কয়েক দশকে দেশের অর্থনীতি যে গতিতে সম্প্রসারণ হয়েছে, ডিজিটাল খাতের প্রসার ঘটেছে তার চেয়ে ধীরগতিতে। অর্থনীতির আকার ৪৬৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ডিজিটাল খাত এখনো সেভাবে প্রভাববিস্তারী ও দ্রুতবর্ধনশীল খাত হিসেবে সুনাম অর্জন করতে পারেনি। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের এক হিসাব বলছে, ২০১৬ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের মোট জিডিপিতে ডিজিটাল অর্থনীতির অবদান ৩ শতাংশেরও কম। বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে বস্তুগত সম্পদের চেয়ে মেধাসম্পদ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রতিটি খাতের জন্য মেধাভিত্তিক মানবসম্পদ গড়ে তুলতে হবে। তাহলে জিডিপিতে ডিজিটাল খাতের অবদান বাড়বে। তবে এটা ঠিক, সময়ের প্রয়োজনে বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্রমেই ডিজিটাইজেশনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু এর গতি অপেক্ষাকৃত ধীর। ডিজিটাল অর্থনীতির গতি বাড়াতে দক্ষ জনসম্পদ তৈরি ও অবকাঠামো উন্নত করা জরুরি।

মোট দেশজ উৎপাদনে ডিজিটাল খাতের অবদান বাড়াতে প্রথমে প্রয়োজন মেধাভিত্তিক মানবসম্পদ তৈরি, যারা প্রয়োজনীয় ডিজিটাল টুলস বা প্রযুক্তি বা উপকরণ ব্যবহার করে বেশি মূল্য সংযোজন করতে পারে। যে দেশে মেধাবী মানবসম্পদ রয়েছে তারাই অর্থনীতিকে এখন ডিজিটাল করতে সক্ষম হচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একসময় কৃষির অবদান ছিল ৮০ শতাংশ। অথচ তখন ছিল খাদ্য ঘাটতির দেশ। এখন কৃষির অবদান কমে এসেছে মাত্র ১৯ শতাংশে। তার পরও বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন বাড়তির দিকে। মেধা ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে—এটাই ডিজিটাল অর্থনীতির প্রাথমিক রূপ। এরপর কৃষিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস, আইওটি ইত্যাদি প্রযুক্তির ব্যবহার কৃষি অর্থনীতিকে নতুন মাত্রায় উন্নীত করবে। আবার উৎপাদিত কৃষিপণ্য সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছানোর জন্য মেধা ও প্রযুক্তির ব্যবহারই হচ্ছে ডিজিটাল অর্থনীতি। উৎপাদনশীলতাকে বাদ দিয়ে ডিজিটাল অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করা যায় না। আধুনিক বিশ্বে মেধাভিত্তিক সম্পদ যাদের বেশি রয়েছে তারা কিন্তু কৃষি, শিল্প-ব্যবসা-বাণিজ্য, সেবা খাতসহ সব ক্ষেত্রেই এগিয়ে রয়েছে। যার কারণে অনেক শিল্পোন্নত দেশের কৃষি উৎপাদন কৃষিভিত্তিক দেশের তুলনায় বেশি হয়ে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ৩৭ ভাগ অবদান রাখছে মেধাভিত্তিক সম্পদ। চীন, ভারত এখন মেধাভিত্তিক সম্পদ গড়ে তোলার জন্য জাতীয় পর্যায়ে নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। 

২০২২ সালে চীনে ডিজিটাল অর্থনীতির পরিমাণ ৫০ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ইউয়ানে ছাড়িয়ে গিয়েছিল, যা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম। জিডিপির পরিমাণ ছিল ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ। ডিজিটাল অর্থনীতি চীনের স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি ও অর্থনীতির রূপান্তর বেগবান করার গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। চীনে ডিজিটাল অবকাঠামোর আকার অনেক বেড়েছে। বাংলাদেশের মানুষের বড় সুবিধা হচ্ছে, তারা দ্রুত আপগ্রেড টেকনোলজি নিজেদের আয়ত্তে নিতে পারে। দেশে বর্তমানে ১৫ কোটি মোবাইল সংযোগ আছে এবং অন্তত ১০ কোটি লোক মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। প্রায় ১০ কোটি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। এখন ৫ মিনিট ইন্টারনেট বন্ধ থাকলে অর্থনীতির ওপর যে প্রভাব পড়বে তা চিন্তাও করা যায় না। অথচ আজ থেকে ১০ বছর আগে ইন্টারনেটের কোনো প্রভাবই অর্থনীতিতে ছিল না। ফেসবুক ব্যবহার করে হাজার হাজার তরুণ নিজের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। ফেসবুক থেকে সরাসরি জিনিসপত্র বেচাকেনা হচ্ছে। ইন্টারনেটে জিনিস পছন্দ করে অর্ডার দিলেই তা বাসায় পৌঁছে যাচ্ছে। মূল্য পরিশোধ করে ভোক্তা তা গ্রহণ করতেও পারছে। 

সরকারের বক্তব্য হলো, বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতি ইতিবাচকভাবে বিকাশমান। বিপুল পরিমাণ ফ্রিল্যান্সার গড়ে উঠেছে। যাদের মাধ্যমে অর্জন অনেক বেড়েছে। বাংলাদেশে বসেই বাংলাদেশের অনেক নারী-পুরুষ ফ্রিল্যান্সার পশ্চিমা বিশ্বের প্রতিষ্ঠানের আওতায় স্থায়ীভাবে কাজ করছে। এ অর্জনগুলো এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান হচ্ছে না। ঋণপত্র খোলা থেকে শুরু করে পণ্য জাহাজে ওঠা ও তার বিপরীতে অর্থপ্রাপ্তির মাধ্যমে রফতানির ক্ষেত্রে কার্যক্রমগুলো যতটা দৃশ্যমান, একজন ফ্রিল্যান্সারের কার্যক্রমগুলো সেই তুলনায় দৃশ্যমান হতে পারেনি। তবে দৃশ্যমান না হলেও জিডিপিতে তাদের অবদান প্রকাশ পাচ্ছে। এভাবে ডিজিটাল অর্থনীতির ব্যাপ্তিও বাংলাদেশে বাড়ছে। বাংলাদেশের ডিজিটাল জিডিপি কমেনি। মোট জিডিপির আকার অনেক বেড়েছে, সেখানে ডিজিটাল জিডিপির অংশ কম দেখা যাচ্ছে। করোনাকালে সামগ্রিক কর্মকাণ্ড কিছুটা বিঘ্নিত হয়েছে, এর কিছু প্রভাব ডিজিটাল জিডিপিতে পড়তে পারে। এছাড়া আমাদের পেমেন্ট গেটওয়েগুলো নিয়ে কিছু সমস্যা আছে। এক্ষেত্রে ইনফরমাল চ্যানেলের ব্যবহার বাড়ছে। মূল কথা হলো, মোট জিডিপিতে ডিজিটাল জিডিপি যতটা দৃশ্যমান হওয়ার কথা ততটা হচ্ছে না। আদতে ডিজিটাল জিডিপি কমছে না বরং বাড়ছে।

পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক এবং যুগোপযোগী করা দরকার। মানবসম্পদের ৯০ শতাংশই এখনো কায়িক শ্রমের ওপর নির্ভরশীল। তাদের যদি মেধাভিত্তিক সম্পদে পরিণত করা যায়, তাহলে সত্যিকার ডিজিটাল অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। শিক্ষার মূল লক্ষ্য হবে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো। থাইল্যান্ডের জাতীয় নীতিমালা হচ্ছে, তারা যা-ই উৎপাদন করুক না কেন এর মাধ্যমে ১৫ শতাংশ সৃজনশীলতার মাধ্যমে মূল্য সংযোজন বাড়াতে হবে। এ মূল্য সংযোজন বাড়াতে হলে মেধাবী মানবসম্পদ তৈরি করতে হবে। সৃজনশীলতা বাড়ানো এবং মূল্য সংযোজন বৃদ্ধির উপযোগী মানবসম্পদ গড়ে তুলতে হবে। দেশে ৪০টি সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ানো হয়। এখান থেকে যারা পাস করে বের হচ্ছেন তারা যে খুব ভালো করতে পারছেন এমনটাও নয়। কম্পিউটার সায়েন্সে পড়া শতকরা পাঁচজন ছাত্রছাত্রীকে প্রোগ্রামার হিসেবে পাওয়া যায় না। উচ্চশিক্ষার সঙ্গে সৃজনশীলতা বাড়ানোর কোনো সংযোগ নেই। যার কারণে উচ্চশিক্ষার হার বাড়লেও মেধাবী মানবসম্পদের পরিমাণ বাড়ছে না। বাংলাদেশে ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশনে যাওয়ার পথে বড় বাধা ও কঠিন চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্রচলিত ও বিদ্যমান আমলাতন্ত্র। এর ডিজিটাল রূপান্তর প্রয়োজন। 

অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে অনলাইন শ্রমশক্তির সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী দেশ হচ্ছে ভারত। বাংলাদেশের তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে গৃহিণীরা এ খাতে যেভাবে যুক্ত হচ্ছে, পর্যাপ্ত সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেলে এ খাতে বিশ্বে শীর্ষস্থানে যাওয়া অসম্ভব কিছু নয়। এক্ষেত্রে সরকার যে কাজটি করতে পারে তা হচ্ছে ইন্টারনেটের গতি বৃদ্ধি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা, তরুণ-তরুণীদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি সহজ করা। যদি শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত এসব সুবিধা নির্বিঘ্ন করা যায়, তবে খাতটি দ্রুত এগিয়ে যাবে। এ খাতের সুবিধা হচ্ছে, খুব বেশি পুঁজি লাগে না। বাসায় বসে কম্পিউটার বা যেকোনো স্থানে মোবাইলে কাজ করা যায়। এর জন্য অফিস বা আলাদা জায়গার প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশ তথ্য ও প্রযুক্তি অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর ফ্রিল্যান্সাররা ১০ কোটি ডলার আয় করছে। ক্রমেই এ আয় বাড়বে এবং অর্থনীতির একটি শক্তিশালী খাতে পরিণত হবে। বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সাররা মূলত সেলস ও মার্কেটিংয়ে পারদর্শী। অন্যদিকে ভারতের ফ্রিল্যান্সারদের দক্ষতা প্রযুক্তি ও সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টে। এদিকটিতে বাংলাদেশের তরুণ ও যুবশ্রেণী পর্যাপ্ত সহযোগিতা ও প্রশিক্ষণ পেলে দ্রুতই অগ্রসর হতে পারবে। এতে আয়ও বেড়ে উঠবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে যে হারে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে তাতে স্ব-উদ্যোগ ও স্বনিয়োজিত আউটসোর্সিং হতে পারে বেকার সমস্যা নিরসন এবং অর্থনীতির অন্যতম খাত। বলার অপেক্ষা রাখে না, মেধাবিকাশ এবং সম্মানজনকভাবে জীবিকা নির্বাহের জন্য খাতটি নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে। অনেক শিক্ষিত নারী যারা চাকরি করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না, তারা এ কাজে বেশি যুক্ত হতে পারে। এরই মধ্যে বাংলাদেশে অনেক শিক্ষিত নারী এ খাতে যুক্ত হয়েছেন। নিজের সংসার খরচ চালানোর পাশাপাশি অর্থনীতিতে অবদান রেখে চলেছে। আউটসোর্সিংয়ের খাতটি এমনই যে প্রত্যন্ত গ্রামে বসেও তা করা যায়। বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশ এমন একটি দেশ যেখানে ৬৫ শতাংশ তরুণ যাদের বয়স ২৫ বছরের নিচে। এ বিপুল তরুণ শ্রেণীর ওপরই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নির্ভর করছে। তবে তাদের সিংহভাগ ফ্রিল্যান্সিংয়ের বিষয়টি অবগত নয়। তাদের অবহিত করে প্রশিক্ষণ দিয়ে এ খাতে নিয়োজিত করতে পারলে দেশের অর্থনীতির গতি আরো বাড়বে।