উন্নত জীবন ও কর্মসংস্থানের জন্য দেশের মানুষ প্রবাসে পাড়ি জমায়। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স আমাদের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে ভূমিকা রাখে। তবে প্রবাসে কষ্ট করে উপার্জনের মাধ্যমে দেশে অর্থ পাঠালেও প্রবাসীরা অবহেলিত হন এমন অভিযোগ পাওয়া যায়। আবার অনেকেই দালালের খপ্পরে পড়ে বিদেশে উন্নত জীবনের আশায় গিয়ে প্রতারিত হন। কেউবা নিখোঁজ হন গভীর জঙ্গলে আবার কারো সলিল সমাধি হয় ভূমধ্যসাগরে। এরই মধ্যে কাজ হারান অনেক প্রবাসী, আবার যথাযথ পাওনা বুঝে না পেয়েই দেশে ফেরত আসেন কেউ। প্রবাসজীবনের এমন দুঃখগাথার মাঝে এবার সামনে এল সরকারি সংস্থাগুলোর অসামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য। প্রবাসীদের সংখ্যা কত তা নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছতে পারছে না সংস্থাগুলো। সঠিক তথ্য না থাকলে প্রবাসীদের স্বার্থ যে ক্ষুণ্ণ হবে তা খুব সহজেই অনুমেয়।

বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সোয়া কোটি বাংলাদেশী কর্মরত। কিন্তু জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, এ সংখ্যা ১ কোটি ৪৮ লাখের বেশি। আবার সংসদে গত সেপ্টেম্বরে এক প্রশ্নের জবাবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইমরান আহমেদ জানান, বিদেশে ১ কোটি ৫৫ লাখ বাংলাদেশী কর্মী রয়েছেন। আবার এরই মধ্যে বিদ্যমান বিতর্ককে উসকে দিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত জনশুমারি ও গৃহগণনা-২০২২-এর ‘ন্যাশনাল রিপোর্ট’। মঙ্গলবার প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশীর সংখ্যা ৫০ লাখ ৫৩ হাজার। এভাবে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার তথ্যে ব্যাপক পার্থক্য প্রবাসীর সঠিক পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। 

বস্তুত পরিসংখ্যানের তথ্য সংগ্রহ প্রক্রিয়ার ফলে এমন ভিন্নতা পরিলক্ষিত হচ্ছে বলা যায়। যেমন প্রবাসে কেউ মৃত্যুবরণ করলে সে সংখ্যা হালনাগাদ করা উচিত। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, যারা দেশে ফেরত আসছেন তাদের কোনো পরিসংখ্যান থাকে না। আবার বিবিএসের অন্যান্য পরিসংখ্যানের মতো প্রবাসীদের নিয়ে করা প্রতিবেদনও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

এভাবে প্রবাসীর সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য মোটেও প্রত্যাশিত নয়। কারণ এটি প্রবাসীদের জন্য উপযুক্ত কর্মপন্থা নির্ণয়ে ভূমিকা রাখবে না। এমনকি নতুন শ্রমবাজার খোঁজার ক্ষেত্রেও অন্তরায় হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি বিদেশীদের কাছে দেশের ইমেজও প্রশ্নবিদ্ধ হবে। শ্রমবাজার ধরে রাখা ও প্রবাসীদের কল্যাণে মানসম্মত পরিসংখ্যান কীভাবে তৈরি করা সম্ভব, তার প্রক্রিয়া খুঁজে বের করতে হবে। এক্ষেত্রে তথ্য সংগ্রহের সময় উপযুক্ত প্রশ্নমালা তৈরির প্রতিই মত দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিবিএসের যে জরিপ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে, এ শুমারি চলাকালীন যারা ছুটি নিয়ে দেশে এসেছেন তারা প্রবাসী হিসেবে গণ্য হননি। তাদের খানার সদস্য হিসেবেই ধরা হয়েছে। এ রকম যুক্তি কতটা গ্রহণযোগ্য তা নিঃসন্দেহে পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। কারণ দেশে থাকাকালীন একজন প্রবাসী আবার বিদেশে ফেরত যাবেন কিনা সেটি তো অন্তত জরিপের প্রশ্নের অন্তর্ভুক্ত করা যেত। এছাড়া মৃত্যুসংক্রান্ত কারণেও ভুল পরিসংখ্যান পাওয়া যায়। এক্ষেত্রেও অমানবিকতার আখ্যান রয়েছে। প্রবাসীরা বিদেশে মারা গেলে দেশে মরদেহ ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে যথাযথ সহযোগিতা করা হয় না এমন অভিযোগ সম্প্রতি পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছে। আবার দেশে দাফন করা না হলে সে মৃত প্রবাসীর নামও তালিকায় রয়ে যায়, এমন বিপরীতমুখী আচরণও লক্ষ করা যাচ্ছে।

এভাবে খামখেয়ালিপূর্ণ পরিসংখ্যান প্রবাসীদের কোনো উপকারেই আসবে না। এজন্য প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উচিত সব সংস্থার সঙ্গে একত্রে বসে কীভাবে অভিন্ন পরিসংখ্যান তৈরি করা যায় তার একটি রূপরেখা তৈরি করা। তবে ভিন্ন ভিন্ন সংস্থা হওয়ায় পরিসংখ্যানে পার্থক্য থাকবে, এটি অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু বড় ধরনের তথ্যের অসামঞ্জস্য অবশ্যই পুনর্বিবেচনাযোগ্য। যেমন বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা বিভাগ মূলত ব্যাংক থেকে প্রবাসীদের ঋণ নেয়ার প্রবণতা ও প্রভাব নিয়ে পরিসংখ্যান করে। এজন্য তাদের পরিসংখ্যানে প্রবাসীদের সংখ্যা সবচেয়ে কম। আবার প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানে প্রবাসীদের সংখ্যা বেশি। সে হিসেবে কীভাবে অভিন্ন বা অভিন্ন পরিসংখ্যানের কাছাকাছি পৌঁছানো যায়, সে-সংক্রান্ত উদ্যোগ নেয়ার দায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ওপর বর্তায়। আর সর্বশেষ বিতর্ক উসকে দেয়া বিবিএসের জরিপ পরিচালনার পদ্ধতিগুলো আরো হালনাগাদ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

আমরা প্রত্যাশা করি, প্রবাসীরা দেশে ও বিদেশে তাদের প্রাপ্য মূল্যায়নটুকু পাক। এজন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রবাসীদের প্রতি কাঙ্ক্ষিত মনোযোগ দেয়া হবে, এটিই কাম্য। কিন্তু প্রবাসীরা যেন অবহেলিত না হন এবং ন্যূনতম সম্মানটুকু লাভ করেন সেজন্য সংখ্যাগত পরিসংখ্যান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সংখ্যার বিচারেই যেকোনো পরিকল্পনা করা হয়। এ বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী বিবিএসের সঙ্গে বৈঠকের আশ্বাস দিয়েছেন। সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে প্রবাসীদের সংখ্যা নিরূপণের পরবর্তী পদক্ষেপ যেন সুচারুভাবে সম্পন্ন হয়, সেটিই প্রত্যাশিত।