দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা পেশায় প্রবাসীরা কর্মরত। তবে প্রবাসীদের অধিকাংশই মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবে বাস করেন। বৈদেশিক শ্রমবাজারে প্রবাসী আয়ের প্রধান উৎস এ দেশ থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। সৌদির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকেও রেমিট্যান্স আসা কমছে, যা আমাদের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক। দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ হ্রাস পেলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ বাড়বে। বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জটিলতা কমাতে হবে, প্রণোদনা বৃদ্ধি ও পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। পাশাপাশি ব্যাংকিং সেবার মান উন্নত করতে হবে। এছাড়া দেশের বাজারে মুদ্রার স্থিতিশীল বিনিময় হার নির্ধারণ করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২৪ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ থাকার কথা বলেছে, সেদিকেও গুরুত্ব দেয়া জরুরি। অপ্রাতিষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রেরণ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপের বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে প্রবাসীদের সঙ্গে শ্রম ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যোগাযোগ বাড়ানো দরকার। তাদের সেবার মানও উন্নত করতে হবে। প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধার প্রতিও নজর দিতে হবে। 

বণিক বার্তায় প্রকাশ, সৌদি আরবের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকেও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে রেমিট্যান্স প্রবাহ। গত তিন বছরে সৌদি আরব থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ ছিল তা চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) সেটি স্তিমিত হয়ে পড়ে। ২০২২-২৩ অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় গত ছয় মাসে যুক্তরাষ্ট্র থেকেও রেমিট্যান্স কমেছে ৪২ দশমিক ৭৬ শতাংশ। রেমিট্যান্স প্রবাহে বিপর্যয়ের কারণে শীর্ষ থেকে চতুর্থ অবস্থানে নেমে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে বিপর্যয় হলেও এ সময়ে রেমিট্যান্স বেড়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে। গত ছয় মাসে দেশটি থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ ৪৮ শতাংশ বেড়েছে। এতে বাংলাদেশের শীর্ষ রেমিট্যান্স আহরণের দেশের তালিকায় বর্তমানে শীর্ষস্থানে আরব আমিরাত। 

বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৬ থেকে ২০২৩ সালের নভেম্বর পর্যন্ত দেশ থেকে মোট ১ কোটি ৫৯ লাখ ৮০ হাজার ২৯০ জন বাংলাদেশী বিভিন্ন কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশে গেছেন। এর মধ্যে শুধু সৌদি আরবেই অভিবাসী হয়েছেন ৫৭ লাখ ৩২ হাজার ৪৬২ জন। অর্থাৎ দেশের মোট অভিবাসী শ্রমিকের ৩৫ দশমিক ৮৭ শতাংশই সৌদি আরবে গেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ বিভিন্ন সময়ে দেশে ফিরেও এসেছেন। তবে এ মুহূর্তে ঠিক কী পরিমাণ বাংলাদেশী সৌদি আরবে বসবাস করছেন, তার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোয়ও এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। 

সংস্থাটির পরিসংখ্যান থেকে আরো জানা যায়, গত তিন বছরেই ১৫ লাখের বেশি বাংলাদেশী শ্রমিক সৌদি অভিবাসী হয়েছেন। এর মধ্যে ২০২১ সালে গেছেন ৪ লাখ ৫৭ হাজার ২২৭ জন, ২০২২ সালে ৬ লাখ ১২ হাজার ৪১৮ ও ২০২৩ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ৪ লাখ ৫১ হাজার ৫০২ জন বাংলাদেশী সৌদি আরব গেছেন। এত বিপুল পরিমাণ বাংলাদেশী শ্রমিক নতুন করে যুক্ত হলেও সৌদি আরব থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ না বেড়ে উল্টো কমে যাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে শ্রমিকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে বিদেশে পাঠাতে হবে। বিশেষ কাজে দক্ষতা বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে সরকার শ্রমিকদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তুলতে পারে। এ প্রতিষ্ঠান শ্রমিকদের বিভিন্ন কাজের প্রশিক্ষণ দিয়ে সনদ প্রদান করবে যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হবে। প্রবাসীরা প্রশিক্ষিত না হওয়ায় প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ ও বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। বৈদেশিক বিনিময় হারের নীতি কৌশল ও ব্যবস্থাপনা ঠিক করতেও দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া দরকার। বস্তুত রেমিট্যান্স বাড়াতে হলে হুন্ডিওয়ালাদের দৌরাত্ম্য কমাতে হবে। ব্যাংক বা মানি এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোর প্রতি প্রবাসীদের আগ্রহী করতে নানা ধরনের প্রণোদনা ও সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। ব্যাংকিং সেবা বা মানি এক্সচেঞ্জ হাউজ প্রবাসীদের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর উদ্যোগ নেয়ার পাশাপাশি প্রবাসীদের দূতাবাস বা হাইকমিশনে পাসপোর্ট বা ভিসা নবায়নসহ অন্যান্য কাজের জটিলতা কমিয়ে আনতে হবে। এছাড়া সেবার মান আরো উন্নত করতে হবে। প্রবাসী নিরাপত্তার বিষয়ে দূতাবাসের কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রবাসীদের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আরো দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। এক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশ ভারত, শ্রীলংকা ও ফিলিপাইনের উদাহরণ বিবেচনা করা যায়। সর্বোপরি বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে প্রবাসীদের উৎসাহিত করতে সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলোর কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন। 

এছাড়া বিমানবন্দরে নানা হয়রানি বন্ধ করতে হবে। অর্থ পাচার বন্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ রেমিট্যান্স প্রবাহে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। স্বল্প আয়ের প্রবাসীদের সরকারিভাবে প্রণোদনা বাড়াতে হবে। ভারত, শ্রীলংকা ও ফিলিপাইনের প্রবাসীরাও নানা ধরনের সুবিধা পান। দেশের অর্থ পাচারকারীদের সঙ্গে হুন্ডি ব্যবসায়ীদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বিদ্যমান। সরকার বৈধভাবে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানোর জন্য আড়াই শতাংশ প্রণোদনা দিচ্ছে, তা আরো বাড়াতে হবে। দেশে সরকারের ডিজিটাল মানি ট্রান্সফারের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তবে তা বৃহৎ পরিসরে বাড়াতে হবে। আমরা প্রত্যাশা করব, রেমিট্যান্স প্রেরণে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা দূর করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো ভূমিকা রাখবে। এক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়, দূতাবাস ও ব্যাংকিং চ্যানেলের সমন্বিত ভূমিকা কাম্য।