দেশের এক-দশমাংশ অঞ্চল নিয়ে গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম। প্রকৃতিগতভাবে তিন পার্বত্য জেলার প্রান্তিক মানুষের সুপেয় পানির জোগান দিত পাহাড়ের ঝিরি-ঝরনা ও ছড়াগুলো। প্রাকৃতিক উৎসের অফুরন্ত পানিকে কেন্দ্র করে মুখর ছিল পাহাড়ের জনজীবন। তবে কয়েক বছর ধরে চিত্র ভিন্ন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ছড়া ও ঝিরি-ঝরনাগুলোয় বছরের বেশির ভাগ সময়ই পানি পাওয়া যাচ্ছে না। পাহাড়ের প্রান্তিক মানুষ সুপেয় ও ব্যবহার্য পানির সংকটে ভুগছে। বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে এ তিন জেলার জনজীবন। এমনকি তীব্র তাপপ্রবাহে পুড়ে যাচ্ছে খেতের ফসল। তীব্র তাপপ্রবাহ এবং পানির সংকটে কৃষিকাজ ও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। সব মিলিয়ে পার্বত্য অঞ্চলে সুপেয় পানির সংকটে বিপাকে পড়েছে সাধারণ মানুষ।
ঝিরি-ঝরনা ও পানির উৎস নষ্ট হওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে বন উজাড়ের মতো কর্মকাণ্ডে ঝিরি-ঝরনা ও পানির উৎস নষ্ট হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বেড়েছে। এর প্রভাবে পাহাড়ের ওপর অবস্থিত জলাধারগুলো দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে পাহাড়ে বৃক্ষ নিধনের ফলে পানি চক্রের স্বাভাবিকতা ব্যাহত হচ্ছে। বড় গাছগুলো পানি সংরক্ষণ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু এসব গাছ উজাড় হওয়ার ফলে পানি চক্র পাল্টেছে, যার প্রভাব পাহাড়ি অঞ্চলের পাদদেশে অবস্থিত সমতল এলাকায়ও পড়ছে। একসময় পাহাড়ে সেগুন বাগান সৃজন করিয়েছিল বন বিভাগ। বর্তমানে পানি সংকটের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামে সেগুন বাগান সৃজনকেও দায়ী করছেন পরিবেশকর্মী ও বন কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল হওয়ার আশায় পাহাড়ের মানুষ দীর্ঘদিন সেগুন বাগান সৃজন করে আসছে। কিন্তু এতে পরিবেশ ও জলবায়ুর ওপর ক্রমাগত বিরূপ প্রভাব পড়ছে। পাহাড়ে বনজ বৃক্ষ বা পানি সংরক্ষণে উপযোগী বৃক্ষ সৃজন না করে সেগুনের বিস্তার বাড়ায় দিন দিন শুষ্ক হয়ে পড়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিবেশ-প্রতিবেশ। কেননা সেগুন গাছ প্রচুর পানি শোষণ করায় পানির স্তর নিচে নামছে। এ গাছের ছায়া যেখানে পড়ে সেখানে অন্য কোনো বৃক্ষ জন্মাতে পারে না। জন্মালেও বেড়ে উঠতে পারে না। সেগুন গাছ কাঠের জন্য উপযোগী হলেও পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।
পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিবেশ ও জনজীবন নানাভাবেই হুমকির মুখে, তা কারো অজানা নয়। পাহাড়ে আকর্ষণীয় পর্যটনের আড়ালে থেকে যাচ্ছে সেখানকার মানুষের সমস্যা ও সংকট। শিক্ষা ও চিকিৎসার চরম অভাব তো সেখানে সবসময়ই রয়েছে। এখন যুক্ত হয়েছে সুপেয় পানির সংকটও। এ সংকটের কারণে অনেক পাহাড়ি পাড়া উচ্ছেদের হুমকির মুখে পড়েছে। একসময় পাহাড়ে প্রাকৃতিক বনের আধিক্য ছিল। প্রাকৃতিক বনাঞ্চলই পাহাড়ের পানি ধরে রাখতে পারে। ফলে পাহাড়ের বাসিন্দাদের পানি নিয়ে দুশ্চিন্তাও ছিল না। পরবর্তী সময়ে প্রাকৃতিক বনাঞ্চল উজাড় করে সেগুন বাগান তৈরির প্রবণতা শুরু হয়। পাশাপাশি কাঠ ব্যবসার নামে স্থানীয় প্রভাবশালীদের যোগসাজশে প্রাকৃতিক মাতৃগাছের বনাঞ্চল ধ্বংস করা হচ্ছে।
শুষ্ক মৌসুমে বা প্রচণ্ড গরমে পানির সংকট বেড়ে যায়। বৃষ্টি হলে দুর্ভোগ কিছুটা কমে। পানির ভোগান্তি সবচেয়ে বেশি হয় নারীদের। পাহাড়ের পাদদেশের ঝিরি-ঝরনা থেকে পানি সংগ্রহ করতে দিনের অর্ধেক সময় ও শারীরিক শক্তির সবটা শেষ হয়ে যায়।
বর্তমানে প্রকৃতির সঙ্গে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর লড়াইয়ের অন্যতম বিষয় হচ্ছে বিশুদ্ধ পানি। সমতলের মানুষের কাছে পানির অপর নাম জীবন হলেও পাহাড়ি মানুষের কাছে বেঁচে থাকার লড়াইয়ের একটি প্রধান অংশ হলো সুপেয় পানি। পাহাড়ি এলাকায় পানির স্তর নিচে থাকায় নলকূপ স্থাপন করা খুবই কষ্টকর, কিছু কিছু ক্ষেত্রে অসম্ভবপ্রায়। কোনো রকমে নলকূপ স্থাপন করা গেলেও শুষ্ক মৌসুম আসতে না আসতেই তা অকেজো হয়ে যায়। তাই পাহাড়ি জনগোষ্ঠী সুপেয় পানির জন্য পুরোটাই প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। বর্ষাকালে যখন নদী, ঝিল, ঝরনা, ছড়া পানিতে পূর্ণ থাকে তখন পাহাড়িদের সুপেয় পানির তেমন অভাব হয় না। ঝিরিতে পাথরের বাঁধ স্থাপন করে তারা পানি সঞ্চয় করে রাখে। কোনো কোনো জায়গায় প্রাকৃতিকভাবেই তৈরীকৃত পাথরের স্তূপে পানি জমে থাকে। এ পানিই তারা তাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনে ব্যবহার করে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক বন উজাড়ের মতো কর্মকাণ্ডে প্রতিনিয়তই প্রাকৃতিক পানির উৎসগুলো নষ্ট হচ্ছে। ফলে পাহাড়ি এলাকায় ক্রমেই সুপেয় পানির সংকট তীব্র হচ্ছে।
গ্রীষ্মকালে যখন প্রচণ্ড তাপে নদী ও ঝিরির পানি শুকিয়ে যায় তখন পাহাড়ে দেখা যায় তীব্র পানি সংকট। একটুখানি বিশুদ্ধ পানির জন্য মাইলের পর মাইল তাদের পাড়ি দিতে হয়। তবু বিশুদ্ধ পানি পাওয়া নিয়ে থাকে অনিশ্চয়তা। বিশুদ্ধ পানির অভাবে তখন তাদের নদী ও ঝিরির তলানিতে অনেক দিন ধরে জমে থাকা পানি পান করতে হয়। ফলে দেখা যায় ডায়রিয়া, আমাশয়সহ নানা রকম পানিবাহিত রোগ।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, বান্দরবানের রুমা উপজেলার থোওয়াইব ঝিরিনির্ভর তংমকপাড়া, পলিসে ঝিরিনির্ভর মোয়ালপিপাড়া ও ক্যলুংখ্যং ঝিরিনির্ভর পলিতংপাড়ায়ও তিন-চার বছর ধরে পানির পানির সংকট রয়েছে। পাইন্দু ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অভিযোগ করেছেন, ওই তিনটি পাড়ায় প্রাকৃতিক পানির উৎসনির্ভর বিকল্প পানিপ্রযুক্তি গ্র্যাভিটি ফ্লো সিস্টেম (জিএফএস) স্থাপনের লক্ষ্যে কয়েক বছর ধরে উন্নয়ন বোর্ড ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে ঘুরেছেন। তার পরও কোনো কাজ হয়নি। এখানে পানি সংকট নিরসনে প্রশাসনের দায়িত্ব অবহেলা স্পষ্ট। পাহাড় এলাকায় সুপেয় পানির সংকট নিরসনে প্রশাসনের আরো দায়িত্বশীল হওয়া উচিত।
পাহাড়ের এ পানি সংকট মোকাবেলায় প্রথমে প্রশাসনকে এগিয়ে আসতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে বন উজাড়ের মতো কর্মকাণ্ড রোধ করতে হবে। প্রাকৃতিক পানির উৎসগুলো সংরক্ষণে প্রশাসনের পদক্ষেপ কাম্য। সেগুন বাগান যেহেতু প্রাকৃতিক পানির উৎস নষ্ট করছে, সেহেতু সেগুন বৃক্ষ রোপণ থেকে সরে আসা উচিত। পানি সংরক্ষণ উপযোগী প্রাকৃতিক বন যাতে উজাড় না হয় সেদিকে বিশেষ নজর দেয়া উচিত। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর পানি সংকটের সমাধানের জন্য বৃষ্টির পানি স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।










