স্বাদু ও লোনা পানির সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছে বিশ্বের অন্যতম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের ভূ-প্রকৃতি। এ বনের ৩১ দশমিক ১৫ শতাংশ জলাভূমি। প্রায় ৪৫০টি নদী-খাল বনের অলিগলি দিয়ে প্রবাহিত হয়। যদিও এর মধ্যে অনেক নদী এখন মৃতপ্রায়। সরকারি উপাত্ত বলছে, সুন্দরবনবিধৌত ৫৩ নদী বর্তমানে নাব্য সংকটে রয়েছে। নদীগুলো ভরাট ও দখলদারত্ব, অপরিকল্পিত বেড়িবাঁধ, বিরূপ জলবায়ু এবং মানুষের অসচেতন কর্মকাণ্ডের কারণে ক্ষীণকায় হয়ে আসছে। ফলে নদীগুলোয় পানিপ্রবাহ কমে লবণাক্ততা বাড়ছে, সুপেয় পানির অভাব দেখা দিয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য এবং অববাহিকায় বসবাসরত মানুষের জীবিকা উপার্জনে। এমনকি ব্যাহত হচ্ছে নদীপাড়ের কৃষি উৎপাদন। আশঙ্কা রয়েছে নদীর নাব্যতা ফেরানো না গেলে উদ্ভূত সমস্যা আরো প্রকট হবে। ‘সুন্দরবন সংরক্ষণ ও উন্নয়ন’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সুন্দরবনের জলরাশিতে রয়েছে বিপুল মৎস্যসম্পদ। এখানে ২১০ প্রজাতির সাদা মাছ, ২৬ প্রজাতির চিংড়ি, ১৩ প্রজাতির কাঁকড়া এবং প্রায় ৪২ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক পাওয়া যায়। এ বনের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ নির্ভরশীল। সুতরাং বনজ সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার্থে এবং নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে নাব্য সংকট কাটিয়ে উঠতে হবে। এজন্য চাই যথাযথ ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ।

সুন্দরবনসংলগ্ন নদীগুলো দিনে দুবার জোয়ার-ভাটায় প্লাবিত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে জোয়ারের চেয়ে ভাটার স্থায়িত্ব এখন বেশি। ফলে একদিকে যেমন বনের জলাশয়ে লবণাক্ততা বাড়ছে, তেমনি পলি জমে ভরাট হচ্ছে নদী। এছাড়া পলি জমে জায়গা ভরাট হওয়ায় জলাবদ্ধতা তৈরির পাশাপাশি মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাচ্ছে, যা মানুষ ও প্রাণী উভয়ের জন্য খাবার পানির সংকট বাড়াচ্ছে। আবার লবণাক্ত পানি ‍কৃষিজমিতে সেচ প্রক্রিয়াও ব্যাহত করছে। কৃষি উৎপাদন কমছে এবং কৃষকরা এর ভুক্তভোগী হচ্ছেন।

প্রতিকূল জলবায়ুর পাশাপাশি মানুষের অসচেতন কর্মকাণ্ডও নদীর নাব্যতা হ্রাসে দায়ী। নগরায়ণ, বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ, মৎস্যসম্পদের অতি আহরণে সংকটাপন্ন এ নদীগুলো। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নৌ-পরিবহন ব্যবস্থার ত্রুটি। জাহাজ ডুবে তেল, ফার্নেস অয়েল, ফ্লাই অ্যাশ, কয়লা, সারসহ রাসায়নিক দ্রব্যে নদীর পানি দূষিত করে এবং বনের জলজ প্রাণীদের জীবননাশ করে। কেননা এতে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা কমে আসে। এছাড়া পলি জমে নদীর অববাহিকা ভরাট হলে সেখানে মানুষ দখলদারত্বের মাধ্যমে বসতিসহ নানা স্থাপনা নির্মাণ করছে। এতে পানিপ্রবাহ বাধা পায়। তবে নদীতে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া এবং শুকিয়ে যাওয়ার পেছনে ভারতের ফারাক্কা বাঁধসহ আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর ওপর বাঁধ নির্মাণের দায় অস্বীকার করার অবকাশ নেই। বাংলাদেশের ৫৭টি আন্তর্জাতিক নদীর মধ্যে ৫৪টি ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে অবস্থিত। সুতরাং নদীর নাব্য সংকট কাটাতে যে পদক্ষেপই নেয়া হোক না কেন, পানি নীতিতে ভারতের কার্যক্রম গুরুত্বসহকারে ‍বিচার করতে হবে। ১৯৯৬ সালে গঙ্গার পানি চুক্তির পর বাংলাদেশে গঙ্গার পানির অংশ দাঁড়িয়েছে সেকেন্ডে ২০ হাজার ঘনফুটের কম। অথচ ফারাক্কা বাঁধ চালুর আগে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ প্রায় ৭০ হাজার কিউসেক পানি পেত। গঙ্গা একটি আন্তর্জাতিক নদী। এ নদীর প্রতি বাংলাদেশেরও অধিকার আছে। আন্তর্জাতিক নদীর বিষয়ে কোনো দেশ এককভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে না। জাতিসংঘ নদী কনভেনশনে আন্তর্জাতিক নদীর পানি ব্যবহারে ‘ন্যায়ানুগ ও সংগত’ আচরণের কথা উল্লেখ করে বলা হয়, যেকোনো কাজের মাধ্যমে ‘অন্যের’ উল্লেখযোগ্য ক্ষতিসাধন করা যাবে না। অভিন্ন নদী ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন গঠনের মতো সুযোগ রয়েছে। সুতরাং দেশের আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর নাব্য সংকট মোকাবেলায় প্রয়োজনে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন গড়ে তুলতে হবে। তবে যেকোনো সমস্যা মোকাবেলায় শুরুতেই দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার পথে হাঁটা উচিত। দ্বিপক্ষীয়ভাবে সমস্যার সমাধান করা না গেলে জাতিসংঘের নদী কনভেনশনের ৩৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পানি-সংক্রান্ত সমস্যার নিষ্পত্তি করা যাবে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) মাধ্যমে। বাংলাদেশকে এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। গঙ্গা নদীর ওপর ভারতের এককভাবে বাঁধ নির্মাণের ফলে সৃষ্ট সমস্যার সুরাহা করতে হবে। 

একই সঙ্গে নদীপাড়ের মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। শীর্ণ নদী অববাহিকায় জীবনধারণকে হুমকির সম্মুখীন করে। একসময় বেলোয়ারি নদীর বুকে নৌকায় চেপে মানুষ মাছ সংগ্রহ করত এবং সুন্দরবনে যেত কাঠ ও মধু সংগ্রহ করতে। এখন মৃতপ্রায় নদীরা বনের গভীরে যাতায়াত সহজ করেছে ঠিকই, কিন্তু এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বন ও মানুষ। বনের প্রাণীরা লোকালয়ে চলে যায় আবার লোকালয়ের পোষ মানা প্রাণীও বনের ভেতরে প্রবেশ করে হিংস্রতার শিকার হচ্ছে। এছাড়া জাহাজ, নৌযান নিয়মিত যাতায়াত করে সুন্দরবনসংলগ্ন অন্য নদী বেয়ে। বিষাক্ত রাসায়নিক পণ্যবাহী জাহাজডুবি প্রায় নদীগুলোকে বিষিয়ে তোলে। ফলে মাছের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। তাই এ ধরনের দুর্ঘটনা হ্রাসকল্পেও ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

বলা হয় নদীর নাব্যতা ফেরাতে সবচেয়ে কার্যকরী পদ্ধতি হলো ড্রেজিং। উন্নত দেশেও এ পদ্ধতিতেই নদীর নাব্যতা ধরে রাখা হয়। এখানেও ড্রেজিং পদ্ধতির প্রচলন রয়েছে। বলা বাহুল্য, উন্নত দেশে ড্রেজিং কার্যকরী ভূমিকা রাখলেও এখানে তেমন কোনো পরিবর্তন রাখতে ব্যর্থ। কারণ উন্নত দেশ যেমন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের অসংখ্য দেশ, চীন, দক্ষিণ কোরিয়াসহ অন্য দেশগুলো বৈজ্ঞানিক উপায় অবলম্বনের মাধ্যমে এটি করে থাকে। একেক নদীর গঠন কাঠামো আলাদা। কেবল বালি উত্তোলন করে খননকাজ করলেই নদীর নাব্যতা বজায় রাখা সম্ভব নয়। এজন্য চাই নদী বিশেষে বিশেষ ব্যবস্থা। নদী নিয়ে গবেষণা তাই জোরদার করা উচিত। প্রতিটি নদীর গতিপ্রকৃতি বিবেচনায় নিয়ে এর ব্যবস্থাপনাও আলাদাভাবে করতে হবে।

নদীতে পলি জমবে, এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। পলি অপসারণে নিয়মতান্ত্রিক উপায় অনুসরণ করা জরুরি। দেখা যায় পলিগুলো নদীর কাছেকোলে কোথাও জমিয়ে রাখা হয়। জোয়ার-ভাটায় তা পুনরায় নদীগর্ভে নিপতিত হয়। ফলে নদী ভরাটের সমস্যা দেখা দেয়, যা নাব্য সংকটের অন্যতম কারণগুলোর একটি। খননকাজের সঙ্গে পলি কোন জমিতে অপসারণ করা হবে তা আগেই নির্ধারণ করা জরুরি।

সারা দেশেই নদীর নাব্য সংকট বর্তমান। সুন্দরবনবিধৌত নদীসহ দেশের সব নদীর পানিপ্রবাহ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পানির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে দীর্ঘস্থায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তাহলে নৌযোগাযোগ ও কৃষি উৎপাদনের আকার বাড়বে, দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে।