নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতার দরুন স্বল্প আয়ের মানুষ কষ্টে দিনাতিপাত করছে। মাছ, মাংসের পর এবার ডিমের দামও বেড়ে গেছে। প্রতি ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৬০-১৭০ টাকায়। বাজারসংশ্লিষ্টদের ধারণা, মাছের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে ডিমের দাম বেড়েছে। এক্ষেত্রে বন্যা, পোলট্রি খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধির কথা বলা হলেও সিন্ডিকেটের বিষয়টিও সামনে উঠে আসছে। বিশেষ করে গরিবের আমিষ বলে খ্যাত ডিমের বাজারেও করপোরেট জগৎ হানা দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে। এক্ষেত্রে লোকসানের মুখোমুখি হচ্ছেন প্রান্তিক খামারিরা। সব মিলিয়ে খাদ্যদ্রব্যের বাজারে যে বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে তাতে প্রশাসনের পদক্ষেপের আশায় তাকিয়ে রয়েছেন নির্দিষ্ট আয়ের ভোক্তারা।

বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ডিমের দাম এখন ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। বাজারে এক ডজন ফার্মের মুরগির ডিমের দাম সর্বোচ্চ ১৭০ টাকায় পৌঁছেছে। দেশী মুরগির ডিম কোথাও কোথাও ডজনপ্রতি ২২০ টাকায়ও বিক্রি হচ্ছে। ডিমের আকাশছোঁয়া দামের ক্ষেত্রে মাছের মূল্যবৃদ্ধি বড় ভূমিকা রেখেছে বলে বাজারসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। মূলত মাছের দাম বাড়ায় আমিষের চাহিদা পূরণের জন্য বিকল্প পণ্য হিসেবে জনসাধারণের মধ্যে ডিমের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। চাহিদা বাড়লেও বিগত মাসগুলোর প্রতিবেশগত দুর্যোগের কারণে বাজারে ডিমের সরবরাহ বাড়েনি। এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে পোলট্রি খামারগুলোয় হিটস্ট্রোকে অনেক মুরগি মারা যায়। আবার সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে বন্যার কারণেও ডিম ও মুরগির সরবরাহে সংকট দেখা দিয়েছে।

এর ফলে ডিমের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। এদিকে নিকটতম সময়ে মাছের মূল্যবৃদ্ধিকে বাজারে ডিমের দাম বাড়ার বড় অনুঘটক হিসেবে দেখছেন বাজার পর্যবেক্ষকরা। আমিষের চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে মাছ, ডিম ও মুরগি একে অন্যের বিকল্প পণ্য হিসেবে কাজ করে। অতীতেও দেখা গেছে, এর কোনো একটির দাম বাড়লে অন্যগুলোর দামেও প্রভাব পড়ে। গত কয়েক মাসে শুধু রুই ও কাতলা মাছের দাম বেড়েছে ৩০-৪০ শতাংশ। আবার দরিদ্রের সুলভ আমিষের উৎস হিসেবে পরিচিত তেলাপিয়া ও পাঙাশের দামও এখন নাগালের বাইরে। এতে ভোক্তারা এখন মাছের পরিবর্তে ডিম ও মুরগিতে ঝুঁকে পড়ছেন। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ডিম-মুরগির দামও বাড়তির দিকে। এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগে সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটার বিষয়টি ডিমের দামের ঊর্ধ্বমুখিতা আরো জোরালো করে তুলেছে। এর আগে গত বছরের আগস্টেও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সরবরাহ সংকটের অজুহাত দেখিয়ে মুরগি ও ডিমের দাম বেড়ে যায়। তখন তেলাপিয়া ও পাঙাশের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় সপ্তাহের ব্যবধানে তেলাপিয়া ও পাঙাশের কেজি ৫০-৬০ টাকা বেড়ে যেতে দেখা গেছে। ডিম, মুরগি ও তেলাপিয়া-পাঙাশ এ তিন প্রোটিনের উৎস থেকে স্বল্প আয়ের মানুষ তাদের আমিষের চাহিদা পূরণ করে। এগুলো একটি আরেকটির পরিপূরক। ফলে মাছ ও মাংসের দাম বেড়ে গেলে ডিমের চাহিদাও বেড়ে যাবে। বাজারের গতিবিধি বিশ্লেষণ করে এমন চিত্রই দেখা গেছে।

ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করছেন, বেশি দামে কেনার কারণেই বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। তবে সরবরাহের ঘাটতিকেই মূল্যবৃদ্ধির জন্য দায়ী করা হয়। অন্যদিকে মুরগি উৎপাদন করতে একজন খামারির ১৬৫-১৭০ টাকা ব্যয় হয়ে থাকে। কিন্তু বিক্রি করতে হয় ১৩০-১৪০ টাকা। এভাবে লোকসান দেয়ায় অনেক খামারি মুরগির খামার বন্ধ করে দিয়েছেন। এদিকে বন্যার কারণে আরো অনেক খামার বন্ধ হয়ে যাবে। তাই সামনে মুরগি ও ডিমের দাম আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এদিকে করপোরেট কোম্পানিগুলোর কাছে খামারিরা জিম্মি হয়ে আছেন—এ অভিযোগ আবারো উঠেছে। বৈশ্বিকভাবে পোলট্রি খাদ্য উপকরণের দাম কমলেও কোম্পানিগুলো দাম কমাচ্ছে না এমন অভিযোগও রয়েছে। এক্ষেত্রে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। কেননা গত বছর ডিম ও মুরগির বাজারে অস্থিরতা নিয়ে মামলা হয়েছে। এ-সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কাছে থাকলেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।

সব মিলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নিম্ন আয়ের মানুষ। তারা পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার ক্রয় করতে পারছে না। ফলে যে আবহ তৈরি হবে, তা সামাজিক অস্থিরতার কারণও হতে পারে। তাই সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয় পুষ্টির চাহিদা মেটানোর জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। এজন্য জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে যে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে তাতে যেন সার্বিক সমাধান উঠে আসে সেটিই কাম্য। কারণ অভিযানের মাধ্যমে বাজারে স্থিতিশীলতা আনার চেষ্টা করা হলেও মূল কুশীলবরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাওয়ায় কাঙ্ক্ষিত সমাধান মেলে না। তাই ডিমের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য দায়ী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন। কারণ এক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান না করায় বারবার ডিমের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে যাচ্ছে। আমরা আশা করব, সাধারণ মানুষের পুষ্টির চাহিদা ও প্রান্তিক খামারিদের কথা ভেবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযুক্তদের ক্ষেত্রে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।