একটি দেশের জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের অন্যতম উৎস তরুণ শ্রমশক্তি। বর্তমানে বাংলাদেশে তরুণদের সংখ্যা বেশি, মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশই তরুণ। তবে বেকার তরুণের সংখ্যাও কম নয়, ক্রমেই বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিক (জানুয়ারি-মার্চ) শেষে দেশে তরুণ জনশক্তির সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৫৯ লাখ ২০ হাজার। ২০২৩ সালের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৭৩ লাখ ৮০ হাজার। সে অনুযায়ী এক বছরের ব্যবধানে দেশে যুব শ্রমশক্তি সংকুচিত হয়েছে ৫ শতাংশের বেশি।

দেশে বেকার সমস্যা প্রকট। বিবিএসের সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ হিসাবে বর্তমানে দেশে বেকারের সংখ্যা ২৫ লাখ ৯০ হাজার। এর মধ্যে তরুণদের বেকারত্বের সংখ্যা বাড়াটা আরো বেশি উদ্বেগজনক, যেহেতু তারা দেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় জনশক্তি। বিশেষজ্ঞদের মতে, তরুণ শ্রমজীবীর সংখ্যা হ্রাসের অন্যতম কারণ কর্মসংস্থানের অভাব। শ্রমবাজারে তরুণদের অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনে পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া দেশের টেকসই দারিদ্র্য বিমোচনে কর্মসংস্থানের গুরুত্ব অপরিসীম। দেশের সার্বিক উন্নয়ন বিবেচনায় চলমান সময়ে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা অতি আবশ্যক। বিবিএসের তথ্যমতে, বিগত পাঁচ বছরে শিল্প খাতে কর্মসংস্থান তেমন বাড়েনি। যদিও কৃষি খাতে কিছুটা গতিশীলতা পেয়েছে কর্মসংস্থান। তবে সেখানে নিয়োজিত ব্যক্তিপ্রতি উৎপাদনশীলতা হ্রাস পেয়েছে।

তরুণরা শিল্প খাতের প্রধান শক্তি। জ্বালানি সংকটে এ খাতে প্রবৃদ্ধি কমেছে। ফলে এ খাতে এখন শ্রমের চাহিদা নেই। কর্মসংস্থানে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। আবার কৃষি খাতে কর্মসংস্থান বাড়লেও এটি এখনো অনানুষ্ঠানিক খাত হিসেবেই রয়ে গেছে। ফলে তরুণরা এটির প্রতি খুব বেশি আকৃষ্ট নয়। সুতরাং একদিকে যেমন নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে, তেমনি কর্মসংস্থানের মানের বিষয়টিতেও নজর দেয়া প্রয়োজন। শ্রমবাজারকে আনুষ্ঠানিক খাত হিসেবে গড়ে তুলতে না পারলে তরুণদের দেশে রাখা সম্ভব হবে না।

কাজের সুযোগের অভাবে এবং উপযুক্ত কর্মসংস্থান না থাকায় এরই মধ্যে অনেকেই বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, গত বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গেছেন ১৩ লাখ ৫৪ হাজার বাংলাদেশী। এ বছর এখন পর্যন্ত বিদেশে যাওয়া মানুষের সংখ্যা ২ লাখ ৩৬ হাজার ৮৩৭। জনসংখ্যাতত্ত্ববিদদের মতে, দেশে চলমান আর্থিক সংকট ও বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় প্রবৃদ্ধি কমেছে। যার কারণে কর্মসংস্থানের সংকুলান হচ্ছে না। বিপরীতে মানুষ বিদেশে যাওয়ার দিকে ঝুঁকছে। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষিত তরুণ জনগোষ্ঠী। এখানে উল্লেখ্য, শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হারও বেশি।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক প্রতিবেদন মতে, বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা অর্জন করা ৪৭ শতাংশ শিক্ষার্থীই বেকার থাকছেন। পাশের দেশ ভারতে এ হার ৩৩ শতাংশ। তাদের ভিন্ন একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজগুলো থেকে বের হওয়া শিক্ষার্থীদের ৬৬ শতাংশই বেকার। অর্থাৎ তিন ভাগের দুই ভাগই বেকার থাকছেন। আর মাত্র ৭ শতাংশ শিক্ষার্থী অন্য কোনো বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, ৩ শতাংশ শিক্ষার্থী নিজের উদ্যোগে কাজ করছেন। দেশে বছরে চাকরিপ্রত্যাশী প্রায় ২০ লাখ মানুষ রয়েছে। কিন্তু মানসম্মত কর্মসংস্থানের অভাবে উচ্চশিক্ষা শেষে বাড়ছে বেকার সংখ্যা।

এর পেছনে অবশ্য বর্তমান প্রেক্ষাপটের অন্য একটি কারণকে অস্বীকার করার অবকাশ নেই। সেটি হলো সরকারি চাকরি, বিশেষ করে নির্দিষ্টভাবে একটি চাকরির (!) আশায় বসে থাকা। এ চাকরির বাস্তবতা হলো এতে নিয়োগ প্রক্রিয়া বেশ দীর্ঘ। উচ্চশিক্ষা শেষে যখন একজন তিন-চার বছর এক চাকরির আশায় বসে থাকেন, মধ্যবর্তীকালীন তাকে তরুণ বেকার হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। 

একসময় শিক্ষিত তরুণ সমাজ বেসরকারি চাকরির প্রতি আকৃষ্ট থাকলেও গত কয়েক বছরে সরকারি চাকরিতে সুযোগ-সুবিধা বেড়েছে বহগুণে। ফলে চাকরিপ্রত্যাশী মানুষের পছন্দের চাকরির তালিকার শুরুতে জায়গা করে নিয়েছে সরকারি চাকরি। বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারিভাবে চাকরির সংকুলান করা কোনো পরিস্থিতিতে সম্ভব বলে মনে হয় না। আর যেখানে বাংলাদেশের রয়েছে বিপুল জনগোষ্ঠীর বিপরীতে সীমিত সম্পদ। তবে সরকারের উচিত চাকরির সুযোগ-সুবিধাজনিত বৈষম্যের আকার যেন খুব বড় না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতকেও এ বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে। তাদেরও তরুণদের আকৃষ্ট করার মতো কর্মপরিবেশ তৈরিতে তৎপর হতে হবে। নয়তো প্রবৃদ্ধি আরো নিম্নমুখী হবে। 

তবে চাকরির ক্ষেত্রে তরুণদেরও নিজেদের প্রশ্ন করা শিখতে হবে। দেশের চাকরির অন্যতম দুটি খাত কৃষি ও শিল্প। এই দুই খাতে কারিগরিভাবে দক্ষ লোকের চাহিদা অনেক বেশি। অনেক সময় দেখা যায়, শিক্ষিত তরুণদের মাঝে দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। সরকারি চাকরির চেষ্টায় ব্যর্থ হওয়ার পর অনেকেই বেসরকারি বা এসব খাতে যুক্ত হতে চান। কিন্তু প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবে তারা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেন না। তরুণদেরও এ বিষয়ে খেয়ালি হতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে কারিগরি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়াতে হবে। আবার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে না পারলেও সরকারের শিক্ষিত বেকারদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন। যেন তারা উদ্যোক্তা হতে পারে, আত্মকর্মসংস্থান তৈরি করতে সক্ষম হন।

সর্বোপরি কর্মসংস্থান বাড়ানোর জন্য সরকারকে নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে জোর দিতে হবে। শ্রমঘন শিল্প ও সেবা খাত প্রসারের বিষয়ে চিন্তা করা এখন সময়ের দাবি। এক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও মাঝারি মানের শিল্পের প্রসারে কাজ করা যেতে পারে। যাদের পুঁজি নেই তাদের প্রণোদনাসহ ক্ষুদ্র ঋণ প্রদানের ব্যাপারে তৎপর হলে বেকার সংখ্যা যেমন কমে আসবে, তেমনি সরকারের রাজস্বও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায় বেকার জনগোষ্ঠীকে কর্মক্ষম করে তোলার প্রকল্প বেকারত্ব হ্রাসে একটি ভালো কৌশল হতে পারে। তবে বেকারত্ব হ্রাসে দেশের শ্রমবাজারকে আনুষ্ঠানিক খাতে পরিণত করা সবচেয়ে বেশি জরুরি। এজন্য শিক্ষা, দক্ষতা ও সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। শ্রমবাজার আনুষ্ঠানিক হলে তা আয়বৈষম্য কমিয়ে আনতে সহায়ক হয়। তখন কর্মপরিবেশের মান বাড়বে, উৎপাদশীলতা বৃদ্ধি পাবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে।