বিজ্ঞানশিক্ষায় ব্যবহারিক ক্লাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এক্ষেত্রে পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান সম্পর্কে শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে শিক্ষা পান। ল্যাব সুবিধা পর্যাপ্ত থাকলে তখনই এটি সম্ভব হয়। কিন্তু আমাদের দেশে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই ল্যাবে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি না থাকায় শিক্ষার্থীদের জ্ঞান অপূর্ণাঙ্গ থেকে যায়। ফলে বিজ্ঞান নিয়ে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ জন্মায় না। পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিজ্ঞানের বিষয়গুলোয় শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার ঘটনাও অহরহ ঘটে। অথচ এখন বিজ্ঞানের ক্রম উৎকর্ষের যুগ, একবিংশ শতাব্দীর এ সময়ে বিজ্ঞানশিক্ষায় সময়োপযোগী শিক্ষা নিশ্চিত করা যুগের চাহিদা হিসেবে গণ্য হয়।

বণিক বার্তায় প্রকাশ, শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে সরকার ২০১৮ সালের জুলাইয়ে বিজ্ঞানশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ প্রকল্প হাতে নেয়। ২০২২ সালের জুনে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ব্যয় ধরা হয় ২ হাজার ৫১১ কোটি ৫১ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। কিন্তু কাজ শেষ না হওয়ায় এর বাজেট বাড়িয়ে ২ হাজার ৫৫০ কোটি ১৮ লাখ ৬২ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। নতুন সময়সীমা অনুযায়ী ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে সারা দেশে ২০০টি সরকারি কলেজে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। তবে বিজ্ঞানশিক্ষার পরিধি বাড়ানো মূল লক্ষ্য হলেও এ প্রকল্পে গবেষণাগারের সরঞ্জামাদির জন্য রাখা হয়েছে কেবল ২০ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের দশমিক ৭৮ শতাংশ। বাকি বরাদ্দের প্রায় পুরোটাই ব্যয় হচ্ছে কলেজের অবকাঠামোগত উন্নয়ন বা সম্প্রসারণে। 

এতে স্পষ্টভাবেই বোঝা যাচ্ছে যে গবেষণাগার বা ল্যাবের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখা হয়নি, যা প্রকৃতপক্ষে এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যকেই ব্যাহত করবে। এতে যে উদ্দেশ্যে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, তার কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ করছে। কেননা শুধু অবকাঠামো নির্মাণ এ প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল না। কিন্তু বরাদ্দকৃত বাজেটের ব্যয়ের খাতে সেটিই প্রতিফলিত হচ্ছে। আবার বাজেট বাড়ানোর বিষয়টিও এখন প্রকল্পকে ব্যয়বহুল করে তুলবে, যা সময়মতো শেষ না করায় এরই মধ্যে এক দফা বেড়েছে। তবে প্রকল্পের ফলাফল বিবেচনায় এক্ষেত্রে গবেষণাগারের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ এখানে অবকাঠামোর পাশাপাশি মানসম্মত গবেষণাগারও গুরুত্বপূর্ণ।

এ প্রসঙ্গে সরকারি কলেজের শিক্ষকরা বলছেন, সিলেবাসের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামসহ বিজ্ঞানের বিষয়ভেদে একেকটি গবেষণাগারের সরঞ্জাম কিনতে ন্যূনতম ১০ থেকে ৫০ লাখ টাকা দরকার। ফলে সরকারি প্রকল্পটিতে এ খাতে যে বাজেট রাখা হয়েছে তা দিয়ে মানসম্মত গবেষণাগার নির্মাণ সম্ভব নয়।

প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, দেশের ২০০টি সরকারি কলেজে প্রকল্পটির আওতায় মোট ১ হাজার ২০০টি গবেষণাগারের জন্য সরঞ্জাম কেনা হবে। এর মধ্যে ২০০টি পদার্থবিজ্ঞান গবেষণাগারের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা। একইভাবে রসায়ন গবেষণাগারের জন্য ৪ কোটি, গণিত গবেষণাগারের জন্য ১ কোটি ৪০ লাখ, প্রাণিবিজ্ঞান গবেষণাগারের জন্য ২ কোটি ৮০ লাখ ও উদ্ভিদবিজ্ঞান গবেষণাগারের জন্য ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়া ২০০টি কলেজে কৃষি, ভূগোল, পরিসংখ্যান, খাদ্য ও পুষ্টি, মৃত্তিকাবিজ্ঞানের যেকোনো একটির গবেষণাগার নির্মাণ বা সরঞ্জাম কেনার জন্য বাজেট রাখা হয়েছে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। সে অনুযায়ী প্রতিটি পদার্থবিজ্ঞান গবেষণাগারের জন্য মাত্র ৩ লাখ ৭০ হাজার, রসায়নে ২ লাখ, উদ্ভিদবিজ্ঞানে ১ লাখ ৬০ হাজার, জীববিজ্ঞানে ১ লাখ ৪০ হাজার ও গণিত গবেষণাগারের জন্য কেবল ৭০ হাজার টাকা বরাদ্দ।   

এ অপ্রতুল বরাদ্দে মানসম্মত গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। ল্যাব সুবিধা নিশ্চিত না করে বিজ্ঞানশিক্ষা কতটুকু কার্যকর হবে সে বিষয়েও শঙ্কা রয়ে যায়। যে কারণে মানসম্মত ল্যাব নিশ্চিতের জন্য এ খাতের বরাদ্দ কয়েক গুণ বাড়ানো উচিত ছিল বলে শিক্ষাবিদরা মত দিয়েছেন।

বস্তুত বিজ্ঞানশিক্ষার মূল উদ্দেশ্যই হলো হাতে-কলমে শিক্ষা। এজন্য ল্যাব অপরিহার্য। তাই বিজ্ঞানশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের জন্য পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত সম্প্রসারণের তুলনায় এটি অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

বিজ্ঞানশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ প্রকল্পের মাধ্যমে গবেষণাগার ছাড়াও ১৭৬টি ছয়তলা একাডেমিক ভবন নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি ১৮টি ঊর্ধ্বমুখী ভবন সম্প্রসারণ, ছয়টি শ্রেণীকক্ষ মেরামত বা সংস্কার, ৪৭টি হোস্টেল ভবন নির্মাণ, ১০টি নতুন বিষয় চালু করা, কম্পিউটার সামগ্রী, বিজ্ঞানের যন্ত্রপাতি ও আসবাব সরবরাহ, শিক্ষকদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও ২০০ কলেজে অফিস সরঞ্জাম সরবরাহের কথা বলা হয়। তবে প্রকল্পটির ব্যয় বিভাজন অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে আবাসিক ভবন ও হোস্টেল নির্মাণে, ১ হাজার ৯০৬ কোটি টাকারও বেশি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৪৯ কোটি ১৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা রাখা হয়েছে আসবাব কেনা বাবদ। ভবনের জন্য ১৭৬টি লিফট কিনতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬৬ কোটি ৮৬ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। গবেষণাগারের বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম কেনার জন্য বরাদ্দ কেবল ২০ কোটি টাকা। আড়াই হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে এ পরিমাণ বরাদ্দ কোনো মানসম্মত শিক্ষার ছাপ রাখতে পারবে না, এটিই সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন।

তাই প্রকল্পটিকে সার্থক করার জন্য গবেষণাগারের বরাদ্দ প্রয়োজনে বাড়ানো হোক, সেটিই সবার কাম্য। এজন্য প্রয়োজনে অন্য খাত থেকে বরাদ্দ কমিয়ে গবেষণাগারে মানসম্মত বৈজ্ঞানিক সরঞ্জামাদি কেনায় অর্থ বরাদ্দ করা উচিত।