দ্য প্রবলেম
দ্যাট হ্যাজ নো নেইম প্রবন্ধে বেটি ফ্রাইডেন পর্যালোচনা করেছিলেন যে নারীরা
সবকিছুর মধ্যে থেকেও কীভাবে সীমারেখার বাইরে অদৃশ্য রয়ে যায়! সংসার সামলানো, সন্তান
লালন-পালন ও প্রথাগত কাজের বাইরে গিয়ে অন্য সব গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে নারীর
অংশগ্রহণ ছিল খুবই গৌণ যেটাকে বেটি নাম দিয়েছিলেন নো নেইম। অধিকাংশ নারীই এক বুক
হাহাকার নিয়ে একটা জীবন পার করে দিত কিংবা খুব করে চাইত স্বাধীনভাবে মাথা উঁচু
করে বাঁচতে। এটা ছিল বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝির আগ পর্যন্ত নারীর অবস্থান। তবে সময়
এখন অনেকখানি বদলে গেছে। দেরিতে হলেও এ পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ও সমাজ বুঝে গেছে যে
জনসংখ্যার অর্ধেককে নামহীন রেখে কিংবা অন্তর্ভুক্তীকরণ নীতির বাইরে রেখে কোনো
উন্নয়নই পুরোপুরি সম্ভব নয়। তাই সর্বত্রই আজ নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সমতা ও সমান
অধিকারের পক্ষে লড়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশও নারীর সামগ্রিক উন্নয়নে পিছিয়ে নেই, বরং
দক্ষিণ এশীয় অন্যান্য দেশের তুলনায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তথা সামগ্রিক জিডিপির
উন্নয়নে নারীর অবস্থান আসলেই প্রশংসনীয়।
জাতিসংঘের
মানব উন্নয়ন সূচক ২০২৩ অনুযায়ী, বাংলাদেশে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা ৩৮ শতাংশ যদিও আট
বছর ধরে এটি স্থিতিশীলই আছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশের জিডিপির একটি
উল্লেখযোগ্য অংশ আসে পোশাক খাত থেকে, যেখানে কর্মজীবীদের ৬৫ শতাংশই নারী শ্রমিক।
বাংলাদেশের শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতেও নারী ও পুরুষের অনুপাত এখন প্রায় সমান। প্রথাগত
পেশার বাইরেও নারীরা বিভিন্ন চ্যালেঞ্জিং পেশায় নিযুক্ত হচ্ছে প্রতিনিয়ত যা
নিঃসন্দেহে আশাজাগানিয়া। এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে যে এত বাধাবিপত্তি ও নানা প্রতিবন্ধকতা
পেরিয়ে যারা কর্মক্ষেত্রে নিজ নিজ জায়গায় অবদান রাখার মাধ্যমে রাষ্ট্রকে নানা
প্রতিকূলতা থেকে বের হতে সর্বোচ্চ অবদান রাখছেন, তাদের জন্য নাগরিক রাষ্ট্র ও সমাজ
ব্যবস্থা কতটুকু অনুকূলে?
নারীর প্রতি
বৈষম্য নিরোধে আন্তর্জাতিক সনদ হচ্ছে কনভেনশন অন দ্য এলিমিনেশন অব ডিসক্রিমিনেশন অ্যাগেইনস্ট
উইমেন (সিডা)। ১৯৭৮ সালে গৃহীত এ সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ নারীর
অধিকার নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর ও নারী ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে দৃঢ়ভাবে কাজ করে
যাচ্ছে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় সর্বক্ষেত্রে লিঙ্গসমতা ও নারী
ক্ষমতায়নের কথা বলা হয়েছে। অথচ যেসব পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে নারীর উন্নয়ন
কার্য পরিচালনা হবে সেক্ষেত্রে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে কম। গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ
রিপোর্টের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশের পাবলিক ও প্রাইভেট লিডারশিপ
পর্যায়ে নারীর অবস্থান মাত্র ৫ শতাংশ যা হতাশাজনক। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক
প্রতিবেদন অনুযায়ী দেখা যায়, পোশাক শিল্পেও নেতৃত্বাধীন পজিশনে নারীর সংখ্যা মাত্র
১ শতাংশ যেখানে শ্রমিক হিসেবে আছে ৬৫ শতাংশ। তাছাড়া নারী উন্নয়নে কাজ করে এমন
সংস্থাগুলোয় উল্লেখযোগ্য পজিশনে নারী নেতৃত্ব থাকার কথা যদিও বলা হয়, ওই সব লিডিং
পজিশনে নারী আছে মাত্র ২০ শতাংশ।
কাজেই
নেতৃত্ব প্রদানের জায়গাগুলোয় নারীর চ্যালেঞ্জগুলো কোথায় তা খতিয়ে দেখা এখন
সময়ের দাবি!
প্রথম
চ্যালেঞ্জ: বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে নারীরা ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধ ও
পেশাগত সাফল্যে সব সময় একটা দোদুল্যমান অবস্থায় থাকে যেখানে তাকে উভয় দিক
ভারসাম্য রক্ষা করে চলতে হয়। একদিকে যেমন পারিবারিক চাহিদা পূরণের দিকে অগ্রসর
হলে কর্মক্ষেত্রে কিছুটা পিছিয়ে পড়তে হয়, অন্যদিকে অফিসের কাজে বেশি মনোযোগ
প্রদান করলে পারিবারিক দায়িত্ববোধের জায়গায় কিছুটা ব্যাঘাত ঘটে। এ ভারসাম্যপূর্ণ
আচরণের টানাপড়েনেই অনেক নারীকে ক্ষমতাসীন বা নেতৃত্বের পথগুলো থেকে যোগ্যতা এবং
সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কিছুটা পিছু হটতে হয়। সম্প্রতি আরেক গবেষণায় দেখা গেছে,
কর্মজীবী পুরুষের তুলনায় কর্মজীবী নারীকে তিন গুণ বেশি কাজ করতে হয়। তাই নারীর
কাজের ফোকাস কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে আটকে থাকে না।
দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ:
পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন পরিস্থিতির কারণে খুব কম নারীই তার অধিকার প্রতিষ্ঠার
লক্ষ্যে কর্মক্ষেত্রে সর্বোচ্চ লক্ষ্য স্থির করতে পারে। পুরুষ সহকর্মী যেভাবে
আত্মবিশ্বাস নিয়ে চাকরিতে সুবিধার জন্য দরকষাকষি করতে পারে নারী তার সামাজিক
সীমারেখার সীমাবদ্ধতার কারণেই সেভাবে দরকষাকষি করতে পারে না। ফলে স্বভাবতই তাকে
পিছু হটতে হয় উচ্চাসীন পথ ও পদগুলো থেকে।
তৃতীয়
চ্যালেঞ্জ: নারীবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা বা যানবাহন খুবই সীমিত। বিশেষ করে পাবলিক
ট্রান্সপোর্টগুলোয় নারীদের বসার আলাদা ব্যবস্থা খুবই নাজুক। ফলে নারীদের অফিসে ও
বাসায় পৌঁছনোর ক্ষেত্রে খুব বিড়ম্বনা ও তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন নারীদের জন্য পাবলিক ট্রান্সপোর্টগুলোয় অগ্রাধিকার থাকলেও
বাস্তবে সুযোগ খুব কমই। দীর্ঘ কর্মজীবনের প্রতিদিনের এ বিড়ম্বনা কাজে যথেষ্ট ব্যাঘাত
ঘটায় এবং প্রতিদিনই চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। রাজধানী ঢাকার চিত্র আমাদের
সবারই জানা। একদিকে যেমন সন্তানদের স্কুলের সুবিধার্থে বাসা নেয়ার ব্যাপারে নারীরা
কাজের গন্তব্যস্থলকে অগ্রাধিকার দিতে পারে না, অন্যদিকে গুটিকয়েক অফিস ছাড়া প্রায়
সব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থাপনা না থাকায় নারীদের বিড়ম্বনা
প্রতিনিয়ত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার ফলে কাজে গুরুত্ব দেয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
চতুর্থ চ্যালেঞ্জ:
কর্মজীবী মায়ের সন্তানের জন্য ডে-কেয়ার ব্যবস্থা খুবই সীমিত। অনেক সরকারি-বেসরকারি
অফিসে ডে-কেয়ার ব্যবস্থা নেই। ফলে একজন পেশাজীবী নারী যতটুকু সময় আন্তরিকভাবে
তার নিজস্ব পেশায় দিতে পারত, এক্ষেত্রে সন্তানের নিরাপত্তা ও লালন-পালনসংক্রান্ত
চিন্তা না থাকলে তার প্রডাক্টিভ কাজ আরো ত্বরান্বিত হতো! নিম্ন আয়ের পেশাজীবী
নারীর জন্য সরকারি পর্যায়ে যে কয়েকটি ডে-কেয়ার ব্যবস্থা রয়েছে তা প্রয়োজনের
তুলনায় খুবই নগণ্য এবং এগুলোর ব্যবস্থাপনা বেশ নাজুক। ফলে অনেক কর্মজীবী নারী তার
সন্তানের কথা চিন্তা করে কাজে বেশি দূর এগোতে পারে না কিংবা অনেক সময় মাঝপথে
চাকরি ছেড়ে দেয়ার মতো ঘটনা ঘটে থাকে।
পঞ্চম
চ্যালেঞ্জ: কর্মজীবী নারীর জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় কিংবা ক্যারিয়ার
উন্নয়ন সংক্রান্ত ব্যাপারে তাদের প্রাধান্য না দেয়ায় অনেক নারীই ক্যারিয়ার খুব
এগিয়ে নিতে পারে না। কর্মজীবী নারীর জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা সরকারি ও
বেসরকারিভাবে আরো বাড়ানো উচিত এবং টাইম ফ্লেক্সিবল করা উচিত যেহেতু কর্মজীবী অনেক
নারীকেই ঘরে-বাইরে দুটোই সামাল দিতে হয়।
ষষ্ঠ চ্যালেঞ্জ:
নারীদের সাংস্কৃতিক পরিসরগুলোও সংকীর্ণ ও সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। আগে যেখানে যৌথ
পরিবার ছিল, ‘ডিভিশন অব লেবারে’র মতোন সবকিছুই ‘ফাংশনাল ওয়ে’-তে পরিচালিত হতো,
এখন একক পরিবার অবকাঠামোতে একজন নারীকে সবকিছু সামাল দিতে গিয়ে তার নিজস্ব জগৎ
বলে আর কিছু থাকে না। যদিও এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৩০-৪০ বছর বয়সী পুরুষ এখন
সাংসারিক কাজকর্মে তার বাসার সঙ্গীদের প্রয়োজনীয় সাপোর্ট দিচ্ছে আগের থেকে অনেক
বেশি কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় এটি খুবই কম।
এতসব চ্যালেঞ্জ উত্তরণের উপায় কি?
নারী যাতে
নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারে তার জন্য ঘর ও ঘরের বাইরে নারীবান্ধব নগর জরুরি। ঘরে
নারীর জন্য সামগ্রিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। রাষ্ট্রীয়ভাবে নারীর জন্য
বিশেষায়িত পরিবহন ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করা বিশেষ করে সিটি করপোরেশনগুলোয় কর্মজীবী
নারীর হোস্টেল সুবিধা বাড়ানো, কর্মজীবী মায়ের সন্তানের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন
ডে-কেয়ারের সুব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সব ধরনের কর্মস্থলে নারীর প্রতি
সর্বাত্মক সহনশীল মনোভাব প্রদর্শনের মানসিকতাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
সমতার নীতি বলতে শুধু নারীর সমান অধিকারী বোঝায় না, বরং নারীর জন্য নারীর
প্রয়োজন অনুসারে সব ব্যবস্থা নিশ্চিত করা বোঝায়। নারীদের লিডারশিপ স্কিল ডেভেলপমেন্টের
জন্য আলাদা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখতে হবে। রাষ্ট্রীয় আইন ও সংশ্লিষ্ট অফিশিয়াল
নীতির বাইরে গিয়ে অনেক অফিসে মাতৃত্বকে নিরুৎসাহিত করা হয় যে এটি কর্মক্ষেত্রে
একজন নারীর সুদীর্ঘ অবদানের ক্ষেত্রে সাময়িক বাধা প্রদান করে। তাই এক্ষেত্রে তাদের
পরিপূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করতে হবে।
সর্বোপরি,
রাষ্ট্রের সফলতা কখনই অর্জিত হবে না যদি কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা গোত্র পিছিয়ে
থাকে। আর যেখানে অর্ধেক জনসংখ্যার যথাযথ সম্ভাবনা রাষ্ট্র পৃষ্ঠপোষকতা দিতে পারবে না,
সে সমাজের উন্নতির সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দেয়া অসম্ভব। আমাদের প্রত্যাশা নারী দিবস কেন্দ্র
করে আগামীর বাংলাদেশ নারীবান্ধব, সমতা এবং ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে মেধার সর্বোচ্চ
অগ্রাধিকার দিয়ে এগিয়ে যাবে উন্নতির চূড়ান্ত শিখরে। এমনটিই প্রত্যাশা রইল।
তানিয়া সুলতানা: সহকারী
পরিচালক, এসওএস শিশুপল্লী।










