বিগত সরকারের শাসনামলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের অর্থনীতি। সুশাসন ও শৃঙ্খলার অভাব এতটাই প্রকট ছিল যে অর্থনীতি প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েছিল। ঋণ জালিয়াতি, অর্থ পাচার থেকে শুরু করে শেয়ারবাজারে কারসাজিসহ অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাতেই চলেছে দুর্বৃত্তপনা। তারল্য সংকটে পড়েছিল রাষ্ট্রায়ত্ত থেকে শুরু করে আধাসরকারি ও বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক। ব্যাংক খাতের ক্ষত হয়ে উঠেছে সীমাহীন খেলাপি ঋণ। আবার একদিকে সরকারি ঋণপ্রবাহ বেড়ে গিয়েছিল। বিপরীতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমেছে বেসরকারি খাতে। এতে বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ে। বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি ব্যাহত হয়েছে। ব্যাংকের মাধ্যমে আসা বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ কমে গিয়েছিল এবং অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বাণিজ্যেও দেখা দিয়েছিল আস্থার সংকট। সব মিলিয়ে ভেঙে পড়েছিল পুরো ব্যাংক ও আর্থিক খাত। বিভিন্ন অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিকীকরণ, সুশাসনের অভাব ও নৈতিক অবস্থানে দুর্বলতা এসব কারণে অর্থনীতির গতি কমে আসে। নানা সংকটে পড়ে মূল্যস্তর স্ফীত হতে থাকে, যা সাধারণ মানুষের ওপর আর্থিক চাপ বাড়িয়েছে। সেই সঙ্গে আর্থসামাজিক বৈষম্য চরমে পৌঁছেছে। বলা বাহুল্য, বিগত সরকারের বিরুদ্ধে সংঘটিত গণ-অভ্যুত্থানের পেছনে অর্থনৈতিক দুর্নীতির বড় ভূমিকা ছিল।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে গঠন করা হয় অন্তর্বর্তী সরকার। স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা ছিলে সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় শীর্ষে থাকবে অর্থনৈতিক সংস্কার। এ লক্ষ্যে সরকারের বিশেষ দুটি উদ্যোগ ছিল। এক. বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিবিষয়ক শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি ও অর্থনৈতিক কৌশল পুনর্নির্ধারণসংক্রান্ত টাস্কফোর্স গঠন। প্রায় তিন মাস কাজ করে শ্বেতপত্র কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। সেই প্রতিবেদনে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের লুটপাট, অর্থ পাচার, ব্যাংক খাতের অনিয়ম, বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতিসহ নানা ধরনের অনিয়ম উঠে এসেছে। শ্বেতপত্রে বলা হয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের ২৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। সরকারি প্রকল্প থেকে ঘুস লেনদেন হয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার কোটি থেকে ২ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার মতো। আর এ ঘুস নিয়েছেন রাজনৈতিক নেতা, আমলা ও তাদের সহযোগীরা। উন্নয়ন প্রকল্পের খরচের ৪০ শতাংশ পর্যন্ত টাকা অপচয় ও লুটপাট হয়েছে। এছাড়া শ্বেতপত্রে রাষ্ট্রীয় সহযোগিতায় ব্যাংক দখলের কথাও উঠে এসেছে। দেশের ব্যাংক খাতে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা এবং শেয়ারবাজার থেকে আত্মসাৎ করা হয়েছে ১ লাখ কোটি টাকা।

এসব ক্ষতের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতির সংস্কারে সুপারিশও উল্লেখ করা হয় শ্বেতপত্রে। সংশ্লিষ্ট কমিটি শ্বেতপত্রে অনতিবিলম্বে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের কাঠামো তৈরি, ২০২৫-২৭ সময়ের জন্য পরিকল্পনা করা; সংস্কারের অগ্রাধিকার ঠিক করা; এলডিসি উত্তরণের কৌশল ঠিক করে পরিচালনা; টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জনের গতি বাড়ানো এবং উন্নয়ন সহযোগীদের নিয়ে একটি সংলাপ আয়োজন করার ওপর বিশেষ মনোযোগ দেয়ার সুপারিশ করেছিল।

এদিকে টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে অর্থনীতি ও আর্থসামাজিক বিষয়ে নানা ধরনের সুপারিশ করা হয়। তার মধ্যে অন্যতম এমন কর ব্যবস্থা চালু যে পদ্ধতিতে ধনীদের কাছ থেকে বেশি কর আহরণ করা হবে। টাস্কফোর্স শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো এবং সেবা সহজলভ্য করার ওপরও জোর দিতে বলেছে।

বাস্তবতা বিচারে দেখা যায়, শ্বেতপত্র বা টাস্কফোর্সের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে সরকারের জোরালো উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। যে কারণে শীতকালীন মৌসুমে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও সার্বিক মূল্যস্ফীতির হারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি। এখনো সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার নয় অংকের ওপরে। বরং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে দফায় দফায় নীতি সুদহার বাড়ানোয় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমেছে, যেখানে অর্থনীতির প্রায় ৯০ ভাগ এ খাতের ওপর নির্ভরশীল। কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধিতেও তেমন কোনো গতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না। উপরন্তু বিভিন্ন পণ্যে ভ্যাট বাড়িয়ে পরোক্ষ করের আওতা বাড়ানো হয়েছে। আর পরোক্ষ করের বোঝা নির্দিষ্ট আয়ের জনগণকে বইতে হয়। অথচ প্রয়োজন ছিল প্রত্যক্ষ করের আওতা বাড়ানোর। তবে গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বড় ধরনের বিপর্যয়ের যে আশঙ্কা থাকে, সেটি অন্তর্বর্তী সরকার এড়াতে সক্ষম হয়েছে। এজন্য সাধুবাদ। তবে যেসব উদ্যোগ জোরালোভাবে নেয়ার প্রয়োজন ছিল তা উপেক্ষিতেই রয়ে গেছে। সংস্কার নাকি নির্বাচন—এ বিতর্কে যেমন সরকার আটকে আছে, তেমনি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের বিষয়ে সরকারের সম্পৃক্ততা বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। যদিও রাজনৈতিক বিভেদ যেমন স্পষ্ট, তেমনি সেভাবে প্রশাসনিক কাজের গতি এখনো বাড়েনি। আমলাতন্ত্রে বরং অস্থিরতা বিরাজ করছে। আবার স্বস্তিদায়ক ব্যবসার পরিবেশ তৈরি হয়নি। ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের মাঝে এখনো আস্থার সংকট প্রকট হয়ে আছে। আস্থা পুনরুদ্ধারে অর্থনীতিবিদরা নীতি ধারাবাহিকতা নিশ্চিতের কথা বললেও তা নিয়ে কোনো উদ্যোগ নেই। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে নীতি ধারাবাহিকতা রক্ষায় শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রতিবেদনে অন্তত একটি মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা করার পরামর্শও দেয়া হয়েছিল। সেটিও বাস্তবায়ন হয়নি। সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক সংস্কার পিছিয়ে গেছে।

উপরন্তু গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট, জ্বালানি সংকট, শ্রমিক অসন্তোষসহ নানা কারণে বেশকিছু বড় কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। এতে বেকারত্বের হার বাড়ছে। কিন্তু সে অনুপাতে কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি নেই।

দুঃখজনকভাবে স্বল্পমেয়াদি বা টেকসই অর্থনৈতিক সংস্কারের লক্ষ্যে যে পরিস্থিতি প্রয়োজন, সেক্ষেত্রেও নানামুখী চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। সংস্কারের জন্য সব অংশীজনের যেভাবে অংশগ্রহণ দরকার, সেটি দেখা যাচ্ছে না। ফলে কাঠামোগত সংস্কারের ক্ষেত্রে সংশয় তৈরি হয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে জনমনে যেসব প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তার মধ্যে অন্যতম ছিল অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, যা অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে সহায়ক হবে। তবে সেসব প্রত্যাশার কিছুটা ফিকে হয়ে এসেছে। জনমনে যে সংশয় তৈরি হয়েছে সেটি দূর করতে হলে সরকারের দৃশ্যমান কিছু উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। সরকারের সবার ওপরে অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, যা চব্বিশের বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণও বটে। সেজন্য বিশেষজ্ঞদের থেকে পাওয়া সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে মনোযোগ দিতে হবে। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া কোনো সংস্কার ফলপ্রসূ হবে না।