলাদেশে কাজ করছে তাদের ১০ শতাংশ শেয়ার পুঁজিবাজারে ছাড়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করতে হবে। আমরা যদি মধ্যম আয়ের দেশ হতে চাই তাহলে পুঁজিবাজারকে আরো বড় হতে হবে এবং তাতে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের উদ্যোগ পুঁজিবাজারের জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখা দেবে—এমনটাই কামনা করছেন বিনিয়োগকারীরা।










