বর্তমান সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে প্রযুক্তির ভূমিকা অপরিসীম। বিশেষ করে এসএমইগুলোর (দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প) ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ। আগামীতে স্মার্ট অর্থনীতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার অবশ্যম্ভাবী বলে মত দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। এজন্য ব্যবসার প্রসার এবং উত্তরোত্তর সমৃদ্ধির জন্য প্রযুক্তির যথোপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

বণিক বার্তায় প্রকাশ, স্মার্ট অর্থনীতি বিনির্মাণে এসএমইগুলোর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। ‘স্মার্ট এসএমইদের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি’ বিষয়ক সেমিনারে এ কথা বলা হয়। বস্তুত এসএমইদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো, সহায়ক নীতিমালা প্রণয়ন ও প্রয়োজনীয় সংস্কার বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ভবিষ্যতে স্মার্ট অর্থনীতিতে রূপান্তরে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে। 

দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা বেগবান করার পাশাপাশি বিশেষ করে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে এসএমই খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এ বিষয়টিও সেমিনারে উঠে আসে। নয় মিলিয়ন এসএমই উদ্যোক্তা কৃষিপণ্য উৎপাদনসহ ব্যবসার বিভিন্ন খাতে প্রায় ২৪ দশমিক ৫ মিলিয়ন লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে। জিডিপিতে তাদের অবদান প্রায় ২৫ শতাংশ। এজন্য সময়ের প্রয়োজনে এসএমইদের প্রযুক্তি বিষয়ে সক্ষমতা বৃদ্ধিকল্পে অর্থায়নের সুযোগ বৃদ্ধি, তথ্যপ্রযুক্তি গ্রহণে স্বল্প সুদে পুনঃঅর্থায়ন সহায়তা প্রদান, ফিনটেক ব্যবস্থার সর্বাত্মক ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, টেকনোলজি ট্রান্সফার, কর ও শুল্কবিষয়ক সহায়তা প্রদান, নীতি সহায়তা প্রভৃতি বিষয়ের ওপর জোরারোপ করা উচিত।

ডিজিটাল বাংলাদেশের ধারাবাহিকতায় স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে স্মার্ট প্রশাসনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি স্মার্ট ইকোনমি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য ব্যবসা-বাণিজ্যের অনুমোদন পেতে সরকারি সংস্থাগুলোয় প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পেলে জনগণের ভোগান্তি ও ব্যয় কমবে এবং সেবার মান বাড়বে। তারই ধারাবাহিকতায় এসএমই খাতে যথাযথ তথ্যপ্রাপ্তির বিষয়টি এ খাতের সম্প্রসারণে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে অপরিহার্য ভূমিকা রাখবে বলে আশা 

করা যায়।

এসএমই উদ্যোক্তারা যেহেতু অর্থনীতি ও জিডিপিতে সবচেয়ে বেশি হারে অবদান রেখে আসছেন, তাই প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। সামগ্রিকভাবে মাথাপিছু আয়, জ্বালানি সক্ষমতাসহ অন্যান্য সূচকে আমাদের উন্নয়ন হয়েছে এবং এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে দেশের বেসরকারি খাত। এক্ষেত্রে এসএমই উদ্যোক্তাদের অগ্রণী ভূমিকা প্রশংসনীয়। নানা প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে তারা ব্যবসায়িক কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। এ খাতের উদ্যোক্তাদের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে সক্ষমতা বাড়ানো গেলে অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন আনা সম্ভব। এজন্য প্রযুক্তি গ্রহণে ভয়ভীতি দূর করতে হবে।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ৮৫টি কার্যালয় ও প্রায় ১০০ কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিম রয়েছে, যেখান থেকে এসএমই উদ্যোক্তাদের ৫ শতাংশ হারে ঋণ সহায়তা দেয়া হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে এসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়নে বিসিক নানা ধরনের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।

অন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ ডেভেলপমেন্ট এবং গ্লোবাল ইনোভেশন সূচকে বাংলাদেশ যথাক্রমে ৮৪ ও ১০৫তম স্থানে রয়েছে। তাই এক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে এসএমইদের অবস্থান উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার, আর্থিক সহায়তার সীমাবদ্ধতা এবং দক্ষতার অভাব দেশের এসএমই খাতের উন্নয়নে অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গণ্য হয়। এজন্য ব্যবসার প্রসারে প্রযুক্তি গ্রহণে অগ্রসর হতে হবে।

এছাড়া উচ্চ কর ও শুল্কহার, টেকনোলজি বিষয়ক ‘নো-হাউ’ পিছিয়ে থাকা, সক্ষমতার অভাব, প্রযুক্তিগত বিনিয়োগের উচ্চমূল্য, তথ্য সুরক্ষা, সাইবার সিকিউরিটি এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা প্রভৃতি বিষয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য বেশ চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের স্মার্ট এসএমইতে রূপান্তরের লক্ষ্যে নীতিমালার সংস্কার ও সহায়ক নতুন নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি। পাশাপাশি ব্যবসার বিকাশে এসএমইদের সহজ শর্তে ঋণ সহায়তা প্রাপ্তির পরিবেশ উন্নয়নে কর্তৃপক্ষের ভূমিকা জরুরি। এজন্য প্রযুক্তির প্রসারের বিকল্প নেই।

এসএমইদের বিকাশে সর্বাত্মক সহযোগিতা দেয়া এখন সময়ের দাবি। দেশে বর্তমানে ডিজিটাল ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু হয়েছে। এ অবস্থায় ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেমে অংশগ্রহণ বাড়াতে সবার মধ্যে আস্থা বৃদ্ধিতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। 

মূলত পর্যাপ্ত তথ্যের অভাবে অনেক সময় সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায় না। বিশেষ করে এসএমইদের সার্বিক উন্নয়নে এ খাতে একটি ডাটাবেজের প্রয়োজনীয়তা সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। বর্তমানে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের ক্ষেত্রে বেশ অগ্রগতি লক্ষণীয়। এক্ষেত্রে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ দেশে ই-কমার্স খাতের আরো বিকাশে ‘ক্রস-বর্ডার ট্রেড’ সম্প্রসারণ করতে হবে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে সারা দেশে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা বাস্তবায়নে গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে প্রযুক্তিগুলোর সর্বাত্মক ব্যবহারের পরামর্শও দেয়া হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে। এসএমই খাতে প্রযুক্তির ব্যবহারকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকের ৯০০ কোটি টাকার ফান্ড আছে। শুধু প্রডাক্ট, সার্ভিস, প্রসেস এবং টেকনোলজি প্রভৃতি খাতে নতুনত্ব নিয়ে আসতে পারলে মাত্র ৪ শতাংশ হারে এ ফান্ড থেকে ঋণ সহায়তা মিলবে।

সমগ্র বিশ্ব যেখানে প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিবর্তিত হচ্ছে, সেখানে দৃশ্যমান বাস্তবতায় প্রযুক্তির বাইরে থাকার সুযোগ নেই। সময়ের তাগিদেই প্রযুক্তির সংশ্লিষ্টতা বাড়াতে হবে। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার শুধু করলেই হবে না, এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার ব্যবহারও করতে হবে। দেশের এসএমই খাত ভালো থাকলে অর্থনীতি ভালো থাকবে। তাই অর্থনীতির স্বার্থেই এসএমই খাতের বিকাশে অনুকূল পরিবেশ বজায় রাখতে হবে। এক্ষেত্রে প্রযুক্তি নিয়ামক ভূমিকা পালন করবে তা নির্দ্বিধায় বলা যায়।