বিপুলসংখ্যক মানুষ রান্নার কাজে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করে থাকে, যা এলপিজি বা এলপি গ্যাস নামে অধিক পরিচিত। এটি মূলত দাহ্য হাইড্রোকার্বন গ্যাসের মিশ্রণ। জ্বালানি হিসেবে রান্নার কাজে, গাড়িতে এর ব্যবহার হয়। আগে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাসের ব্যবহার শুধু শহরকেন্দ্রিক থাকলেও বর্তমানে সিলিন্ডারের মাধ্যমে গ্রাম-গঞ্জসহ সারা দেশেই ব্যাপক হারে গ্যাস ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে অসতর্ক ব্যবহারের কারণে বাড়ছে দুর্ঘটনা, যা প্রায়ই মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সম্প্রতি বণিক বার্তায় ভয়ানক এক খবর প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, এলপিজি ফিলিং স্টেশনে কোনো ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ব্যতিরেকেই রান্নার গ্যাস সিলিন্ডার রিফিল হচ্ছে। এলপিজি এখন অটোগ্যাস হিসেবে গাড়িতে ব্যবহার হচ্ছে এবং এটি জনপ্রিয় হচ্ছে। তবে অত্যন্ত শঙ্কার বিষয় হলো এখন অবৈধ উপায়ে এলপিজি সিলিন্ডারে ক্রস ফিলিং। এটি ব্যাপক হারে বাড়ছে, যা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এ ধরনের অবৈধ ক্রস ফিলিংয়ের কারণে এ খাতের নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। এ বিষয়ে এখনই নিয়ন্ত্রক সংস্থার জোরালো ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।
রান্নার গ্যাস সিলিন্ডারে ফিলিং স্টেশন থেকে রিফিলিংয়ের পেছনে কাজ করছে স্বল্প ব্যয় ও মুনাফা। বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকেই জানা যাচ্ছে এ প্রক্রিয়ায় ১২ কেজির সিলিন্ডারে ২০০-৩০০ টাকা লাভ করা যায়। ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও ব্যবসায়ীরা কাজটি করছেন। কর্তৃপক্ষ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সামনে এমন বিপজ্জনক কাজ চললেও কোনো ব্যবস্থাই নেয়া হচ্ছে না, যা দুঃখজনক। সারা দেশে ফিলিং স্টেশনগুলোর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে এলপিজি অপারেটররা অটোগ্যাসের ব্যবসা করছেন। তবে সেই গ্যাস উন্মুক্ত পদ্ধতিতে ভরা (ক্রস ফিলিং) হচ্ছে ফিলিং স্টেশনেই। অধিক মুনাফার আশায় অনেকেই জড়িয়ে পড়ছেন অবৈধ এ ব্যবসায়। এতে যেকোনো সময় বড় ধরনের বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটতে পারে। কারণ রিফিল সংমিশ্রণ সঠিকভাবে না হলে গ্যাস সিলিন্ডারের নিচে বসে থাকে। নাড়াচাড়ার কারণে মারাত্মক দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়েছে। রান্নার এলপিজি সিলিন্ডার খালি হওয়ার পর তা নির্ধারিত কোম্পানির পরিবেশকদের মাধ্যমে রিফিল স্টেশনে পাঠানো হয়। যেখানে সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত রয়েছে। খালি সিলিন্ডারে ছিদ্র বা ক্ষয় রয়েছে কিনা তা কারখানায় নিয়ে পরীক্ষা করা হয়। বিস্ফোরক পরিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী, পরীক্ষা করা হয় সিলিন্ডারের মান। এরপর পুনরায় তাতে গ্যাস ভর্তি করা হয়। অন্যদিকে রান্নার কাজে ব্যবহৃত এলপিজিতে ৭০ শতাংশ কোপেন ও ৩০ শতাংশ ডিউটেন সংমিশ্রণ থাকে। আর গাড়িতে ৬০ শতাংশ কোপেন ও ৪০ শতাংশ ডিউটেন সংমিশ্রণ করে ব্যবহার করতে হয়। কোপেন ও ডিউটেন সংমিশ্রণের পার্থক্য থাকায় এলপিজি গ্যাস কোনোভাবেই রান্নার কাজে ব্যবহার করা যায় না। কিন্তু না জেনে না বুঝে এলপিজি স্টেশনগুলো রান্নার সিলিন্ডারে গ্যাস রিফিল করে দিচ্ছে। আর এসব সিলিন্ডার ব্যবহার হচ্ছে রান্নার কাজে। এতে যেকোনো সময় বড় ধরনের বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটতে পারে। কারণ গ্যাস তৈল জাতীয়। রিফিল সংমিশ্রণ সঠিকভাবে না হলে গ্যাস সিলিন্ডারের নিচে বসে থাকে। নাড়াচাড়ার কারণে বিস্ফোরণ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সরকার সারা দেশে সিলিন্ডার ব্যবহারের ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবেশ তৈরি করেছে, ফলে নারীদের সময় অপচয় রোধ হয়েছে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ তৈরি হয়েছে, স্বল্প সময়ে অনেক রান্নার আয়োজনে সুবিধা তৈরি হয়েছে। আগে লাকড়ি ব্যবহারের কারণে চুলায় আগুন তৈরির উপকরণ সংগ্রহে রাখার জন্য একটা নির্দিষ্ট শুষ্ক স্থানে এসব উপকরণ স্তূপ করে রাখা হতো। গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের পর এটার প্রয়োজন এখন আর হচ্ছে না বললেই চলে। গ্যাস ব্যবহারের ফলে এখন একটা খোলামেলা পরিবেশ তৈরি হয়েছে। নারীরা এখন সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। মফস্বল ও গ্রাম-গঞ্জেও আধুনিকতার ছোঁয়া এখন লক্ষণীয়। এটা জনগণের জন্য এক আশীর্বাদ। কিন্তু সেটির যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্যমতে, ২০২২ সালে ৯০টি সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। একই বছর এই সংস্থার হিসাবে গ্যাসলাইন ও গ্যাস সিলিন্ডারের কারণে ৭৬৭টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া অক্সিজেন ও হাইড্রোজেন সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটেছে বেশ কয়েকটি। এলপিজি সিলিন্ডারের ব্যবহার জীবনকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি বাড়িয়েছে নিরাপত্তা ঝুঁকি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার, অব্যবস্থাপনা ও অবৈধ ব্যবহারের ফলে বিপদ বাড়ছে। স্থানীয় পর্যায়ে অনেক ব্যবসায়ী কোনো অনুমোদন ছাড়া নিজেরাই সিলিন্ডার ভরে গ্যাস বিক্রি করছে। এটাকে বলা হচ্ছে ক্রস ফিলিং। এটি অনিরাপদ। কারণ, এলপিজি কোম্পানিগুলোতে আধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে সিলিন্ডারে গ্যাস ভরা হয়। সিলিন্ডার পরীক্ষা করে বাল্ব ও সেফটি ক্যাপ বসানো হয়। আর ক্রস ফিলিংয়ে হাতের সাহায্যে বাল্ব বসানো হয়। তাই সিলিন্ডার ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।
এলপিজি সিলিন্ডার ক্রস ফিলিং আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এ ধরনের কাজে গ্রাহকরা যেমন প্রতারিত হচ্ছেন, তেমনি ফিলিং স্টেশনগুলোয় রয়েছে বিস্ফোরণের তীব্র ঝুঁকি। এলপিজি বিধিমালা, ২০০৪-এর ১০৮ বিধি অনুযায়ী, স্বয়ংক্রিয় ইঞ্জিনের জ্বালানি সরবরাহের কাজে নিয়োজিত এলপিজি বিতরণ স্টেশন (ডিসপেন্সিং স্টেশন) থেকে মোটরযানে বা অন্য কোনো স্বয়ংক্রিয় ইঞ্জিনের সঙ্গে সংযুক্ত জ্বালানি ধারণপাত্র ব্যতীত অন্য কোনো বহনযোগ্য পাত্রে এলপিজি ভর্তি করা যাবে না। যদি এ ধরনের বেআইনি কাজে কেউ জড়িত থাকে, তা এলপিজি বিধিমালা অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ। এক্ষেত্রে প্রত্যাশা থাকবে যেসব এলপিজি স্টেশন রান্নার কাজে ব্যবহৃত গ্যাস সিলিন্ডারে অবৈধ রিফিলিংয়ের কাজ করছেন তাদের লাইসেন্স বাতিল করা হোক।
বিস্ফোরণ প্রতিরোধে সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক। অনুমোদিত বিক্রেতাদের কাছে থেকেই গ্যাস সিলিন্ডার কেনা উচিত। এ সাথে নিশ্চিত করতে হবে সিলিন্ডারে কোম্পানির সিল রয়েছে কি না, সিলিন্ডারটির সেফটি ক্যাপটি সুরক্ষিতভাবে লাগানো রয়েছে কি না, ভূমির সমতলে সমান ও শুষ্ক জায়গায় সিলিন্ডারটি রাখা হয়েছে কি না। গ্যাস ভর্তি অবস্থায় সিলিন্ডার টানাহেঁচড়া বা মাটিতে গড়ানো কোনোভাবেই ঠিক না। বিক্রেতা বা ডেলিভারিম্যানের কাছ থেকে সিলিন্ডারের যথাযথ ব্যবহারবিধি ও ম্যানুয়াল সম্পর্কে জেনে নেয়া উচিত। বিস্ফোরণ রোধে বিস্ফোরক পরিদপ্তর থেকে গ্যাস সিলিন্ডারের যেসব নিরাপত্তা নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, তা মেনে চলতে হবে সতর্কতার সঙ্গে। সর্বোপরি, ফিলিং স্টেশনে রান্নার গ্যাস সিলিন্ডার রিফিল বন্ধ করতে হবে।










