দেশের শিক্ষার বুনিয়াদ হলো প্রাথমিক শিক্ষা। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুর উপস্থিতি প্রায় শতভাগ নিশ্চিত হয়েছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নও হয়েছে বেশ। কিন্তু শিক্ষক ও শিক্ষার মান নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষকের সংখ্যা কম। বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষকেরও অভাব রয়েছে। তাই দক্ষ শিক্ষক তৈরিতে ও শিক্ষকের সংখ্যা বাড়াতে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। নতুন নতুন শিক্ষা পদ্ধতি চালু করার আগে শিক্ষকের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে সামগ্রিক উন্নয়ন ব্যাহত হবে। গ্রামের নিম্ন আয়ের অভিভাবকরা এখনো তাদের সন্তানদের নিয়মিত স্কুলে পাঠান না। অভিভাবকদের এ রকম আচরণেও স্কুল ত্যাগে বাধ্য হয় শিক্ষার্থীরা। শিক্ষা নিয়ে অভিভাবকদের সচেতন হওয়া জরুরি। শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। অর্থ ব্যয়েও বাড়তি নজরদারি অব্যাহত রাখতে হবে। দক্ষ শিক্ষক না থাকায় গণিতসহ মৌলিক বিষয়গুলোর প্রতি শিক্ষার্থীদের ভীতি ও অনীহা সৃষ্টি হয়। তাই এ সমস্যা সমাধানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের নজরদারি বাড়াতে হবে। সেই সঙ্গে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের স্কুলে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য ভেতরের গুণাবলিকে বিকশিত করা। নানা কারণে আমরা সেই উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হচ্ছি। বারবার শিক্ষা কারিকুলাম পরিবর্তন করা হচ্ছে। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যেও অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জন করতে হলে টেকসই ও যুগোপযোগী শিক্ষা পদ্ধতি জরুরি। সরকার বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ ও উপবৃত্তিও চালু করেছে।
বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে প্রাথমিক শিক্ষার মানে ১০টি জেলা সবচেয়ে পিছিয়ে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের মূল্যায়ন সমীক্ষার ফলাফলও দিচ্ছে একই তথ্য। প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের পঠন দক্ষতা খুব একটা ভালো নয়। জাতীয় পর্যায়ে তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের বাংলা ও গণিতে গড় দক্ষতা মান এসেছে যথাক্রমে ১০৩ দশমিক ৩ এবং ১০৪ দশমিক ১ আর পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের বাংলা ও গণিতে গড় দক্ষতা মান যথাক্রমে ১১০ দশমিক ২ ও ১১৩ দশমিক ৩।
শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ হারের বিষয়টি ফুটে উঠেছে ২০২২ সালের জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিবেদনেও। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ ১০ জেলার অধিকাংশেই ৩৫ থেকে ৭০ শতাংশ শিক্ষক প্রশিক্ষণহীন। এদের মধ্যে বান্দরবানে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের হার সবচেয়ে কম। এ জেলায় মাত্র ৩৮ দশমিক ৬১ শতাংশ শিক্ষক প্রশিক্ষিত। এছাড়া কুড়িগ্রামে ৫৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ, যশোরে ৬০ দশমিক ৬০, রাজবাড়ীতে ৬৪ দশমিক ৩২, নড়াইলে ৬১ দশমিক ৭৭, ঝিনাইদহে ৫৯ দশমিক শূন্য ৯, জয়পুরহাটে ৬৪ দশমিক ৪৮, সুনামগঞ্জে ৬০ দশমিক ৫৩, সিলেটে ৭১ দশমিক ৯২ ও বগুড়ায় ৬৩ দশমিক ২৩ শতাংশ শিক্ষক প্রশিক্ষিত।
শিক্ষার্থী ছাড়া শিক্ষক ও অভিভাবকরাও শিক্ষা ব্যবস্থার অংশীদার। তাই তাদের বাদ দিয়ে শিক্ষা খাতে সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। শিক্ষা পদ্ধতি গ্রহণেও তাদের গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা জোরালো করা দরকার। প্রায়োগিক ক্ষেত্র সৃষ্টি না করে নতুন শিক্ষা পদ্ধতি চালু করে কোনো সুফল বয়ে আনা অসম্ভব। বন্ধ করতে হবে গাইড ও কোচিংয়ের রমরমা ব্যবসা। এছাড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঠ্যবই পড়ার অভ্যাস ফিরিয়ে আনা জরুরি।
শিক্ষিত বেকার জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কমিয়ে আনতে কর্মমুখী শিক্ষার বিকল্প নেই। উচ্চ শিক্ষা শেষে কৃষি খাতে ফিরে না যাওয়ার কারণ অনুসন্ধান করা দরকার। শিক্ষাকে করতে হবে বহুমুখী। মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে হলে আমাদের শিক্ষা খাতকে গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষার থাকতে হবে যথাযথ মান। শিশু, প্রতিবন্ধিতা ও জেন্ডার সংবেদনশীল শিক্ষা সুবিধা নির্মাণ ও মানোন্নয়ন এবং সবার জন্য নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কার্যকর শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, কারিগরি, প্রকৌশল ও বিজ্ঞানসংশ্লিষ্টতা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ানো দরকার।










