ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান। এছাড়া তিনি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘উন্নয়ন অন্বেষণ’-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারপারসন। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উন্নয়ন ও আর্থিক অর্থনীতিতে এমএসসি এবং অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল) থেকে তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে ‘ফিফটি ইয়ার্স অব নেশন বিল্ডিং: পলিটিক্যাল ইকোনমি অব বাংলাদেশ’স ডেভেলপমেন্ট’। সম্প্রতি নেশন বিল্ডিং বা জাতি গঠন, বাংলাদেশের অর্জন-বিসর্জন, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক অর্থনীতির নানা ইস্যু নিয়ে কথা বলেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনিকা মাহজাবিন ও সাবিদিন ইব্রাহিম
নেশন বিল্ডিং কেন ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়? বাংলাদেশে মিসিং ডটগুলো কী?
ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বা উন্নয়ন অধ্যয়ন এবং নেশন বিল্ডিং বা জাতি গঠন সম্পর্কে অনেকগুলো ধারণা প্রচলিত আছে। ধারণাগুলোর অনেকগুলোই প্রতিক্রিয়া হিসেবে তৈরি হয়েছে। কিন্তু সামনে এগোতে হলে নিজস্ব চিন্তা নিয়ে এগোতে হবে। জাতি গঠন কিংবা উন্নয়নের ধারণার সঙ্গে মাটি, পানি ও মানুষের সম্পর্ক এবং তার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিকতার সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। মানুষ আসলে মুক্তির সন্ধানে সবসময় নিয়োজিত। সেখান থেকেই আমাদের উন্নয়ন ধারণার সংজ্ঞায়ন করতে হবে। যে সংজ্ঞার সঙ্গে বাংলাদেশের যেমন সম্পর্ক থাকবে, তেমনি এর সঙ্গে সঙ্গে এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকার সম্পর্ক থাকতে হবে। কারণ সবখানেই আমাদের স্বার্থ রয়েছে। এ আলোকে বাংলাদেশের সংজ্ঞায়ন আগে করতে হবে। বাংলাদেশকে আমরা যখন নদীমাতৃক দেশ বলি। সেখানে পদ্মা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র রয়েছে এবং সাগরমাথা থেকে বঙ্গোপসাগরে নদীগুলোর শাখা-প্রশাখা হিসেবে প্রবাহিত হচ্ছে, জনপদ গড়ে তুলছে। জনপদের সঙ্গে মানুষ, জীব, প্রাণীসহ সবাই রয়েছে। নদীমাতৃক দেশকে যদি আমরা চিন্তা করি, অর্থাৎ একমাত্র বা একটি বিষয় থেকে উন্নয়নকে বোঝা যাবে না। যেমন বাংলাদেশকে বুঝতে গেলে তার বিভিন্ন বড় নদী, শাখা নদী ও উপনদীকে বুঝতে হবে। এসব নদী ও তার অববাহিকার সঙ্গে আমাদের রাজনীতি, সংস্কৃতি, সমাজ, প্রতিবেশের সম্পর্কও বোঝা দরকার।
এগুলো বুঝতে হলে চিন্তায় এক ধরনের সংশ্লেষ দরকার, একটি সিনথেসিস দরকার। সেই ভাবে চিন্তা করলে, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর অধ্যয়নকে ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বা উন্নয়ন অধ্যয়ন বলা যাবে না। অথবা উত্তর থেকে দক্ষিণের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অধ্যয়নকেও উন্নয়ন অধ্যয়ন বলা যাবে না। কারণ উন্নয়ন অধ্যয়ন ও সমাধান করতে হবে মানুষের আকাঙ্ক্ষা থেকে। এখানে দেখা যাচ্ছে, তারা একটা রাষ্ট্র নির্মাণ দেখছে। একটি বিনির্মাণের কথা চিন্তা করছে এবং সেখানে সবসময় সংগ্রাম করে যাচ্ছে। সেই আলোকে যদি দেখি, তাহলে দেখব, অধিকারযুক্ত রাষ্ট্র বিনির্মাণই হচ্ছে নেশন বিল্ডিং। জাতি গঠনের রাজনীতির মধ্যেই যদি নিজেকে রেখে দিই তাহলে কিন্তু অধিকারমুখী রাষ্ট্র গঠন হবে না, নাগরিক অধিকার আসবে না।
তাহলে অধিকারমুখী রাষ্ট্র গঠনের জন্য ইন্টার ডিসিপ্লিনারি বা আন্তঃশাস্ত্রীয় অনুসন্ধান দরকার?
ইন্টার ডিসিপ্লিনারিটির আলোকেই আমাদের রাষ্ট্র নির্মাণ বুঝতে হবে। কারণ রাষ্ট্র নির্মাণ না হলে, জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের যে সামাজিক চুক্তি রয়েছে এবং যেটা সংবিধানে বিবৃত রয়েছে, তা বোঝা যাবে না। আমরা রাষ্ট্র বিনির্মাণ অর্থাৎ অধিকারমুখী বা অধিকারবাদী রাষ্ট্র নির্মাণকে বুঝিয়েছি। বাংলাদেশ ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করেছে। এ ভূখণ্ড একটা বঙ্গীয় সভ্যতার মধ্য দিয়ে গেছে, যেটা ধারণ করছে আজকের বাংলাদেশ। বঙ্গীয় সভ্যতা ভারতীয় কিংবা চীন বা তুর্কি বা অন্য সভ্যতা থেকে ভিন্ন। এ সংশ্লেষকে বুঝতে হবে। সংশ্লেষকে বুঝতে হলে লক্ষ করতে হবে, বাংলাদেশ রাষ্ট্র একটি সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে হয়েছে। তাহলে দুটো জিনিসকে ধরতে হবে। প্রথমত, এ রাষ্ট্র নির্মাণের ক্ষেত্রে মানুষের কী আকাঙ্ক্ষা ছিল, যা মূর্ত হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রে। তিনটি বিষয় উল্লেখ রয়েছে—সমতা, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। এগুলো বিমূর্ত ধারণা। একে মূর্ত করতে হবে। সেই আলোকেই স্বাধীনতার ৫০ বছর পর আমাদের বোঝা দরকার স্বাধীনতার অভীষ্টগুলোকে, এ বিমূর্ত ধারণাগুলোকে কীভাবে মূর্ত করে দেখা যায়। দুঃখজনক যে সেখানেই আসলে বড় রকমের সংকট তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ মৌলিক নীতির বাস্তবায়নেই সংকট তৈরি হয়েছে। বলা হচ্ছে জাতিরাষ্ট্র গঠন হয়েছে। বাঙালি পরিচয়ের দিক থেকে ঠিক আছে। কিন্তু এ জাতিরাষ্ট্র তার সব মানুষকে সমান নাগরিক মনে করে কিনা এবং তাদের প্রতি দেয়া সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব নিচ্ছে কিনা। নিচ্ছে না। তাহলে জাতি গঠন করলেই হচ্ছে না, অধিকার গঠনের মাধ্যমেই রাষ্ট্র গঠনকে বুঝতে হবে। তাহলে মৌলমন্ত্রের সংকট এবং অমিত সম্ভাবনা—ধারণ করেই বাংলাদেশের ৫৩ বছরের অগ্রগতিকে অবলোকন করতে হবে। প্রবণতাগুলোকে ধারণ ও ব্যবচ্ছেদ করতে হবে। সামনের বাংলাদেশের একটি পটভূমি তৈরি করতে হবে এবং একটি চিত্ররেখও ধারণ করতে হবে।
বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলা হতো, এখন অনেকে ‘উন্নয়ন বিস্ময়’ বলছেন। এ ফেনোমেনাকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
সম্প্রতি আমাদের একটি বই বের হয়েছে। তার মৌলিক অবদান হচ্ছে, বাংলাদেশকে ধারণ করার চেষ্টা হয়েছে। তা প্রচলিত বয়ানে ছিল না। কারণ বাংলাদেশকে বুঝতে গেলে তার স্বাধীনতার তিনটি মূলমন্ত্র; অর্থাৎ সমতা, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের যে বিমূর্ত ধারণা রয়েছে তা আন্তঃশাস্ত্রীয় কায়দায় অনুসন্ধান করতে হবে। অর্থাৎ রাজনীতির ও সমাজ পরিবর্তনের পঠন দরকার এবং তার প্রতিবেশ ও প্রকৃতিতে যে পরিবর্তনগুলো হচ্ছে সেগুলো ধারণ করা দরকার। অর্থনৈতিক বৈশিষ্ট্যগুলোর বড় ধরনের চারিত্রিক পার্থক্যকে নির্দিষ্টকরণ করা প্রয়োজন। আবার একই সঙ্গে এগুলোর দ্বান্দ্বিকতা ধারণ করা জরুরি। অর্থাৎ সংকটগুলো কোথায় আর সম্ভাবনার উৎসগুলো কোথায় আছে এবং যে অর্জন হয়েছে সেই অর্জনের চালিকাশক্তি কোথায় ছিল—আমরা ধারণ করার চেষ্টা করেছি। আমরা প্রথমে বিমূর্ত ধারণাগুলোকে মূর্ত করেছি এবং তার পরিমাপ করেছি, পরিমাণ করেছি এবং বয়ান তৈরি হয়েছে।
বৃহদাকার ক্যানভাসে পরিচালিত আপনাদের এ গবেষণার ফলাফল কী?
প্রথমত, লক্ষ করার বিষয় হচ্ছে মানবিক মর্যাদা। এখানে আমাদের দেখতে হবে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার কীভাবে গড়ে উঠেছে এবং তার সংকটগুলো কোথায়। অর্থাৎ জাতীয় সংসদ, তার শ্রেণী চরিত্র, পুঁজির পরিবর্তন কিংবা পুরুষের সঙ্গে নারীর সম্পর্ক বা মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্কের ক্ষেত্রে সংকট কোথায়। পাশাপাশি শক্তিগুলো—শিল্প, অভিবাসী আয় ইত্যাদি। শক্তিগুলো যেভাবে আসছে, চালকগুলো কাজ করছে, সেই চালকগুলোর মিথস্ক্রিয়া এবং নিজস্বতা গঠন জানা প্রয়োজনীয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য বা জলবায়ু পরিবর্তনের অনুসন্ধান দরকার। অর্থাৎ বিমূর্ত ধারণাগুলোকে মূর্ত করে তাকে সামনের দিকে আনা একটি কমপ্রিহেনসিভ ধারণা। এ সংশ্লেষণ করার ক্ষেত্রে একনিষ্ঠ থাকতে হবে, জানতে হবে সংকটগুলো কোথায়, সম্ভাবনাটা কোথায় আছে এবং তাহলেই দিকনির্দেশনার রাস্তাগুলো নির্দেশিত হবে।
এলডিসি বা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে যেভাবে উন্নয়নশীল দেশ হলাম, উন্নয়নশীল দেশ থেকে মধ্যম আয়ের বা উন্নত দেশ হওয়ার পথটি কি একই রকম?
বাংলাদেশ অমিত সম্ভাবনার দেশ। মনে রাখা দরকার, আমরা জনসংখ্যায় পৃথিবীর অষ্টম দেশ। জনসংখ্যাকে অনেক সময়ই দুর্বলতা হিসেবে, দেখা হয়েছে যা কোনোভাবেই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন পর্যবেক্ষণ নয়। মানুষকে মানুষ হিসেবেই দেখা দরকার এবং তার অমিত সম্ভাবনা সামনে নিয়ে যাওয়া দরকার। যদি প্রতিষ্ঠান ঠিকভাবে কাজ করে তাহলে বাংলাদেশ ২০৩৩ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হতে পারে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের অগ্রগতির মূল কারণগুলোর দিকে তাকলে দেখা যাবে, অগ্রগতির মূলে আমাদের দেশের মানুষ। সরকারের ভূমিকা তেমনভাবে লক্ষণীয় নয়। যদিও রাজনৈতিক নেতারা তাদের কথামালায় বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের ক্রেডিট নিয়ে থাকেন। যেমন মানুষ তাদের চেষ্টায় নিশ্চিত করেছে যে বাংলাদেশ রাষ্ট্র কখনই আর দুর্ভিক্ষ অবস্থার মধ্য দিয়ে যাবে না। গ্রামাঞ্চলে যারা বেকারত্বের জালে ছিল তারা তাদের পথ নিজেই খুঁজে নেয়ার চেষ্টা করেছে। নারী বিশাল আকারে শ্রমশক্তিতে যোগ দিয়েছে এবং অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। গ্রাম থেকে মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। সরকারি হিসাবে, প্রবাসীয় আয় প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে সব রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় আসে না। আনুষ্ঠানিকভাবে আসা প্রবাসী আয় যদি হিসাবে আনা যায়, তাহলে বাংলাদেশে প্রবাসী আয়ের পরিমাণ ৪৫ বিলিয়ন ডলারের কম নয়। প্রবাসী আয় বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির ব্যাপক পরিবর্তন ঘটিয়েছে। একইভাবে নারীর শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটিয়েছে। অর্থাৎ শ্রমশক্তি বাংলাদেশের অর্থনীতির পরিবর্তনের মূল চালক। যে অগ্রগতি ঘটেছে তার মূলে আছে বাংলাদেশের মেহনতি মানুষ। তবে মনে রাখা দরকার, আমাদের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধি ঘটেছে বিনিয়োগ থেকে নয়; ভোগ বাবদ ব্যয় থেকে। এ প্রবৃদ্ধির ধারা কোনোভাবেই টেকসই নয়।
আপনার গবেষণা বলছে, ১ ট্রিলিয়ন অর্থনীতি হতে হলে আমাদের আরো এক দশক অপেক্ষা করতে হচ্ছে। আমাদের প্রতিযোগী দেশ ইন্দোনেশিয়া এরই মধ্যে ১ ট্রিলিয়নের অর্থনীতি হয়ে গেছে। কিন্তু আমরা এখনো হতে পারিনি। আমরা আসলে কী মিস করেছি?
বাংলাদেশের অগ্রগতির চ্যালেঞ্জগুলো বোঝা দরকার। সার্বিক বা সম্পূর্ণ অথবা কমপ্রিহেনসিভভাবে বোঝা জরুরি। রাজনীতি এবং রাজনীতির সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক, যেগুলোকে প্রয়োজনীয় শর্ত বলে থাকি, তা যদি না দেখা হয়, তাহলে সম্পদগত বা উপকরণগত বৈশিষ্ট্যগুলোও ঠিকমতো বোঝা যাবে না। আর শুধু আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেই হবে না। অনানুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা দেখতে হবে। অর্থাৎ রেওয়াজ, রীতি এবং কীভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি পরিচালিত হয়—সেগুলোকে অনুসন্ধান করতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতি ১ ট্রিলিয়ন বা তার চেয়ে ওপরের দিকে যাবে, যদি আমাদের উৎপাদনের উপকরণ তথা শ্রমশক্তির যথোপযুক্ত ব্যবহার; ভূমি ব্যবস্থাপনা বা বড় আকারে বললে প্রপার্টি রাইটস নিশ্চিতকরণ; পুঁজির জোগান এবং কৃৎ-কৌশল বা প্রযুক্তির অভিযোজনের শর্ত অর্জিত হয়। এগুলোর যদি আমাদের এখানে যথোপযোগী ও সর্বোচ্চ ব্যবহার করা যায় তাহলে অগ্রগতি হবে। তবে কার্যকরী প্রতিষ্ঠান ছাড়া অগ্রগতি স্থবিরতায় আটকে যায় এবং নিম্নগামী হয়। বাংলাদেশে অর্থনীতি ও রাজনীতি নিয়ে আলোচনা বা অনুসন্ধান আলাদা করা হতো। কিন্তু বর্তমানে কোনো নীতি কৌশল প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন রাজনীতি ও অর্থনীতির মধ্যে বিভাজন করে অগ্রসর হওয়া কঠিন। এ কারণেই রাজনৈতিক অর্থনীতির আলোচনা সামনে এসেছে। রাজনৈতিক বন্দোবস্তের সঙ্গে অর্থনৈতিক বন্দোবস্তকে একসঙ্গে দেখা না যায়, তাহলে বাংলাদেশের অগ্রগতির যে সম্ভাবনা সবসময় বিরাজমান ছিল, সেই অগ্রগতি কেন টেকসই হচ্ছে না তা বোঝা যাবে না, আর বাংলাদেশে যে অগ্রগতি হয়েছে তা ভোগভিত্তিক। বিনিয়োগভিত্তিক হয়নি। কারণ বিনিয়োগ বা ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ করতে গেলে প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতার দরকার হয়। প্রতিষ্ঠানকে জনগণের পক্ষে কাজ করতে হয়। কিন্তু আমরা লক্ষ করেছি, অনানুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের কাজ করার স্বাধীনতার গতিকে রুদ্ধ করে হচ্ছে। মূলত প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। যার কারণে মানুষের যে আকাঙ্ক্ষা তা পূরণ হচ্ছে না। আর এ আকাঙ্ক্ষা পূরণ করার শর্তই হচ্ছে অধিকার অনুযায়ী রাষ্ট্র তৈরি করা।
অর্থনীতি দিয়ে সব অর্জন কি পরিমাপ করা যায়?
একটি বিষয় সূক্ষ্মভাবে বুঝতে হবে, ক্ষমতায়ন কিন্তু সমতায়ন নয়। যেমন বাংলাদেশের নারীরা শ্রমবাজারে যুক্ত হওয়ার কারণে নারীদের কাছে অর্থ গেছে। কিন্তু সহিংসতার মাত্রা অনেক বেড়ে গেছে। আর প্রতিষ্ঠানগতভাবেই সহিংসতা আসে। অর্থাৎ পিতৃতান্ত্রিকতা। এ কারণেই এক ধরনের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বা ক্ষমতা এলেই কিন্তু সমতায়ন ঘটে না। বিষয়টি পরিষ্কার থাকতে হবে।
বলা হয় অর্থনীতির সুফল সবাই পাচ্ছে না। বৈষম্য বাড়ছে। সেটা কীভাবে হচ্ছে তা যদি ব্যাখ্যা করতেন?
একদিকে প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়া হচ্ছে না। তার বিপরীতে বাংলাদেশে একটি বখরাভোগী সংস্কৃতি দাঁড়িয়েছে। রেন্টিয়ার বা বখরাভোগী সমাজ অর্থাৎ যারা অনর্জিত আয় ভোগ করছে তারা আমাদের রাজনৈতিক অধিকারকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। যেমন জ্বালানির ক্ষেত্রে দেখবেন একটি গোষ্ঠী মুনাফা ঘরে তুলছে। একই অবস্থা বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও। এটা ঠিক, ব্যবসায় আছেন এমন কারো সঙ্গে চুক্তি করলে তিনি তার লাভ নিশ্চিত করবেন। আর এটা নিশ্চিত করতে না পারলে তো তিনি বিনিয়োগ বাড়াতে পারবেন না। বিদ্যুতের ক্ষেত্রে সময় অনুযায়ী লোডের বা ব্যবহারের রকমফের হয়। তাহলে সর্বোচ্চ লোডের পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বা ক্যাপাসিটি থাকতে হবে। সর্বোচ্চ লোড পর্যন্ত দেয়া হলে ক্যাপাসিটি চার্জ ঠিক আছে। কিন্তু সর্বোচ্চ লোডের বাইরে যদি অর্থ দেয়া হয় তাহলে সেটা কিন্তু রেন্ট বা বখরা। এর মাধ্যমে অনর্জিত উপায়ে বিত্তশালী তৈরি হচ্ছে। যে পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জ দেয়া হয়, সে অনুযায়ী আমরা বিদ্যুৎ ব্যবহার করছি না। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর হিসাব অনুযায়ী, ১ লাখ কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দেয়া হচ্ছে। এর ৩৫ ভাগ আবার যাচ্ছে তিনটি কোম্পানির হাতে। এর অর্থ হচ্ছে ক্যাপাসিটি চার্জও কেন্দ্রীকরণ হচ্ছে।
কাম্য উন্নয়নের জন্য আমাদের কী করণীয়?
বাংলাদেশ যদি আধা শিল্পায়িত সমাজ থেকে মধ্যবর্তী অর্থনীতি ও উন্নত অর্থনীতির দিকে যেতে চায় তাহলে শিল্পায়ন দরকার। শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজন জ্বালানি নিরাপত্তা। আর জ্বালানি উপকরণ অনুসন্ধান করা হচ্ছে না। আমরা গ্যাস অনুসন্ধানে মনোযোগ দিতে উৎসাহিত করতে পারতাম। এতে আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকিতে পড়ত না। তা না করে বখরাভোগী সংস্কৃতি লালন করা হচ্ছে। আমদানিনির্ভরতার দিকে যাচ্ছে। রাষ্ট্র তাদের অর্থ দিতে পারছে না, কিন্তু একের পর এক চুক্তি করে যাচ্ছে। এসব না করে যদি জ্বালানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেত তাহলে এক পণ্যমুখী ব্যবস্থা বা পোশাক শিল্প খাত ব্যবস্থা থেকে অর্থনীতির বহুমুখীকরণ করা যেত। জ্বালানির নিশ্চয়তা থাকলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সক্ষমতা তৈরি হয় এবং নতুন নতুন প্রযুক্তিগত সংযুক্তিও ঘটে। এর মাধ্যমে অগ্রসর হওয়া যায় এবং সামনের দিকে যেতে পারতাম।
আরেকটি বিষয় মনে রাখা দরকার, থাইল্যান্ড বা অন্যান্য দেশ, যারা মধ্যম আয়ের দিকে গেছে, তারা কিন্তু একটা ফাঁদে পড়েছে। আর সামনে যেতে পারছে না। সেখান থেকেও শিক্ষণীয় বিষয় আছে। এর অর্থ হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনভাবে কাজ করা দরকার। সঙ্গে সঙ্গে বখরা সংস্কৃতি বিদায় করতে হবে। বখরা সংস্কৃতির মাধ্যমে তারা বখরা পাচ্ছে, আর এর কুপ্রভাব গিয়ে পড়ছে সাধারণ জনগণের ওপর। বারবার বিদ্যুতের দাম বাড়ছে। কিন্তু নতুন করে গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে আমদানিনির্ভরতা তৈরি হচ্ছে। চুক্তির দুর্বলতার কারণে জ্বালানির দাম তাদের ডলারে পরিশোধ করতে হচ্ছে। জ্বালানি নিরাপত্তা তৈরি হলে বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার যে অস্থিতিশীলতা, অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা তাও কমত। একদিকে বখরা সংস্কৃতি বিদ্যমান। অন্যদিকে উৎপাদনমুখী সংস্কৃতি বা বিনিয়োগ না থাকায় বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। যে কর্মসংস্থান হচ্ছে তা অনানুষ্ঠানিক খাতে। অনানুষ্ঠানিক খাতে কোনো অধিকার থাকে না। যখন বহিঃস্থ কোনো আঘাত আসে সেই আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা থাকে না। কভিড-১৯ মহামারীকালে আমরা লক্ষ করেছি যে অনানুষ্ঠানিক খাতে অধিকাংশ কর্ম নিয়োজন হওয়ায় বহিঃস্থ ধাক্কা সহ্য করার সক্ষমতা না থাকায় অনেক মানুষ দরিদ্রসীমার নিচে চলে গেছে। প্রলম্বিত ও দীর্ঘায়িত মূল্যস্ফীতি—এটাও বখরা সংস্কৃতির ফল। কারণ প্রতিষ্ঠান যদি কাজ করে না তাহলে রেগুলেশন কাজ করে না। আর বাজার তখনই কাজ করে যখন রেগুলেশন প্রতিপালিত হয়।
মরিচ, পেঁয়াজ কিংবা ব্যাংক, বিদ্যুৎ অবকাঠামো—সবক্ষেত্রেই বখরাভোগী সংস্কৃতি দাঁড়িয়েছে। এটা কয়েকটি গোষ্ঠীর মধ্যে আবার কেন্দ্রীভূতও হয়েছে। এর অর্থ অলিগার্কি তৈরি হয়েছে। এটা আবার নিচ পর্যন্ত আছে এবং ভাগাভাগি করার ব্যাপার আছে। এটা গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে। যাকে সাধারণ মানুষ সম্পদ ও পৃষ্ঠপোষকতা-নির্ভর সিন্ডিকেট বলে। জনসাধারণ থেকে শুরু করে সবার কাছে এক দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী বহুল ব্যবহৃত শব্দ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এক অনাকাঙ্ক্ষিত দুঃখজনক অধ্যায়ে সর্বজন নিপতিত হয়েছে।
শ্রুতলিখন: দিদারুল হক










