দেশে ভোগ্যপণ্যের বাজারে অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। চলতি বছর জানুয়ারির শুরুতে ও রমজানে দুই দফায় দাম বেড়েছে চালের। রমজানে দাম বাড়লেও ঈদের পর সাধারণত দাম কমে আসে। কিন্তু চালের দামের ঊর্ধ্বমুখিতা এখনো বজায় আছে। এমনকি ঈদের পর আবারো দাম বাড়ছে ভোগ্যপণ্যের। পাইকারি থেকে খুচরা বিক্রি—সব পর্যায়ে দাম বেড়েছে আলু, পেঁয়াজ, আটা, ময়দাসহ বিভিন্ন মসলাপণ্যের। বর্তমানে বাজারদরে যে অস্থিরতা চলমান, এর প্রভাবে চালের দামও পুনরায় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। চাল দেশের মানুষের অন্যতম প্রধান খাদ্যশস্য। চালের দাম সর্বস্তরের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকা উচিত। বাস্তবতা হলো, চালের সরকারি মজুদ যদি পর্যাপ্ত না থাকে তাহলে চালের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখা মুশকিল হয়ে পড়বে। কেননা অসাধু ব্যবসায়ী ও অবৈধ মজুদদার কর্তৃক অতিমুনাফা অর্জনের লোভে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে।

বণিক বার্তার প্রতিবেদন বলছে, চালের সরকারি মজুদ আট লাখ টনের ঘরে নেমে এসেছে। সরকারিভাবে চালের আমদানি না হওয়া, স্থানীয় বাজার থেকে লক্ষ্য অনুযায়ী সংগ্রহ করতে না পারা ও সরকারি বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় চালের বিতরণ বেড়ে যাওয়ায় মজুদ কমেছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জুলাই থেকে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত সরকারি গুদামগুলোয় খাদ্যশস্যটির মজুদ কমেছে ৫০ শতাংশেরও বেশি।

সরকারি মজুদ কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই ব্যবসায়ীরা সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করেন, দাম বাড়িয়ে দেন অতিমুনাফা অর্জনে। চালের দাম বাড়লে ক্ষতিকর প্রভাব নিম্নবিত্তের ওপর যেমন পড়ে, নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তরাও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, জাতীয় পর্যায়ে একটি পরিবারের মাসিক মোট খরচের ৫৪ দশমিক ৮১ শতাংশ হয় খাদ্যে। আবার মাসিক মোট ব্যয়ের ৩৫ দশমিক ৯৬ শতাংশ হয় চাল কেনায়। চালের মূল্যবৃদ্ধিতে তাদের ক্যালোরিযুক্ত খাবার গ্রহণের তালিকা ছোট হয়ে আসে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) তথ্যমতে, পণ্যের উচ্চ মূল্যের কারণে দেশের ১২ কোটি ৫২ লাখ মানুষ প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ করতে পারছে না। ধারণা করা যাচ্ছে, চালের দাম বাড়লে এ অবস্থার আরো অবনতি ঘটবে।

সরবরাহ ঘাটতি ও আমদানি না করায় চালের বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি বিশ্ববাজারে চালের দাম বাড়ার প্রভাবও পড়েছে। রমজানে চালের দাম কমাতে আমদানি শুল্ক ৬৭ থেকে ১৭ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। প্রাথমিকভাবে ৩০টি প্রতিষ্ঠানকে ৮৩ হাজার টন চাল আমদানির অনুমতি দিয়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। তাদের বড় অংশ যশোর, সিলেট ও চট্টগ্রামের। তবে বড় আমদানিকারকদের অনেকে এবার চাল আনছেন না। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) হিসাবে বিশ্ববাজারে চালের বাড়তি দামের কারণে গত এক বছরে বাংলাদেশে কোনো সেদ্ধ চাল আমদানি হয়নি। যেখানে ২০২১ ও ২০২২ সালে দেশে ৮ থেকে ১০ লাখ টন চাল আমদানি হয়েছিল। এফএওর চলতি মার্চে প্রকাশিত খাদ্যের দামবিষয়ক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের নভেম্বরের তুলনায় ১৩ শতাংশ বেশি দামে বিশ্ববাজারে চাল বিক্রি হচ্ছে। বিশ্বের বেশির ভাগ চাল রফতানিকারক দেশে চালের দাম টনপ্রতি ৫৬০-৬৭০ ডলার। আবার ভারত সুনির্দিষ্ট কিছু দেশ ছাড়া বিশ্ববাজারে চাল রফতানি বন্ধ রাখায় চালের দাম বেড়ে যাচ্ছে। 

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের (এফপিএমইউ) তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত সরকারিভাবে কোনো চাল আমদানি হয়নি। অথচ গত অর্থবছরে আমদানি হয়েছিল ১০ লাখ ৫৬ হাজার টন। এর আগে ২০২১-২২ অর্থবছরে মোট খাদ্যশস্য আমদানি হয় ৫০ লাখ টন। এর মধ্যে চাল ছিল ৯ লাখ ৮৮ হাজার টন। চলতি বছরে আমদানি না করায় সরকারি গুদামগুলোকে অভ্যন্তরীণ সংগ্রহের ওপরই পুরোপুরি নির্ভর করতে হচ্ছে। উপরন্তু বোরো মৌসুমের চাল এখনো বাজারে আসেনি আর গত আমন মৌসুমে অভ্যন্তরীণ সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি খাদ্য মন্ত্রণালয়। আবার নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সরকারিভাবে বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় খাদ্যশস্য বিতরণ হয়েছে অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। এসব কারণে একদিকে চালের সরবরাহ কম, আবার চালের সরকারি মজুদ কমেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ফলে বিভিন্ন সময়ে চালের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। গত এক মাসে এগুলোসহ প্রায় সব ধরনের চালের দাম বেড়েছে। চালের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে সরকারি মজুদ বাড়াতে হবে এবং মজুদ বাড়াতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।

কৃষি মন্ত্রণালয় ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের চালের উৎপাদন ও মজুদ হিসেবে প্রতি বছর এক ধরনের গরমিল দেখা দেয়। চালের বাজারদর স্থিতিশীল রাখতে হলে সবার আগে তথ্যের সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। উৎপাদন, ভোগ ও মজুদের সমন্বিত ও প্রকৃত তথ্য না থাকলে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব নয়। 

কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে চালের উৎপাদন চাহিদার চেয়ে কমপক্ষে ৫০ লাখ টন বেশি। ফলে আমদানির দরকার নেই। চাল উদ্বৃত্ত থাকার পরও দেশের বাজারে দফায় দফায় দাম বাড়ার কী কারণ সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েই যায়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিবিষয়ক সংস্থা ইউএসডিএর হিসাবে বাংলাদেশে চলতি বছর চাহিদার তুলনায় চালের উৎপাদন কিছুটা কম।

যদিও বর্তমান মজুদকে পর্যাপ্ত বলে মনে করছেন খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। চলতি বোরো মৌসুমের ধান-চাল সংগ্রহ শুরু হলে মজুদ আরো বাড়বে বলে তারা আশাবাদী। অবশ্য এরই মধ্যে নতুন ধানের চাল বাজারে আসায় গত এক সপ্তাহে প্রতি কেজিতে ৩-৪ টাকা দাম কমেছে মিনিকেট ও ব্রি২৮ জাতের চালের। এক সপ্তাহ আগে নওগাঁ মোকাম ও মিলগেটে মানভেদে প্রতি কেজি মিনিকেট চাল ৬৪-৬৫ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ৬০-৬২ টাকায়। এক সপ্তাহ আগে ৫৬ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়া ব্রি২৮ জাতের চাল এখন বিক্রি হচ্ছে ৫২ টাকা কেজি দরে। বণিক বার্তার প্রতিবেদনে জানা যায়, বোরো মৌসুমের ধান কাটা শেষ হলে চালের দাম কমবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রাও। 

সাধারণত আমন ও বোরো—এ দুই মৌসুমে সরকারিভাবে ধান-চাল সংগ্রহ করে খাদ্য মন্ত্রণালয়। কিছুদিনের মধ্যেই বোরো ধান বাজারে আসার কথা। সরকারিভাবে বোরো মৌসুমে ধান-চাল সংগ্রহ করা হলে বাজারে মজুদ বাড়ার পাশাপাশি চালের দাম কমবে বলে আশা করা যায়। বোরো মৌসুমে প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারিভাবে ধান-চাল সংগ্রহের মাধ্যমে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরুক—এটিই প্রত্যাশা।