কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সংঘাত এবং কারফিউর কারণে পর্যটকশূন্য হয়ে পড়েছে দেশের প্রধান পর্যটন স্থানগুলো। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে কক্সবাজার, পটুয়াখালী, সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রামসহ অন্যান্য পর্যটন কেন্দ্র। পর্যটক না থাকায় পর্যটননির্ভর ব্যবসা-বাণিজ্যেও নেমেছে ধস। খালি পড়ে রয়েছে হোটেল-মোটেল। বিক্রি নেই দোকান ও রেস্তোরাঁগুলোয়। এছাড়া ভ্রাম্যমাণ দোকানপাটগুলোও বন্ধ হয়ে পড়েছে। ব্যবসা না থাকায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনও পরিশোধ করতে পারছেন না অনেকেই। দেশের যেকোনো দুর্যোগে সবার আগে প্রভাব পড়ে পর্যটন খাতে। আর স্বাভাবিক অবস্থা ফেরে সবার পরে। দীর্ঘদিন ধরে পর্যটক শূন্য থাকায় ব্যবসায়ীরা যে আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন তা নিরূপণ করা কঠিন। এ খাতের উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের টিকিয়ে রাখতে হলে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কারফিউ প্রত্যাহার করে সড়ক ও রেলপথে যোগাযোগ স্বাভাবিক করার বিকল্প নেই।

কোটা সংস্কারের দাবিতে টানা আন্দোলন শুরু হয় ১ জুলাই থেকে। ১৫ জুলাই সংঘর্ষ শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এরপর এটা ছড়িয়ে পড়ে ক্যাম্পাসের বাইরে। ১৯ জুলাই মধ্যরাত থেকে দেশে কারফিউ জারি করা হয়। কারফিউ এখনো চলছে দিনে কয়েক ঘণ্টা শিথিল রেখে। আর ১৮ জুলাই বৃহস্পতিবার বিকাল থেকে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেয়া হয়। এর ফলে দেশে কার্যত রেল ও সড়কপথে এবং ভার্চুয়াল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এখনো দেশে গণপরিবহন চলাচল স্বাভাবিক হয়নি, বন্ধ রয়েছে ট্রেন চলাচলও। এ কারণে মানুষ বেড়াতে বের না হওয়ায় বিশেষ ছাড় দিয়েও পর্যটককে আকৃষ্ট করা যাচ্ছে না। আর ইন্টারনেট সেবা বন্ধ থাকায় বিদেশী পর্যটকদের ভ্রমণ বাতিলের বিষয়ে আলোচনা করা সম্ভব হয়নি। আগে থেকে যেসব বুকিং করা ছিল সেসব ট্রিপ বাতিল করা হয়েছে। নতুন করেও কেউ ট্রিপ বুকিং করছেন না।

দেশের এ পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ ও বিদেশী পর্যটকরা ভ্রমণে আগ্রহ হারাচ্ছেন। ফলে দেশের পর্যটন স্থানগুলো পর্যটকশূন্য হয়ে পড়ায় লোকসানে পড়েছেন ট্রাভেল এজেন্সি, হোটেল-মোটেল রেস্তোরাঁসহ সংশ্লিষ্ট শতাধিক খাতের উদ্যোক্তারা। 

পর্যটন খাত বরাবরই ধাক্কা খাচ্ছে। হোলি আর্টিজানের ঘটনা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং জ্বালাও-পোড়াও পর্যটন খাতে বিপর্যয় নিয়ে আসে। এসব কাটিয়ে হয়তো পর্যটন খাত স্বাভাবিক হবে সেই আশা ছিল অনেকের। কিন্তু এরপর শুরু হলো কভিড-১৯ মহামারী। এর প্রভাবে টানা দুই বছর পর্যটন খাতে মন্দা ছিল। এর মধ্যে কভিড সংক্রমণের প্রথম বছর কার্যত বন্ধ ছিল পর্যটন। গত দুই বছরে কভিডের ক্ষতি অনেকটা কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন এ খাতসংশ্লিষ্টরা। কভিড মহামারীর ধাক্কা মোটামুটি কাটিয়ে ওঠার পর চলমান পরিস্থিতি এ খাতে আবারো অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। অথচ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এ খাতের ভূমিকা অন্যতম। কেননা দেশের জিডিপিতে পর্যটন শিল্পের অবদান প্রায় ৪ শতাংশ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রায় ১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এ তথ্য দিয়েছেন চলতি বছরের জুলাইয়ে জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী। 

পর্যটন খাতে প্রায় ৪৮ লাখ মানুষ সরাসরি সম্পৃক্ত এবং প্রায় শতাধিক খাত জড়িত। কিন্তু দেশের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এ খাতের অনেকেই কর্মসংস্থান হারানোর শঙ্কায় রয়েছে। কেননা পর্যটকশূন্য হয়ে পড়ায় এ খাতের উদ্যোক্তাদের আয় নেই। ফলে অনেকেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দিতে পারছেন না। এ অবস্থা আরো দীর্ঘ হলে অনেকেই চাকরিচ্যুত হয়ে বেকার হয়ে পড়বেন। 

বাংলাদেশ পর্যটনে অনেক সম্ভাবনাময় একটি দেশ। এ দেশে রয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম স্যান্ডি সি বিচ কক্সবাজার, সুন্দরবন, ষাটগম্বুজ মসজিদ, পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার। যেগুলো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের অন্তর্ভুক্ত। নদীমাতৃক এ দেশে সাত শতাধিক নদী রয়েছে। ফলে বাংলাদেশে রিভার ট্যুরিজমের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে হাওরভিত্তিক পর্যটন এখন খুব বেশি উন্নতি লাভ করেছে। টাঙ্গুয়ার, হাকালুকি, মিঠামইনসহ অন্য হাওরগুলো রয়েছে। সিলেটের যে চা বাগান রয়েছে, তার যে আঁকাবাঁকা মেঠোপথ এবং টিলার ওপর সবুজের যে সমারোহ, সেটি পর্যটকদের অনেক বেশি আকৃষ্ট করে। এছাড়া পটুয়াখালীর কুয়াকাটা, চট্টগ্রামের তিনটি জেলা বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটিতে স্বাভাবিক সময়ে অভ্যন্তরীণ পর্যটকের পাশাপাশি বিদেশী পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে। এছাড়া পদ্মা সেতু বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ২১টি জেলার সঙ্গে ঢাকার একটি যোগসূত্র স্থাপন করে দিয়েছে। এ যোগসূত্র স্থাপন হওয়ার পর এখন পদ্মা সেতু দেখার পাশাপাশি বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ, কুয়াকাটা ও পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার এ গন্তব্যগুলোয় যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। অভ্যন্তরীণ পর্যটকরা এ গন্তব্যগুলোয় ঘুরতে যাচ্ছেন। পদ্মা সেতু বাংলাদেশের পর্যটনে যে সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে তা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে অর্থনৈতিক উন্নতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। 

দেশের পর্যটন খাতকে এগিয়ে নিতে বা পর্যটন শিল্পকে সমৃদ্ধ করতে হলে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য পর্যটন শিল্প কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু হয়েছে ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ। এছাড়া কিছু ট্রেনিং সেন্টার ও ইনস্টিটিউট রয়েছে, যেখানে ডিপ্লোমা আর সার্টিফিকেট কোর্সগুলো হচ্ছে। দেশের পাঁচ তারকা মানের হোটেল ও রিসোর্টে দেশের শিক্ষার্থীরা কাজ করছেন এবং ক্যারিয়ার গড়ে তুলছেন। 

যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক থাকলে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত হলে মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে বিভিন্ন গন্তব্যে ঘুরতে যায়। দেশের এ উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তা ব্যাহত হচ্ছে। ফলে অভ্যন্তরীণ পর্যটকের ভ্রমণ একেবারেই বন্ধ হয়ে পড়েছে। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে যত দ্রুত সম্ভব কারফিউ প্রত্যাহার করে রেল ও সড়কপথের যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল করা দরকার। তাহলেই পর্যটন খাত গতি ফিরে পাবে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাভাবিক হবে।