আমি স্কয়ার ফুড অ্যান্ড ব্রেভারেজের চিফ অপারেটিং অফিসার। আমরা স্কয়ার ফুড এগ্রো প্রসেসিংয়ের কিছু কিছু ক্যাটাগরিতে বিজনেস করি। যেমন রাঁধুনি”বাংলাদেশের অন্যতম স্বনামধন্য ব্র্যান্ড। আমরা প্রায় ২০ বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে বিপণন করছি। এটা শুধু যে বাংলাদেশে অন্যতম ভোক্তা পছন্দনীয় একটি ব্র্যান্ড এমন নয় বরং আন্তর্জাতিক বাজারেও আমরা রফতানি করছি নিয়মিত। স্কয়ার ফুডের পক্ষ থেকে আমরা প্রধান যেসব ক্যাটাগরিতে বর্তমানে ব্যবসা করছি তার মধ্যে একটি হচ্ছে মসলা ও মিশ্র মসলা। এছাড়া আমরা ভোক্তাদের প্রাত্যহিক জীবনযাপনের নিত্য অনুষঙ্গ অনেক পণ্য নিয়ে কাজ করছি।
আমাদের আরেকটি স্ন্যাকস ব্র্যান্ড ‘রুচি’। পাশাপাশি আমাদের আরো দুটি ব্র্যান্ড আছে। একটি হচ্ছে সুগন্ধি চাল চাষী চিনিগুঁড়া এবং আরেকটা হচ্ছে চপস্টিক ইনস্ট্যান্ট নুডলস। সম্প্রতি আমরা আরো একটি ব্র্যান্ড বাংলাদেশে বাজারজাত করছি। সেটা হচ্ছে ‘আরাম’ যেটি শতভাগ ফ্রুট জুস। সাপ্লাই চেইন নিয়ে অনেকেই কথা বলছেন। আমাদের মোট কৃষিজাত পণ্যের ৮৩ শতাংশই বাংলাদেশের নিজস্ব বাজার থেকে সংগ্রহ করি। এর বাইরে ১৭ শতাংশ বাইরে থেকে সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে চিলি, টার্মারিক, কোরিয়েন্ডার, কিউমিন—এ চারটা হচ্ছে যেকোনো স্পাইসের একেবারে প্রাথমিক জিনিস। তার মধ্যে বাংলাদেশে শতভাগ কিউমিনটা বাইরে থেকে আসে। পাশাপাশি বেশকিছু সিজনিং বাইরে থেকে আমদানি করা হয়। মোটা দাগে বললে, আমাদের কাঁচামালের ৮০ শতাংশের বেশি স্থানীয় বাজার থেকে সংগ্রহ করি। মাত্র ১৭ শতাংশ আমরা আমদানি করি। দেখা যাচ্ছে, এ পণ্যগুলোর বেশির ভাগই মৌসুমভিত্তিক। এ মৌসুমি পণ্যগুলোর জন্য অনেক আগে থেকে আমাদের সাপ্লাই চেইনকে ক্রিয়াশীল করতে হয়। আগে আমাদের সরবরাহকারী (সাপ্লায়ার) নির্ভরশীলতা ছিল। বর্তমানে সেই সাপ্লায়ার নির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে সরাসরি প্রান্তিক পর্যায়ে কৃষকের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছি। আমরা কয়েক বছর ধরে কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ের (চুক্তিভিত্তিক খামার) মাধ্যমে তাদের কাছ থেকে কৃষিপণ্য সংগ্রহ করছি। এ কারণে আমরা গ্রাহকদের সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য সরবরাহ করতে পারছি।
আমাদের মৌসুমি পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে সুগন্ধি চাল ও গুঁড়া মরিচ। মরিচ বছরে এক মৌসুমে হয়ে থাকে। এজন্য আমাদের অনেক আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হয়। আবার আমরা যে মানের গুঁড়া মরিচ আশা করি তা সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে নিতে পারি না। এর ফলে আমরা কন্ট্রাক্ট ফার্মিং করেছি গাইবান্ধার চরে। সেখানে সাত শতাধিক কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি নেয়ার চেষ্টা করছি। একইভাবে আমরা সুগন্ধি চালের জন্য ছয়শর মতো কৃষকের সঙ্গে কাজ করছি। সরিষার জন্য এক হাজারেও বেশি কৃষকের সঙ্গে কাজ করছি।
অনেক ক্ষেত্রে আমরা দেখি যে একটা পর্যায়ে কৃষকের হাতে আর পণ্যটা থাকে না। তা চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে। ফড়িয়া মারফত তা ছোট সাপ্লায়ার ও বড় সাপ্লায়ারদের কাছে যায়। এতে প্রতিটি হাতবদলের ঘটনায় দাম বাড়তে থাকে। শেষ ধাপে এসে আমাদের পক্ষে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয় না, যদি না মার্কেট মেকানিজমগুলো ঠিকঠাক মতো কাজ করে।
দুই বছর আগে মরিচ নিয়ে যা হলো সে বিষয়ে বলা যায়। হঠাৎ করে দেখা গেল, একটা গোষ্ঠী মরিচের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। তখন এটা আমদানি করা হলে দাম কিছুটা কমেছিল তবে ওটা ছিল সাময়িক। সাপ্লাই চেইন পয়েন্ট অব ভিউ থেকে যদি বলি, এই এগ্রিকালচারাল প্রডাক্টগুলো সরকারের বাজার ব্যবস্থাপনার পক্ষ থেকে একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ে কিছু কাজ করা যায়। তা হচ্ছে, এ ফসলের স্টোরেজের ব্যবস্থা করা যাতে পুরোপুরিভাবে ছোট ব্যবসায়ী-ফড়িয়ার হাতে চলে না যায়।
কৃষক যদি তার ফসলটা সংরক্ষণ করতে পারেন তাহলে তারা পরবর্তী সময়ে ন্যায্য দাম পাবেন। এর ফলে পরবর্তী সময়ে কৃষককে অন্যের হাতে চলে যেতে হবে না। এ জায়গাটায় আমার মনে হয় সরকারের একটা বাজার ব্যবস্থাপনার ব্যাপার থাকবে। মাননীয় বাণিজ্য উপদেষ্টা আছেন এখানে। এ জায়গায় আরেকটু নজর দিতে হবে, যাতে প্রান্তিক চাষীরা পণ্যগুলো স্টোর করতে পারেন এবং পণ্যের ন্যায্য দামটা ঠিকমতো রাখতে পারেন।
গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্পে কেবল ম্যানুফ্যাকচারিং খাত কিংবা আরএমজির কথা উঠে এসেছে। কারণ এর মাধ্যমে ৪০-৪৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসে প্রতি বছর। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের সামাজিক কাঠামোর কথা বললে দেশের প্রকৃত নায়ক হচ্ছেন কৃষক। ঠিকমতো দাম পাক আর না পাক তারাই দেশের প্রকৃত নায়ক।
সমন্বিত একটি কৃষিনীতি প্রণয়নে কাজ করা উচিত সরকারের। আমরা সব জায়গায় শুনি, পরিবহন ও সংরক্ষণের অভাবে ২৫ শতাংশেরও বেশি শাকসবজি ও ফল নষ্ট হয়ে যায়। এটা বড় অংকের অর্থনৈতিক ক্ষতি। কৃষিপণ্য ঠিকমতো সংরক্ষণ ব্যবস্থার ওপর জোর দেয়া চাই।
বাংলাদেশের ফলের যে সম্ভাবনা সেটা আসলে আমরা কিছুই কাজে লাগাতে পারিনি। আমরা ঠিকমতো ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মৌসুমি ফল প্রক্রিয়াজাত করে বড় অংকের বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারি। এখন অনেক উদ্যোগ চালু হয়েছে। হিমাগার থেকে শুরু করে পরিবহন সব জায়গাতেই হাত দেয়া হচ্ছে—এটাকে সাধুবাদ জানাই।
সবশেষে, কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে সরবরাহ চেইনে যদি কৃষকের নিয়ন্ত্রণ আরেকটু বাড়ানো যায় তাহলে তারা ন্যায্য দাম পেতে পারেন। এজন্য সংরক্ষণ, বিপণনে তাদের সামনে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা রাখতে হবে। এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমবে। আমরা চাই, আমাদের কৃষকরা যেন ন্যায্য দাম পান। একই সঙ্গে এটাও চাই, আমাদের ভোক্তারা ভালো পণ্য পাক।
পারভেজ সাইফুল ইসলাম: চিফ অপারেটিং অফিসার, স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজেস লিমিটেড
[বণিক বার্তা আয়োজিত কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা ও প্রাণ-প্রকৃতি সম্মেলনের ‘খাদ্যের বাজার, সরবরাহ ও দেশজ সক্ষমতা’ বিষয়ক অধিবেশনে প্যানেল আলোচকের বক্তব্যে]










