ইসলামে মুদারাবা হলো এমন ধরনের ব্যবসা পদ্ধতি, যেখানে
একপক্ষ পুঁজি সরবরাহ করে আর অন্য পক্ষ
ব্যবসা পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে। লাভ হলে উভয় পক্ষ পূর্বনির্ধারিত হার অনুযায়ী ভাগাভাগি
করে নেয় আর লোকসান হলে পুঁজিদাতা তার পুরোটাই বহন করে। আমাদের রাসুল
মুহম্মদ (সাঃ) বিবাহের আগে বিবি
খাদিজার
(রাঃ) সঙ্গে এ
পদ্ধতিতে ব্যবসায় নিয়োজিত ছিলেন। আধুনিক যুগে ইসলামিক ব্যাংক এবং ইসলামিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো
ডিপোজিট সংগ্রহের জন্য মুদারাবা পদ্ধতি অনুসরণ করে থাকে এবং গ্রাহকদের সঙ্গে
মুনাফা ভাগাভাগি করে থাকে।
বাংলাদেশের অধিকাংশ ইসলামিক ব্যাংক মুদারাবাকেন্দ্রিক
ডিপোজিট গ্রাহকদেরকে মুনাফা প্রদানের জন্য বার্ষিক ভিত্তিতে হিসাবায়ন পদ্ধতি অনুসরণ
করে আসছে। এ পদ্ধতিতে যেহেতু বছর সমাপ্তির পর হিসাবায়ন চূড়ান্ত করা হয়ে থাকে তাই অন্তর্বর্তী
সময়ে ব্যাংকগুলো গ্রাহকদেরকে প্রথমে জমাকৃত আসলের
ওপর
শতকরা হারে একটি সাময়িক বা প্রভিশনাল মুনাফা দিয়ে দেয়া হয় এবং সেক্ষেত্রে হিসাবায়ন
চূড়ান্ত হলে অর্জিত প্রকৃত মুনাফার সঙ্গে সাময়িক
হারের সমন্বয় করতে হয়। অর্থাৎ প্রদত্ত সাময়িক হার কম হলে বাকিটা দিয়ে দিতে হয়, আর সাময়িক
হার বেশি হলে অতিরিক্ত প্রদত্ত টাকা ফেরত নিয়ে সমন্বয় করতে হয়। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে
অনুশীলনের সময় ব্যাংকগুলো বিভিন্ন
ধরনের পদ্ধতি অবলম্বন করে, যার অধিকাংশই শরিয়াহর পরিপালনের দৃষ্টিতে প্রশ্নবোধক
হয়ে থাকে। এর মধ্যে প্রধান ১০টি সমস্যা নিম্নরূপ:
১. হিসাব খোলার ফরমের চুক্তিপত্রে শুধু সব
মুদারাবা গ্রাহকের জন্য একটি একক প্রফিট শেয়ারিং রেশিও
বা পিএসআর উল্লেখ করা থাকে। অ্যাকাউন্টের প্রকৃতি অনুযায়ী গ্রাহক পর্যায়ে কী হারে
বা কীভাবে মুনাফা বণ্টন করা হবে তা উল্লেখ করা থাকে না। ফলে গ্রাহকের
কাছে মুনাফা ভাগাভাগির প্রকৃত পদ্ধতি ও পরিমাণ অজ্ঞাত থাকে।
২. গ্রাহকের কাছে একটি সাময়িক বা সম্ভাব্য মুনাফার হার
ঘোষণা করা হয়ে থাকে। ফলে গ্রাহকরা সুদের হারের সঙ্গে কোনো
পার্থক্য খুঁজে পায় না। কেননা সাময়িক হার জমাকৃত মূল টাকার ওপর
শতকরা হারে হয়ে থাকে।
৩. অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাময়িক হার পরবর্তী সময়ে
বা মেয়াদ শেষে ফাইনাল হয়ে যায়, অর্থাৎ প্রভিশনাল বলা
হলেও সেটাই ফিক্সড রেট হয়ে যায়, অর্থাৎ পরবর্তীতে আর সমন্বয় করা হয় না।
৪. যে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নগদ অর্থের চাহিদা
যত বেশি তার সাময়িক মুনাফার হার তত বেশি থাকে, যার সঙ্গে তার
ব্যবসা ও প্রকৃত আয়ের কোনো সামঞ্জস্য থাকে না।
৫. একই ডিপোজিট প্রডাক্টের বিপরীতে ভিন্ন ভিন্ন গ্রাহককে
ভিন্ন ভিন্ন সাময়িক হার অফার করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাময়িক হার বাড়ানোর জন্য নেগোসিয়েশনের
সুযোগ থাকে। ফলে একই ধরনের হিসাব খুলে দুজন গ্রাহক দুই ধরনের নির্ধারিত অংকের মুনাফা
অর্জন করেন।
৬. বছর শেষে অর্জনকৃত প্রকৃত মুনাফা সাময়িক হারের চেয়ে
বেশি হলে গ্রাহককে পুনঃপ্রফিট প্রদান করা হয় না। যেহেতু সেটাই ফাইনাল হিসেবে উল্লেখ
করে গ্রাহককে বিদায় করা হয়ে থাকে।
৭. বছর শেষে অর্জিত প্রকৃত হার পরিশোধিত সাময়িক হারের
চেয়ে কম হলে তা ফেরত না নিয়ে হিবা (দান) করা হয় বা ইহসান (অনুগ্রহ) করা হয়েছে বলে উল্লেখ
করা হয়। উচ্চমাত্রায় ধার্যকৃত সাময়িক হারের কারণে নিয়মিত প্রতি বছর হিবা বা ইহসান
করা হয়, অথচ পরবর্তী বছরে সাময়িক হার
কমিয়ে পুনর্নির্ধারণ
করা হয় না।
৮. যেহেতু পূর্ববর্তী বছরের অর্জিত প্রকৃত হার ও হিবাকৃত
অংকের সমন্বয়ে সাময়িক হার নির্ধারণ করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে সাময়িক
হার চূড়ান্ত হারে পরিণত হয় সেহেতু প্রদত্ত মুনাফাটি সুদের সংজ্ঞার আওতায় চলে আসে।
৯. বছর শেষে প্রকৃত আয়ের হার কত হয়েছে তা গ্রাহকের কাছে
প্রকাশ করা হয় না। ব্যাংকের অর্জিত প্রকৃত মুনাফা এবং গ্রাহকের প্রাপ্য চূড়ান্ত হার
কত হয়েছিল তা অজ্ঞাত থকে। ব্যাংকগুলোর ওয়েবসাইট তল্লাশি করলে মুদারাবা ডিপোজিটের বিপরীতে
পূর্ববর্তী বছরগুলোর
প্রকৃত মুনাফার হারের কোনো হিস্ট্রিক্যাল ডাটা পাওয়া যায় না।
১০ সংজ্ঞা অনুযায়ী মুদারাবা ব্যবসা থেকে প্রাপ্ত মুনাফা
ব্যাংক ও গ্রাহকের মধ্যে ভাগাভাগি করা হবে। ফলে প্রাপ্ত মুনাফার পরিমাণ সর্বাবস্থায়
ব্যবসায়িক হিসাবের আউটপুট হওয়ার কথা। অথচ সাময়িক হার মুদারাবা গ্রাহককে মুনাফা প্রদানের
ক্ষেত্রে এক ধরনের ইনপুট হিসেবে কাজ করে, যা মুদারাবার মূল চেতনাকে ধ্বংস করে ফেলে।
চলমান সাময়িক হার পদ্ধতির বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর
প্রত্যেকটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যাংকের ক্ষেত্রে নয়, বরং একেক প্রতিষ্ঠানে একেক ধরনের
সমস্যা বিদ্যমান। মোটাদাগে এ অভিযোগগুলো দুই
ধরনের। এক হলো অনুশীলনের ত্রুটি, দুই হলো শরিয়াহ পরিপালনের ত্রুটি। অনুশীলনের
ক্ষেত্রে উত্থাপিত অভিযোগগুলোও একেক ব্যাংকের পরিপ্রেক্ষিতে একেক ধরনের। প্রধান অভিযোগ
হলো,
কোনো কোনো ব্যাংক কর্তৃক মুনাফার সাময়িক হারের অপপ্রয়োগ করা, যার ফলে সুদি
সিস্টেমের সঙ্গে ইসলামিক
ব্যাংকিংয়ের মৌলিক পার্থক্য ফুটে ওঠে না।
এগুলো সংশোধনের লক্ষ্যে সব
ব্যাংকের জন্য অনুসরণীয় একটি অভিন্ন গাইডলাইন থাকা দরকার।
শরিয়াহ-সংক্রান্ত
ত্রুটিগুলোর
ক্ষেত্রে ন্যায় ও সমতার ভিত্তিতে সমাধানে উপনীত হওয়া প্রয়োজন। অসমাধানযোগ্য ত্রুটির
ক্ষেত্রে তা পরিহার করে বিকল্প পদ্ধতি অনুসরণ করানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রেও
একটি অভিন্ন গাইডলাইন তৈরি হতে পারে।
মুনাফা বণ্টনের ক্ষেত্রে সাময়িক হার পদ্ধতির প্রয়োগ বাংলাদেশ
ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একই রকমের নয়। এতে অনেক পার্থক্য রয়েছে। যেমন বহির্বিশ্বের
অনেক দেশের ইসলামিক ব্যাংকে ‘এক্সপেক্টেড প্রফিট রেট’ থাকলেও প্রত্যেক মাসে মুনাফার
হার চূড়ান্ত করা হয় এবং নির্ধারিত ওয়েটের মাধ্যমে প্রাপ্ত প্রকৃত হারের সঙ্গে
মাসিকভাবে সমন্বয় করা হয়। অনেক দেশে মুদারাবার মুনাফা
বিতরণে সাময়িক হার প্রয়োগ করার সুযোগই রাখা হয়নি। আর এ দেশের অনেক ইসলামিক ব্যাংকে
সাময়িক হারই বিপণনের প্রধান অস্ত্র। যদিও বাংলাদেশের বর্তমান ইসলামিক ব্যাংকিং নীতিমালা
(২০০৯) অনুযায়ী মুনাফা বণ্টন পদ্ধতির বিবরণে কোনো ধরনের সম্ভাব্য বা প্রত্যাশিত অথবা
সাময়িক হার ঘোষণা করার নির্দেশনা নেই।
প্রকৃতপক্ষে, মুনাফা ভাগাভাগির ক্ষেত্রে এ সাময়িক হারের
কোনো দূরতম সংযোগও নেই। সংযোগ হয় সব হিসাবায়ন
শেষ হওয়ার পর মুনাফা সমন্বয় করার ক্ষেত্রে। তাই ডিপোজিট প্রডাক্ট অনুযায়ী ব্যাংকগুলো
সাময়িক বা প্রভিশনাল হার কীভাবে নির্ধারণ করবে সে সম্পর্কে
নির্দেশনা তৈরি করা দরকার। পরবর্তী সময়ে কীভাবে
আসল হারের সঙ্গে সাময়িক হারের সমন্বয় সাধন করা
হবে সে বিষয়ের সুনির্দিষ্ট বিবরণ থাকতে হবে। যে ব্যাংক নিয়মিত প্রতি বছর হিবা বা ইহসান
করে প্রকারান্তরে সে ব্যাংক সাময়িক হারটিকে গ্রাহকের জন্য গ্যারান্টেড লাভ হিসেবে
নিশ্চিত করে, ফলশ্রুতিতে সাময়িক হারটি প্রকারান্তরে সুদের হারে পরিণত হয়। তাই একটি
ব্যাংক অতিরিক্ত পরিশোধিত মুনাফা একাধারে কত বছর হিবা করতে থাকবে, অর্থাৎ প্রভিশনাল
হার কমিয়ে পুনর্নির্ধারণ
করবে না সে বিষয়েও নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন।
ইসলামিক ব্যাংকগুলোয় আরো
এক বিস্ময়কর ঘটনা রয়েছে আন্তঃব্যাংক প্লেসমেন্ট লেনদেনের
ক্ষেত্রে। নিজেদের তারল্য উদ্বৃত্ত ও ঘাটতি সমস্যার সমাধানের জন্য দ্বিপক্ষীয়
এ ব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণটাই কথিত প্রভিশনাল হারের ভিত্তিতে
বছরের পর বছর ধরে চলমান রয়েছে, যাতে পরবর্তী সময়ে
আর কোনো
ধরনের অ্যাডজাস্টমেন্ট
করা হয় না। এ মুনাফার সঙ্গে ব্যাংকের
প্রকৃত ব্যবসায়ের কোনো সংযোগ নেই। সুদের মতো পূর্বনির্ধারিত প্রভিশনাল হারই মেয়াদ শেষে
চূড়ান্ত বলে ধরে নেয়া হচ্ছে!
এত অভিযোগের মধ্যেও অতীতের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যে
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ তার গ্রাহকের জন্য নির্ধারিত সাময়িক হার প্রতি বছরই প্রকৃত
হারের চেয়ে কম করে ধার্য করে থাকে। এবং প্রতি বছরের হিসাবায়ন চূড়ান্ত হলে মুনাফা সমন্বয়
করার জন্য অতিরিক্ত প্রাপ্য অংশ গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে ক্রেডিট করে থাকে। আশাব্যঞ্জক
খবর হলো,
সময়ের ব্যবধানে বর্তমানে আরো কিছু
ব্যাংক এ ব্যাপারে সতর্ক হয়ে রেট অ্যাডজাস্টমেন্ট শুরু করেছে।
আগেকার দিনগুলোয় বা
অতীতকালে হিসাব-নিকাশ করা অনেক জটিল বিষয় ছিল। সব কিছু
ম্যানুয়ালি করতে হতো।
তখন ব্যাংকগুলো বছরে দুবার ষাণ্মাসিক
ভিত্তিতে হিসাবায়ন করত। আর বছরের শেষে লাভ-ক্ষতির হিসাব চূড়ান্ত করত। যুগের পরিবর্তনের
ফলে কম্পিউটারায়ন ও ডিজিটালাইজেশনের সুফল ভোগ করে এখন দেশের সব
কনভেনশনাল ও ইসলামিক ব্যাংক অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের জন্য
লাভ-লোকসানের হিসাব মাসিক ভিত্তিতে সম্পন্ন করছে। রেগুলেটরি বাধ্যবাধকতার জন্য ত্রৈমাসিক
ভিত্তিতে তা প্রকাশও করছে। এমনকি চাইলে এ হিসাব দৈনিক ভিত্তিতেও করা সম্ভব। কিন্তু
এখনো কিছু কিছু ইসলামিক ব্যাংক মুদারাবা
গ্রাহককে চূড়ান্ত মুনাফা প্রদানের জন্য হিসাব বছর শেষ হয়ে যাওয়ার পর আরো
কয়েক মাস অপেক্ষমাণ রাখবে
এটা যুক্তিযুক্ত মনে হয় না। এজন্য সব ব্যাংক
ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে মাসিকভিত্তিতে মুদারাবা গ্রাহকের মুনাফার হিসাবায়ন চূড়ান্ত করতে
বাধ্য করা যেতে পারে।
উল্লিখিত বিষয় ও সমস্যাগুলো সমাধানের
লক্ষ্যে বিস্তারিত নীতিমালা তৈরি ও তার প্রয়োগ নিশ্চিত করা হলে বাংলাদেশের ইসলামিক
ব্যাংকিং ব্যবস্থার দায়-খাত (লায়াবিলিটি সাইড) কঠোরভাবে শরিয়াহ
পরিপালনের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হবে। এজন্য প্র্যাকটিশনার,
রেগুলেটর এবং শরিয়াহ
স্কলার ও এক্সপার্টদের একত্রে
ও একযোগে কাজ করতে হবে। গ্রাহকদেরও মুনাফা প্রাপ্তির হিসাব-নিকাশে সচেতন হওয়া ও সঠিকভাবে
মুনাফা বুঝে নেয়া জরুরি।
মুহম্মদ মুনীরুল হক: ইসলামিক ব্যাংকার ও সার্টিফায়েড
শরিয়াহ
অ্যাডভাইজর
অ্যান্ড অডিটর, অ্যাওফি, বাহরাইন।










