বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী দুর্যোগের মাত্রা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।৷গ্লোবাল ক্লাইমেট ইনডেক্স ২০২০ অনুযায়ী বিশ্বের ১৭১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। বন্যা, খরা, নদীভাঙন, ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড়, সাইক্লোনসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে আবিষ্ট বাংলাদেশ। পাশাপাশি রয়েছে অগ্নিকাণ্ড, ভবনধসসহ মানবসৃষ্ট দুর্যোগ। এসব দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকারি পদক্ষেপের সঙ্গে প্রয়োজন স্থানীয় নেতৃত্বের সমন্বয়,৷ প্রয়োজন স্বেচ্ছাসেবকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। প্রতি বছর ৫ ডিসেম্বর বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবক দিবস পালিত হয়। ১৯৮৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের অধিবেশনে সারা বিশ্বে স্বেচ্ছাসেবীদের অবদানের কথা সর্বত্র তুলে ধরা, যেকোনো দুর্যোগে মানবিক সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে তাদের দক্ষ করে গড়ে তোলা এবং স্বেচ্ছাসেবার গুরুত্ব তুলে ধরে নাগরিকদের স্বেচ্ছাসেবায় আগ্রহী করে তোলার উদ্দেশ্যে এ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

স্বেচ্ছাসেবা কথাটির সঙ্গে মানুষের, সমাজের এবং দেশের এক গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আর সেই স্বেচ্ছাসেবাকেই তরুণ প্রজন্ম উদ্দীপনার সঙ্গে গ্রহণ করেছে। তারা তাদের স্বেচ্ছাসেবার ব্রত নিয়ে পৌঁছে যাচ্ছে মানুষের দোরগোড়ায়৷ আগে দেশী-বিদেশী অল্প কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের হয়ে সীমিতসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবকের দেখা মিললেও বর্তমানে দেশের তরুণরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠিত সংগঠনের পাশাপাশি নিজ উদ্যোগে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তৈরি করছেন। এর মাধ্যমে তারা সমাজের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে একসঙ্গে হয়ে কাজ করছেন। জাতিসংঘ গৃহীত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলে স্বেচ্ছাসেবীদের কাজের পরিধি আরো বিস্তৃত হয়। এসডিজি বাস্তবায়নে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগগুলো বেশ বড় ভূমিকা পালন করছে। বর্তমানে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর তৎপরতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। স্বেচ্ছাসেবার এক নতুন ধারা উন্মোচিত হয়েছে বর্তমান তরুণ সংগঠকদের হাত ধরে। একটা সময় পর্যন্ত স্বেচ্ছাসেবা বলতে শুধু অন্যের উপকারের কথা ভাবা হতো, কিন্তু বর্তমানে স্মার্ট তরুণরা একে নিজেদের দক্ষতা উন্নয়নের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছেন। এখন স্বেচ্ছাসেবা মানে শুধু মানুষের জন্য কাজ করা নয়, নিজের দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে নিজেকে পরবর্তী জীবনের জন্য প্রস্তুত করার একটি মাধ্যম। নেতৃত্বচর্চা, নেটওয়ার্কিং, যোগাযোগের দক্ষতাসহ নানা ধরনের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য তরুণরা এখন স্বেচ্ছাসেবী কাজের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হচ্ছে। মানুষকে শুধু সাহায্য করা নয়, তাদের অধিকার, কর্তব্য সম্পর্কেও ধারণা দিচ্ছে এ আলোকিত তরুণরা। স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা সমাজের প্রতি তাদের দায়বোধের বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে তাদের সুন্দর কাজের মাধ্যমে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় প্রাতিষ্ঠানিক, সামাজিক ও পারিবারিক পর্যায়ে নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়। এর মধ্যে সামাজিক পর্যায়ে গৃহীত কর্মকাণ্ডগুলোর সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবক ও স্থানীয় অংশীদাররা সরাসরি জড়িত। বাংলাদেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সরকারি কর্মকর্তা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের পাশাপাশি তরুণদের অংশগ্রহণের হার ২৮ দশমিক ২ শতাংশ। বর্তমানে দেশে স্বেচ্ছাসেবক, বিশেষ করে নারী স্বেচ্ছাসেবকের সংখ্যা বাড়ছে এবং যার ফলে দুর্যোগকালে মৃত্যুসহ দুর্যোগের সাধারণ ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমছে। বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া দুর্যোগে হতাহতদের মধ্যে নারী ও শিশুদের সংখ্যাই বেশি। দুর্যোগকালীন এ বিশেষ সময়ে তাদের সহায়তায় নারী স্বেচ্ছাসেবীরা অগ্রগামী ভূমিকা পালন করছেন। দুর্যোগ মোকাবেলায় স্বেচ্ছাসেবার রোল মডেল হিসেবে বাংলাদেশ বহির্বিশ্বে পরিচিতি পেয়েছে। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ও সরকারের সমন্বয়ে গঠিত সাইক্লোন প্রিপেয়ার্ডনেস প্রোগ্রামের (সিপিপি) স্বেচ্ছাসেবকরা দেশের ৪২টি উপজেলায় তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে চলেছে। বর্তমানে সিপিপি স্বেচ্ছাসেবক সংখ্যা ৭৬ হাজার ২০। এ স্বেচ্ছাসেবকদের ৫০ শতাংশ নারী। জনসেবায় অবদান রাখার জন্য জাতিসংঘের সম্মানজনক ‘জাতিসংঘ জনসেবা পদক-২০২১’ পেয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। সিপিপি নারী ক্ষমতায়ন উদ্যোগের স্বীকৃতি হিসেবে ‘এসডিজি অর্জনে জেন্ডার-রেসপন্সিভ সেবা’ ক্যাটাগরিতে এ পদক পেয়েছে। 

যুবকদের উন্নয়নে বাংলাদেশ সরকার ‘জাতীয় যুব নীতিমালা ২০১৭’ প্রণয়ন করে। সেই নীতি অনুযায়ী সরকার যুব সংগঠনকে যুবদের ক্ষমতায়নের অন্যতম সোপান হিসেবে বিবেচনা করে। সেখানে যুবকদের কর্মোদ্যম ও পরোপকারী মনমানসিকতাকে সঠিকভাবে চালিত করার লক্ষ্যে নতুন সংগঠন প্রতিষ্ঠায় উৎসাহ প্রদানের কথাও বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে নানা সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করা হয়। তাছাড়া কর্মক্ষেত্রে নিয়োগের সময় এসব অভিজ্ঞতাকে বিবেচনার আওতায় আনার জন্যও গুরুত্বারোপ করা হয়। যুবনীতিতে আন্তঃদেশীয় স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে তরুণদের এক দেশ থেকে অন্য দেশে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি করা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পারস্পরিক সৌহার্দ্য বাড়াতে তাদের ভূমিকার সম্পৃক্ততা বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার প্রধান দলিল হিসেবে সরকার ‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন ২০১২’ আইন প্রণয়ন করে। পাশাপাশি ‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০১৫’ অনুমোদিত হয়েছে। এসব যেমন দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের আইনি পরিসীমা সম্পর্কে নির্দেশনা প্রদান করে তেমনি সামগ্রিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে সহায়ক হিসেবে ভূমিকা রাখছে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট সব অংশীদারকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সব পর্যায়ে নিজেদের দায়িত্ব, কর্তব্য ও করণীয় সম্পর্কে অবহিত করার উদ্দেশ্যে ‘দুর্যোগবিষয়ক স্থায়ী আদেশাবলি ২০১৯’ প্রণীত হয়। সমাজ ও দেশের স্বার্থে স্বেচ্ছাসেবকরা যেকোনো দুর্যোগ মোকাবেলায় দ্রুত সাড়াদানকারী হিসেবে অংশ নেন। দেশের আর্থিক প্রবৃদ্ধি ও টেকসই মানবিক উন্নয়নে স্বেচ্ছাসেবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সংযুক্তি এবং অবদান উল্লেখযোগ্যভাবে দৃশ্যমান। এজন্য তাদের স্বীকৃতি প্রদানের লক্ষ্যে সরকার ‘জাতীয় স্বেচ্ছাসেবা নীতিমালা’ প্রণয়ন করতে চলেছে। এর মূল লক্ষ্য স্বেচ্ছাসেবাকে জাতীয় উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করা। আর্থসামাজিক এবং সামগ্রিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখা, স্বেচ্ছাসেবা কার্যক্রমে অনানুষ্ঠানিক স্বেচ্ছাসেবী এবং নিবন্ধিত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সক্রিয় অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করা। এর মাধ্যমে স্বেচ্ছাসেবার মূল চেতনার উন্নয়ন ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় স্বেচ্ছাসেবাকে সুদৃঢ় করাও সরকারের উদ্দেশ্য। জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (২০২১-২৫) বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সেন্দাই ফ্রেমওয়ার্ক ফর ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশনের লক্ষ্যগুলো অর্জনে সরকার বদ্ধপরিকর। সরকার গৃহীত পদক্ষেপের সঙ্গে এ লক্ষ্যগুলো সামঞ্জস্যপূর্ণ। 

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে তিনটি বিষয় সরাসরি জড়িত। প্রথমটি হলো দুর্যোগ-পূর্ববর্তী প্রস্তুতি, দ্বিতীয়টি হলো দুর্যোগ চলাকালীন কর্মকাণ্ড এবং তৃতীয়টি হলো দুর্যোগ-পরবর্তী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কার্যক্রম। এ তিন পর্যায়েই সরকারের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবক ও স্থানীয় নেতৃত্বের ভূমিকা বিস্তর। যেকোনো এলাকার ভৌগোলিক অবস্থান ও সামগ্রিক বিষয় সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি অবগত স্থানীয় পর্যায়ের অংশীদাররা। ওইসব এলাকায় যখন দুর্যোগ আঘাত হানে তখন তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর সুযোগ থাকে। যেহেতু স্থানীয় নেতৃত্ব দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সব পরিস্থিতি সম্পর্কে নেতৃত্ব দেয়, সুতরাং তাদের মতামত ও পরামর্শকে প্রাধান্য দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন। 

দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি ব্যবহার উপযোগী মডেল তৈরি করেছে। দুটি প্রধান উপাদানের ওপর ভিত্তি করে মডেলটি নির্মিত। প্রথমত, ঝুঁকি হ্রাস, যার মধ্যে রয়েছে ঝুঁকি পরিবেশ নির্ধারণ করা ও এর ভিত্তিতে ঝুঁকি পরিবেশ ব্যবস্থাপনা। স্বচ্ছাসেবক ও স্থানীয় নেতৃত্বের অংশীদাররা এ দুই বিষয় সামনে রেখে দুর্যোগকালে সহায়তা দিয়ে থাকেন। এক্ষেত্রে তারা দুর্যোগ সম্পর্কে সম্যক ধারণা গ্রহণ করে তা সবার মাঝে ছড়িয়ে দিয়ে থাকেন। এছাড়া ঝুঁকি বিবেচনা করে আপদ বিশ্লেষণের মাধ্যমে দুর্যোগ প্রতিরোধ, প্রশমন, অভিযোজনসহ যাবতীয় প্রস্তুতি গ্রহণে সহায়তা করে থাকেন। দ্বিতীয়ত হলো জরুরি অবস্থায় সাড়া দেয়া, যেখানে সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে স্বেচ্ছাসেবীসহ স্থানীয় নেতাদের। সতর্কসংকেত, পূর্ব সতর্কতা, স্থানান্তর, অনুসন্ধান, উদ্ধার, চাহিদা ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ, জরুরি ত্রাণ ও চিকিৎসাসেবা সরবরাহ এবং জরুরি পুনর্বাসনসহ নানা কর্মকাণ্ডে তাদের রয়েছে বিশেষ অবদান। স্বেচ্ছাসেবীরা মাইকিং, লিফলেট বিতরণসহ নানাভাবে সবাইকে এ বিষয়ে অবহিত করে থাকেন। এছাড়া স্থানীয় নেতারা বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে এ বিষয়ে সবাইকে করণীয় সম্পর্কে অবহিত করে থাকেন। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের ১, ১১ ও ১৩, অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০২১-২৫) এবং ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০-এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনে ১৭ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা ব্যয়ে সরকার ১২টি প্রকল্প এবং বিভিন্ন ত্রাণ ও সামাজিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনায় ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা থেকে মানুষের জানমাল রক্ষায় মাটির কিল্লা নির্মাণ করা হয়, যা সর্বসাধারণের কাছে মুজিব কিল্লা নামে পরিচিত। তারই আধুনিক রূপে উপকূলীয় ও বন্যা উপদ্রুত ১৪৮টি উপজেলায় ৫৫০টি মুজিব কিল্লা নির্মাণ, সংস্কার ও উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান। জীবন ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে দুর্যোগের পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহণ, আসন্ন দুর্যোগের কবল থেকে নিরাপদ আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় গ্রহণের জন্য বেতার, টেলিভিশন এবং স্থানীয়ভাবে দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় মাইকিংয়ের মাধ্যমে প্রচারণার পাশাপাশি দ্রুত ও অধিকতর কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে ইন্টারেক্টিভ ভয়েস রেসপন্স চালু করা হয়েছে। মোবাইল ফোনের মাধ্যমেও দুর্যোগের আগাম বার্তা পেয়ে জনগণ পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে। এ বার্তাকে আরো অধিকতর জনবান্ধব করার লক্ষ্যে কমিউনিটি রেডিওর মাধ্যমে স্থানীয় ভাষায় বার্তা প্রচারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

নিকট অতীতে যখন মহামারী করোনাভাইরাস পুরো বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও ছড়িয়ে পড়েছিল, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন যখন চরমভাবে ব্যাহত তখন স্বেচ্ছাসেবকরা দায়িত্ব নিয়ে অংশ নেন নানা সামাজিক কাজে। বিভিন্ন বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ফান্ড রেইজিংয়ের মাধ্যমে দুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ান, খাদ্যসহ পৌঁছে নানা সামগ্রী। করোনায় কাজ হারানো দুস্থ-অসহায় পরিবারের আলোকবর্তিকা হয়ে জীবনবাজি রেখে কাজ করে গেছেন দেশের স্বেচ্ছাসেবকরা। এমনকি করোনায় আক্রান্ত মৃত মানুষের দাফন সম্পন্ন করার মতো মানবিক কাজে তারা ছিলেন অগ্রগামী। করোনার টিকা প্রদান কার্যক্রমেও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলেন স্বেচ্ছাসেবকরা। তারা অনেক ক্ষেত্রেই কাজ করেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, যেখানে মানবকল্যাণই একমাত্র মুখ্য বিষয়।

উন্নত ও বড় দেশগুলো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে বিশ্বের বায়ুমণ্ডল উত্তপ্ত করে তুলছে। গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণের ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ুর ওপর আঘাত হানছে। যার ভোগান্তি পোহাচ্ছে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার কম উন্নত দেশগুলো। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়ে চলেছে। দুর্যোগের সময় অনেকেই জীবন বাঁচাতে নিকটস্থ আশ্রয় কেন্দ্রে ছুটে যান ঠিকই, কিন্তু দুর্যোগ মোকাবেলা ও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে কী করতে হবে সে সম্পর্কে অনেকের জানা নেই। প্রান্তিক মানুষকে সহজভাবে তাদের মতো করে জলবায়ু পরিবর্তন ও করণীয় কাজ সম্পর্কে ধারণা দিতেই গ্রাম ও হাওরের বিভিন্ন অঞ্চলেও কাজ করে চলেছেন অনেক স্বেচ্ছাসেবী তরুণ-তরুণী। প্রাকৃতিক দুর্যোগকবলিত অঞ্চলে অন্যান্য জায়গার তুলনায় খাদ্য ঘাটতি থাকে বেশি, নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা বেশি পরিমাণে ব্যাহত হয়। এসব সমস্যার সমাধানেও স্বেচ্ছাসেবীরা কাজ করে থাকেন। বন্যায় যখন এলাকার পর এলাকা প্লাবিত, মানবতার ফেরিওয়ালা হয়ে স্বেচ্ছাসেবীরা তখন ত্রাণ হাতে পৌঁছে যান মানুষের দুয়ারে। 

দুর্যোগ মোকাবেলায় স্বেচ্ছাসেবকরা হয়ে উঠতে পারেন সরকারের কার্যকরী সহযোগী। এজন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও তাদের কাজের সঠিক মূল্যায়ন। স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ প্রদান এবং সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। তাদের নির্দিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া অত্যন্ত প্রয়োজন যাতে তারা তাদের কাজে দক্ষ হতে পারেন। অনেক ক্ষেত্রেই কাজ করতে গিয়ে তারা নানা সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হন। এক্ষেত্রে দুর্যোগ মোকাবেলার উপযোগী উপকরণ ও সরঞ্জাম তাদের জন্য সহযোগী হিসেবে কাজ করে। এসব ব্যবহারের জন্যও যথাযথ নির্দেশনা ও প্রশিক্ষণ দেয়া জরুরি। স্বেচ্ছাসেবকদের গৃহীত প্রতিটি উদ্যোগে অনুপ্রেরণা দেয়া তাদের আরো উৎসাহী করে তোলে। দুর্যোগ মোকাবেলায় দীর্ঘমেয়াদে সুফল পেতে সরকারের সঙ্গে স্থানীয় নেতৃত্ব, স্বেচ্ছাসেবক ও অন্যান্য অংশীদারদের সমন্বয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 

আমাদের দেশে অধিকাংশ অভিভাবক সহশিক্ষা কার্যক্রমকে সমর্থন করেন না পড়ালেখার ক্ষতির আশঙ্কায়। তবে এমন অহেতুক ধারণা ভাঙা জরুরি। প্রকৃতি সৃষ্ট এসব সংকটে তরুণ-তরুণীরা পালন করতে পারে কার্যকরী ভূমিকা। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠান থেকে সামাজিক উন্নয়নকাজে বিশেষ অবদান রাখার জন্য স্বেচ্ছাসেবকদের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়ে থাকে, এতে তারা আরও উৎসাহী হন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় স্বেচ্ছাসেবকদের মূল্যায়ন বাড়ানোর দিকে মনোযোগী হওয়া উচিত। এতে একদিকে যেমন ভালো কাজের স্বীকৃতি মিলবে, আরেক দিকে অন্যরাও এতে উৎসাহী হবে। স্বেচ্ছাসেবা কেবল ইচ্ছা কিংবা অনিচ্ছার বিষয় নয় বরং এটি একটি দায়িত্ব, দেশের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা। ভবিষ্যতে নানা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার কর্মকাণ্ডে স্বেচ্ছাসেবকরা পালন করতে পারেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। এটি যেমন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ, পাশাপাশি দেশসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার সঠিক মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।


মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন: জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ‘ওয়ান কান্ট্রি ওয়ান প্রায়োরিটি প্রডাক্ট কাঁঠাল’-এর সহকারী গবেষক

প্রফেসর ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম: কৃষি ব্যবসা ও বিপণন বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ