আমাদের প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ কমে যাচ্ছে। এ অবস্থায় দেশের জ্বালানি খাত আমদানিনির্ভর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রতি ঝুঁকে পড়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানিকে (বাপেক্স) আরো কার্যকর করার কথা বলা হলেও সেটি স্থবির হয়ে আছে। ডলার সংকটে এগোচ্ছে না কূপ খনন ও সংস্কার কার্যক্রম। যে কারণে গ্যাস উত্তোলনে বাপেক্সের সক্ষমতা কাজে লাগানোর সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এতে কাজগুলো বিদেশী কোম্পানির হাতে চলে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলন, কূপ খনন ও সংস্কারের লক্ষ্যে পাঁচটি রিগ (কূপ খননযন্ত্র) মেরামত ও আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেয় বাপেক্স। দুই বছর আগে নেয়া প্রায় ২০০ কোটি টাকার প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হতে কয়েক মাস বাকি রয়েছে। কিন্তু রিগ মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে ডলার সংস্থান না হওয়ায় কোম্পানিটি সময়মতো ঋণপত্র (এলসি) খুলতে পারেনি। এতে প্রকল্পটির কার্যক্রম স্থবির হয়ে গেছে। এদিকে আরেকটি রিগ সংস্কারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ফলে বিদ্যমান প্রকল্প থেকে রিগটি বাদ দিতে হয়েছে।
মূলত ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে বাপেক্সের এ প্রকল্প বাস্তবায়নে ঝুঁকির উদ্ভব হয়। প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দেয়ার পরও এলসি খুলতে না পারা এখন প্রকল্পের বড় দুর্বলতা হিসেবে দেখা দিয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) থেকে প্রকল্পের বিষয়ে সম্প্রতি এমন প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে।
অন্যদিকে ৪২ বছরের পুরনো রিগ মেরামতের পরিকল্পনাকে দুর্বল বলে মূল্যায়ন করেছে আইএমইডি। বর্তমানে বাপেক্সের কাজ চালানোর মতো রিগের সংখ্যা চার। এর মধ্যে দুটি আবার বহু বছরের পুরনো।
বস্তুত বাপেক্সের রিগ সংস্কার ও আধুনিকায়ন প্রকল্প প্রস্তাবের ক্ষেত্রে যুক্তি ছিল, শুধু পাঁচটি রিগ মেরামত এবং আধুনিকায়নে সংস্থাটির ব্যয় হবে ১৪০ কোটি টাকা। অন্যদিকে নতুন করে এসব রিগ কিনতে হলে আনুমানিক ১ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা ব্যয় হতো। সেই তুলনায় রিগ সংস্কার করলে তাতে ব্যয় সাশ্রয় হবে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার বেশি। কিন্তু রিগ সংস্কারে প্রকল্পের মালপত্র কিনতে এলসি খোলার জন্য প্রয়োজনীয় ডলারের অভাবই সামনে চলে এসেছে।
কিন্তু জাতীয় স্বার্থে আমাদের জ্বালানি খাতের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে এ বিষয়ে সুবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। কেননা রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এলএনজি আমদানি ব্যয় মেটাতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে ৭ হাজার ১৮১ কোটি টাকার ঋণ চেয়েছে।
যেহেতু আমাদের বিপুল অর্থ ব্যয় করে এলএনজি কিনতে হয়, সে হিসেবে গ্যাসের স্থানীয় অনুসন্ধানে কেন ডলারের সংস্থান করা যাচ্ছে না তা প্রশ্নবিদ্ধ হতে বাধ্য। ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থেই এটি জরুরি। এদিকে এলসি খুলতে না পারায় প্রকল্পের রিগ মেরামতে বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় করা যায়নি। এটি জ্বালানি বিভাগের ৪৬টি কূপ খনন পরিকল্পনার মতো ভালো উদ্যোগকে ব্যাহত করতে পারে, যা মোটেও ইতিবাচক নয়।
অতীতে গ্যাস অনুসন্ধানে বাপেক্সের সক্ষমতা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এমনকি গ্যাস উত্তোলনে বিদেশী কোম্পানির অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে অনেক বিতর্কও হয়েছে। যে কারণে বাপেক্স যেন আরো কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে, সে বিষয়ে জোর দেয়া হচ্ছিল। নতুন গ্যাসকূপ অনুসন্ধানসহ পরিত্যক্ত গ্যাসকূপ থেকে গ্যাস উত্তোলন, এমনকি সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানেও বাপেক্সের সক্ষমতা নিয়ে কথা হয়েছে। এজন্য বাপেক্স যেন আরো সক্ষম হতে পারে সেদিকেই জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়েছেন। এ রকম পরিস্থিতিতে ডলার সংকটে রিগ আধুনিকায়নের কাজ থমকে যাওয়া অপ্রত্যাশিত। আমরা বাপেক্সকে কার্যকর ভূমিকায় দেখতে চাই। এজন্য বর্তমান সংকটের সময়েও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যেন বাপেক্সের কূপ খননের কাজ গতিশীল থাকে, সেজন্য রিগ সংস্কার প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় ডলার বরাদ্দ দেয়া গুরুত্বের দাবি রাখে। কারণ চলমান প্রকল্প যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে ভবিষ্যতে কোনো প্রকল্প নেয়া হলে তাতে ব্যয় আরো বাড়বে এবং ডলার সংকট না কাটলে তখন ডলারের সংস্থান আরো কঠিন হয়ে যাবে। তাই রিগ আধুনিকায়নের বর্তমান প্রকল্প কাজে লাগানোই দূরদর্শিতার পরিচয় হবে। প্রত্যাশা করব, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
দেশে গ্যাস উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়াতে জ্বালানি বিভাগ ২০২৫ সালের মধ্যে ৪৬টি কূপ খননের পরিকল্পনা করেছে। এক্ষেত্রে বাপেক্সকে কাজে লাগানোর স্বার্থেই রিগগুলো সংস্কার করা প্রয়োজন। কেননা স্থানীয় সরবরাহ কমে যাওয়ায় ২০১৮ সাল থেকে গ্যাস আমদানি করা হচ্ছে। বর্তমানেও গ্যাস আমদানি করেই জ্বালানি বিভাগ চাহিদা পূরণের পথে এগোচ্ছে। এ আমদানিনির্ভরতা না কাটালে আগামী দিনগুলোয় দেশের সার্বিক অর্থনীতিই মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এভাবে এলএনজির ওপর নির্ভরশীলতা বজায় থাকলে ভবিষ্যতে আমদানিনির্ভরতা আরো বাড়বে। অতিরিক্ত এ আমদানিনির্ভরতা অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের আর্থিক চাপে ধাবিত করবে। এজন্য স্থানীয় পর্যায়ে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বাপেক্সের সক্ষমতা ধরে রাখতে রিগগুলোর আধুনিকায়ন জরুরি।










