শুধু হিট অ্যালার্ট নয়, এবারের তাপপ্রবাহ যেন সর্বব্যাপী চেহারা নিয়ে হাজির হয়েছে। প্রচণ্ড তাপে শহর পুড়ছে, পথচলতি মানুষের গায়ে আগুনঝরা বাতাসের ঝাপটা লাগছে। বৃষ্টিবিহীন ফসলের মাঠও যেন জ্বলে যাওয়ার উপক্রম। শুধু নগর নয়, গ্রাম থেকেও হিট স্ট্রোকে প্রতিদিনই মৃত্যুর খবর আসছে। রোদে বের হওয়া সাধারণ মানুষ অসহনীয় তাপে বিপন্ন বোধ করছে।
৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা অতিক্রম করলেই যেখানে
তাপপ্রবাহ শুরু বলে ধরে নেয়া হয়, এপ্রিলের শেষ ভাগজুড়ে এবার ৪২ ডিগ্রির অতি তীব্র তাপপ্রবাহ
সহ্য করা দেশের পশ্চিম ও উত্তরের কয়েকটি জেলাবাসীর নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নদী বা পুকুরের জল শুকিয়ে যাওয়ার উপক্রম। বরেন্দ্র
অঞ্চলসহ বিভিন্ন জায়গায় গরমে কাবু মানুষের পানির কষ্ট শুরু হয়েছে। খেটে খাওয়া মানুষ,
খোলা আকাশের নিচে নির্মাণ শ্রমিক বা কৃষিকাজে যুক্ত আছেন যারা, ধরণীও তাদের প্রতি নিষ্ঠুরতা
বাড়িয়ে দিয়েছে যেন। শুধু এপ্রিলের তাপপ্রবাহ নয়, বাংলাদেশে জুন পর্যন্ত তীব্র ভ্যাপসা
রকমের যে গরম পড়ে তা শুধু অস্বস্তিকরই নয় ক্ষতিকরও। গুরুতর প্রভাব পড়ে দেশের আনুষ্ঠানিক
উৎপাদন খাত শিল্প-কারখানার কার্যক্রমে।
অতি তীব্র তাপপ্রবাহে শরীর চক্র ঠিক থাকে না, ক্লান্তি-দুর্বলতা
ভর করে। চিন্তাশক্তিও ঠিকমতো কাজ করে না। বাসায় ও অফিসে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায়
যারা আছেন, সামগ্রিক জনগোষ্ঠী বিবেচনায় তারা দু-চারজনের বেশি নন। যদিও অধিকাংশের বাসায়
কিংবা অফিসে শীতাতপ ব্যবস্থা বসানো বিলাসিতা নয় এখন, বরং প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু
উচ্চ মূল্যস্ফীতির এ সময়ে ঘর শীতল করা বহু মধ্যবিত্ত লোকেরও সাধ্যের বাইরে। এছাড়া জীবাশ্ম
জ্বালানি পুড়িয়ে উৎপাদিত বিদ্যুতে শীতাতপের আয়োজন দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশের জন্যও ধ্বংসাত্মক।
২০২২ সালে এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ লেটারস জার্নালে
প্রকাশিত এক গবেষণা থেকে জানা গেছে, তীব্র গরমে প্রতি বছর বাংলাদেশে ৩ হাজার ২০০ কোটি
কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। উচ্চ আর্দ্র গরম আবহাওয়ায় যেসব দেশে শ্রম ও উৎপাদনশীলতা
কমছে, এমন শীর্ষ পাঁচ দেশের একটিতে নাম উঠেছে বাংলাদেশের। জলবায়ু পরিবর্তনের
ফলে তৈরি হওয়া এ গরমে যে ক্ষতি হয়, তার সরাসরি প্রভাব পড়ে জাতীয় উৎপাদন ও শ্রমজীবী
মানুষের দৈনিক রোজগারে।
গরমে অর্থনীতির ক্ষতি নিয়ে জাতীয় দৈনিকগুলোয় প্রায়ই
সংবাদ চোখে পড়ছে। খবরের কাগজগুলো জানাচ্ছে, এপ্রিলের তাপপ্রবাহে পোশাক খাত, স্টিল ও
সিমেন্ট খাতের মতো শ্রমনির্ভর উৎপাদন শিল্পে শ্রমিক উপস্থিতি ১০-১৫ শতাংশ কমে গেছে।
কারখানা মালিকদের পর্যবেক্ষণ, যারা কাজে আসছেন তাদের কর্মদক্ষতাও ৫০ শতাংশে নেমে গেছে।
(টিবিএস, ২২ এপ্রিল, ২০২৪)। কর্মদক্ষতা কমে যাওয়ার ফলে রফতানিনির্ভর শিল্পে যে ক্ষতি
হবে তা অর্থনীতিকে বড় চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতির মুখে ফেলতে পারে। ২০২৩ সালে স্রোডাজ ও
কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশ করা এক গবেষণায় আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়, কর্মক্ষেত্রে অতিরিক্ত
তাপমাত্রা এবং বন্যার ফলে বাংলাদেশের পোশাক খাতের রফতানিতে ২৬ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার
রফতানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ব্যবসার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরিতে বাংলাদেশ প্রতিযোগী
অনেক দেশের তুলনায় পিছিয়ে থাকলেও পরিবেশবান্ধব ও শ্রমিকের কাজের জন্য আরামদায়ক সবুজ
কারখানা নির্মাণে পুরো দুনিয়ায় সবচেয়ে এগিয়ে আছে। পরিবেশবান্ধব আন্তর্জাতিক সনদ লিড
স্বীকৃতি পাওয়া কারখানার সংখ্যা ২১৫টি। বলার অপেক্ষা রাখে না, শোভন কর্মপরিবেশ তৈরিতে
এ এক বিরাট সফলতা। নির্মাণ কৌশলের কারণে এসব কারখানায় শ্রমিকরা সহনীয় তাপমাত্রায় কাজ
করতে পারেন। কিন্তু রফতানিমুখী পোশাক কারখানার সংখ্যা ৪ হাজারের বেশি। অন্য খাতেও আছে
আরো কয়েক হাজার কারখানা। এসব কারখানায় তাপমাত্রাজনিত সমস্যা যে উদ্বেগজনক পর্যায়ে তা
শিল্পসংশ্লিষ্টরা পুরোপুরি স্বীকার না করলেও পরিস্থিতি বুঝতে বাকি থাকে না। ভ্যাপসা
গরম বা তাপপ্রবাহে কারখানায় শ্রমিকের অনুপস্থিতি, অসুস্থ হয়ে পড়া বহুদিন ধরেই নিয়মিত
ঘটনা।
দক্ষিণ এশিয়ার কারখানাগুলোয় শ্রমিকরা কারখানায় সর্বোচ্চ
কত তাপমাত্রা সহ্য করতে পারেন তা নিয়ে গবেষণা হয়েছে শ্রীলংকায়। বাতাসের আর্দ্রতাসহ
গরম আবহাওয়ার দেশ প্রতিবেশী ভারতের কয়েকটি প্রদেশের সঙ্গেও বাংলাদেশের মিল রয়েছে। ওই
গবেষণায় বলা হয়েছে, কারখানায় কর্মীরা সর্বোচ্চ ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা
বাইরের বায়ুপ্রবাহ ছাড়াই সহ্য করতে পারেন। এর বেশি তাপমাত্রা হলে বিশেষ ব্যবস্থায় ঠাণ্ডা
বাতাস প্রবাহের ব্যবস্থা করতে হয়। ব্যতিক্রম হলে শ্রমিকের স্বাস্থ্য ও উৎপাদনে নেতিবাচক
প্রভাব পড়া শুরু হয়। তাপ যত বাড়ে কর্মদক্ষতা তত কমতে থাকে।
বাংলাদেশের কারখানার তাপীয় পরিস্থিতি নিয়েও অনেক
গবেষণা হয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ২০১৯ সালের এক গবেষণার ফলাফলে জানিয়েছে,
বাংলাদেশের উৎপাদন খাত হিট স্ট্রেস ও তাপীয় অস্বস্তির কারণে যে ২ দশমিক ৫৯ শতাংশ কর্মঘণ্টা
হারাচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তা ২০৩০ সালে ৪ দশমিক ৯৬ পর্যন্ত বাড়বে।
আরেকটি গবেষণার বরাত দিতে চাই। পোশাক শিল্প-কারখানার
শ্রমিকদের মধ্যে অতিরিক্ত গরমের কারণে হিট স্ট্রেসের প্রভাব নিয়ে তিন বছর মেয়াদি একটি
গবেষণা প্রকল্প পরিচালনা করে অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথ ইউনিভার্সিটির ন্যাশনাল ক্লাইমেট
চেঞ্জ অ্যাডাপটেশন রিসার্চ ফ্যাসিলিটি (এনসিসিএআরএফ), বিএমটি, ইউনিভার্সিটি অব সিডনি
এবং বুয়েট। ২০২২ সালে প্রকাশ পাওয়া ওই গবেষণার মূল্যায়ন ছিল—জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে
ভবিষ্যতে কারখানার কর্মপরিবেশ আরো খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। হিট স্ট্রেসের মতো পরিস্থিতি
সামাল দিতে কারখানায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বসানো একটা সমাধান বটে। কোনোমতেই এটি
কোনো টেকসই সমাধান নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, গাছপালা ঘেরা শীতল পরিবেশের কারখানা অর্থাৎ
ছায়াযুক্ত ছাদের নিচে শ্রমিকের কর্মদক্ষতা ও শারীরিক অবস্থা সর্বোচ্চ উৎপাদনের অনুকূলে
থাকে। সঙ্গে স্বাস্থ্য সচেতনতার শর্ত হিসেবে পর্যাপ্ত পানি পান করলে কর্মদক্ষতা প্রত্যাশামতো
থাকে।
যেহেতু বাংলাদেশের রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি
অর্জন হয় তৈরি পোশাক রফতানি খাত থেকে। তাই হিট স্ট্রেস বা অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে
ক্রমাগত কমতে থাকা কর্মদক্ষতা যেন আর না কমে তার আশু সমাধান দরকার। উদ্যোক্তাদের এ
বিষয়ে উদ্বেগ থাকলেও বেশির ভাগ কারখানায় এ ব্যাপারে কার্যকর কোনো সমাধান নেই। বিশেষ
করে দেশের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকদের সামনে উল্লিখিত কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার
পরামর্শ উপস্থাপন করা হলেও আদতে ক’জন উদ্যোক্তা শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন করেছেন তা
নিয়ে আরেকটি গবেষণা হতে পারে।
২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি)
অর্জনে শোভন কর্মপরিবেশ নিশ্চিতে সরকারের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য রয়েছে। কারখানার তাপমাত্রা
নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে উন্নত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে সরকারি আইন
ও নীতিমালায় যে নির্দেশনা রয়েছে তা নিয়ে একটু আলাপ করতে চাই।
বাংলাদেশের শ্রম আইনে কারখানার তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের
যে নির্দেশনা দেয়া আছে তা যে মানা হচ্ছে না, শ্রমিকের অতিরিক্ত তাপমাত্রায় অসুস্থ ও
অনুপস্থিতির হার থেকে তা সহজেই অনুমান করা যাচ্ছে। ২০০৬ সালের শ্রম আইনে ৫২ ধারায় নির্দেশনা
আছে—প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি কর্মকক্ষে নির্মল বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
এমন তাপমাত্রা বজায় রাখতে হবে যাতে শ্রমিকের স্বাস্থ্যহানি না হয় এবং কারখানার উৎপাদিত
উচ্চ তাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য কারখানা অবকাঠামোয় যদি অতিরিক্ত কোনো কিছু সংযোজন করতে হয়,
তা-ও করতে হবে। শ্রম বিধিমালাতেও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দিতে গিয়ে ভেন্টিলেটর
ও এক্সস্ট ফ্যান বসানোর পরামর্শ রয়েছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, সরকারিভাবে পরিদর্শনের
মাধ্যমে কারখানার তাপমাত্রা অনুকূলে রাখার এসব বাধ্যবাধকতা দুর্নীতিগ্রস্ত পরিদর্শন
ব্যবস্থার কারণে কার্যকর নয়। উপরি পাওনার আশায়, আইন ও বিধিমালায় উল্লিখিত বিষয়গুলো
যথাযথভাবে পরীক্ষা না করেই পরিদর্শকরা নতুন কারখানার ছাড়পত্র ও পুরনোগুলোর নবায়ন করে
থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে।
কারখানার মালিক পক্ষ যদি গরমের সময় শ্রমিকের আরামের
কথা চিন্তা না করে শুধু মুনাফা বাড়ানোর ভাবনায় বিভোর থাকে, তাহলে তাদের এ মুনাফা অর্জন
টেকসই হবে না। রফতানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়েও সংশয় থেকে যাবে। দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে
হলে শুধু মৃদু তাপপ্রবাহ বা অতি তীব্র তাপপ্রবাহ সামাল দিতে স্বল্পমেয়াদি চটকদারি সমাধান
নয়, তাপমাত্রা আর বাড়তে না দেয়ার বৈশ্বিক আন্দোলনে শরিক হওয়ার পাশাপাশি কারখানার আঙিনাকে
শীতল ও ছায়া সুনিবিড় করার স্থায়ী পদক্ষেপ নিতেই হবে।
ইব্রাহিম পাঠান:
ডেপুটি কোম্পানি সেক্রেটারি, ন্যাশনাল
পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসি










