সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উদযাপন হচ্ছে আজ। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য: মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সকল প্রকার মানবাধিকারের চালিকাশক্তি। গণতন্ত্রের জন্য যেমন গণমাধ্যম দরকার, তেমনি গণমাধ্যমের আক্ষরিক অর্থে গণমাধ্যম হয়ে ওঠার জন্য দরকার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। গণমাধ্যমকে একটি রাষ্ট্রের দর্পণ বা আয়না হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই একটি রাষ্ট্রের উন্নতি, অগ্রগতি ও রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য পূরণে গণমাধ্যমের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।  বাংলাদেশের সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে উল্লেখ করা রাষ্ট্রপরিচালনার চারটি মূলনীতির মধ্যে একটি হলো গণতন্ত্র। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণই প্রধান। জনসাধারণের প্রতিক্রিয়াই নির্ধারণ করে দেশটি কীভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করাই গণতন্ত্র। ফলে গণতন্ত্রে নাগরিকদের ব্যক্তিত্ব বিকাশের যথেষ্ট সুযোগ ও স্বাধীনতা থাকে। গণতন্ত্র ও গণমাধ্যম একে অন্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। গণতন্ত্রকে শক্তিশালী ভিতের ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে হলে মুক্ত গণমাধ্যম তথা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। 

গণমাধ্যম সরকার ও জনগণের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করে রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করে। যেকোনো রাষ্ট্রে গণমাধ্যম গণমানুষের সারথিস্বরূপ। অসহায় মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, নীতির ত্রুটি প্রভৃতি বিষয় তুলে ধরে সমাধানের পথ ত্বরান্বিত করে গণমাধ্যম। আবার দুর্নীতি, অপরাধ, অবিচার তথা সমাজের নেতিবাচক দিকগুলোর বিরুদ্ধেও থাকে সোচ্চার। আর এ সোচ্চার হওয়ার মধ্য দিয়ে মানুষকে সংশোধনের পথ বাতলে দিয়ে একটি সুন্দর, নৈতিক ও মানবিক পৃথিবী গড়ে তোলাই গণমাধ্যমের অন্যতম লক্ষ্য। একমাত্র স্বাধীন গণমাধ্যমই বা গণমাধ্যমের স্বাধীনতাই এ লক্ষ্য অর্জনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। ১৯৯৩ সালের ৩ মে প্রথমবারের মতো বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস পালিত হয়। এরপর প্রতি বছরই এ দিনটি বিশ্বব্যাপী উদযাপিত হয়ে আসছে। কিন্তু গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সঙ্গে গণমানুষের অধিকারের সম্পর্ক খুঁজতে গেলে তাকাতে হবে সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের দিকে। ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর ফ্রান্সের প্যারিসে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে এ ঘোষণা দেয়া হয়। এ ঘোষণাপত্রের ১৯তম ধারায় বলা হয়েছে, ‘প্রত্যেক মানুষেরই মতামত পোষণ ও মতামত প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার রয়েছে। অবাধে মতামত পোষণ এবং রাষ্ট্রীয় সীমানা নির্বিশেষে যেকোনো মাধ্যমে ভাব ও তথ্য জ্ঞাপন, গ্রহণ ও সন্ধানের স্বাধীনতাও এ অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য গণমাধ্যম আজ নানামুখী চাপ ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।’

গণমাধ্যমের একটি শক্তিশালী কাঠামো হচ্ছে গণমাধ্যম মানুষের বন্ধু। গণমাধ্যম অপরাধী, অন্যায়কারী ও দুষ্টুজনের জন্য আতঙ্কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া একটি সংশোধনকারী মাধ্যমও। তাই স্বাধীন বা নিরপেক্ষ গণমাধ্যম মানেই জনসাধারণের পক্ষে তাদের অব্যক্ত কথাগুলো বলার একটি বড় মাধ্যম। কিন্তু গণমাধ্যমের সার্বিক অবস্থার দিকে তাকালে এর উল্টো চিত্রই চোখে পড়ে। বিশ্বব্যাপী প্রেস ফ্রিডমের অবস্থা নিয়ে ইউনেস্কোর রিপোর্ট বলছে, ২০১৬ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ৪৫৫ জন সাংবাদিককে তাদের কাজের কারণে খুন হতে হয়েছে। ২০১৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সর্বাধিক সাংবাদিক খুনের ঘটনা ঘটেছে মেক্সিকোতে।

তার পরেই আছে আফগানিস্তান ও সিরিয়ান আরব রিপাবলিক। ২০২১ সালে ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে ১৫২ নম্বরে। সাংবাদিকতার জন্য যে দেশগুলোকে খারাপের তালিকায় ফেলা হয় তার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ, ব্রাজিল, রাশিয়া ও মেক্সিকোর মতো দেশ। ১৮০ দেশের তালিকায় সবার ওপরে রয়েছে নরওয়ে। তারপরে আছে ফিনল্যান্ড, সুইডেন ও ডেনমার্কের নাম। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নেপাল ১০৭, শ্রীলংকা ১২৭ ও মিয়ানমার ১৪০ নম্বরে রয়েছে অর্থাৎ এই তিন প্রতিবেশী দেশের র‍্যাংকিং বাংলাদেশ থেকে ভালো। 

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও নানাবিধ আইনি প্রতিবন্ধকতা আছে, যা স্বাধীন সাংবাদিকতার সহায়ক নয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন তেমন একটি আইন, যেটি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অপপ্রয়োগ হতে দেখা যাচ্ছে। কোনো রাষ্ট্র যদি নিজেকে গণতান্ত্রিক দাবি করে, তবে সেখানে গণমাধ্যমের একশ ভাগ স্বাধীনতা থাকতেই হবে। যে গণমাধ্যম সরকারের সমালোচনা করবে, সেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আবার সেই সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে। জনসাধারণের কথাই উঠে আসে গণমাধ্যমে। তাই এ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। গণমাধ্যম মানুষের জন্য তথ্যের বৃহত্তর প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে। সরকারের সমালোচনার মধ্য দিয়ে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়, এতে গণমাধ্যমের ভূমিকাই সর্বাধিক।

গণমাধ্যম হলো একটা জাতির ভিত্তি। আর এ ভিত্তি মজবুত রাখতে প্রয়োজন এর নিরপেক্ষতা, সত্য প্রকাশের স্বাধীনতা। গণমাধ্যম ও সাংবাদিকের মূল বৈশিষ্ট্য হলো নীতি ও নৈতিকতা। গণমাধ্যম ও সাংবাদিককে তার নীতি ও নৈতিকতার প্রশ্নে সবসময় অটল থাকতে হবে। আমরা আশা করি, গণমাধ্যমগুলো সংবাদ ও সাংবাদিকতার সব নিয়মনীতি মেনে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব ধরনের ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্রের সঠিক ও সত্য চিত্র তুলে ধরে গণমাধ্যমের প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণে সফল হবে এবং সরকার তাদের সে স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে। নিশ্চিত করতে হবে সাংবাদিকদের সার্বিক নিরাপত্তা। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে গণমাধ্যম একটি রাষ্ট্রের শান্তি প্রতিষ্ঠা, ন্যায়বিচার, টেকসই উন্নয়ন ও মানবাধিকার রক্ষার এক অবিচ্ছেদ্য সহায়ক অংশীদার। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও বস্তুনিষ্ঠতা ব্যতীত একটি সমাজ বা রাষ্ট্রের সুষম উন্নয়ন কখনই সম্ভব নয়। তাই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও বস্তুনিষ্ঠতা নিশ্চিতকরণে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। 

অন্যের মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা জনগণের একটি মৌলিক অধিকার। বাংলাদেশের সংবিধানের ধারার ৩৯(১)-এ চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হয়েছে এবং ৩৯(২)-এ সংবাদপত্র তথা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে। যেখানে গণমাধ্যম যত বেশি শক্তিশালী, সেখানে গণতন্ত্র তত বেশি শক্তিশালী। গণমাধ্যমের সঠিক চর্চা যেমন গণতন্ত্র রক্ষা করতে পারে, তেমনি প্রকৃত গণতন্ত্র পারে গণমাধ্যমকে স্বাধীন রাখতে। স্বাধীন গণমাধ্যম যেকোনো সরকারের সেরা বন্ধু। মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে একটি দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সূচক হিসেবে ধরা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের মতে, জনসাধারণের জন্য, জনসাধারণের দ্বারা পরিচালিত এবং জনসাধারণের সরকারই হলো গণতন্ত্র। আর গণমাধ্যমের কাজ হলো এ জনগণের বার্তা নিরপেক্ষ ও নির্ভুলভাবে সরকারের কাছে তুলে ধরা। একটি দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আছে কি নেই এবং নাগরিকের চিন্তার স্বাধীনতা আছে কি নেই, তা দিয়ে সহজেই গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি পরিমাপ করা সম্ভব। অমর্ত্য সেন বলেছেন, ‘সংবাদমাধ্যমের লাগাম টানার ফলে যেসব তথ্য সুপ্ত হয়ে যায়, তা একনায়কতান্ত্রিক সরকারকেই ভুল পথে চালিত করে। এটা অবশ্যই সত্য যে সংবাদমাধ্যমের ওপর বিধিনিষেধ কেবল নাগরিকদেরই অন্ধকারে রাখে না, সরকারের কাছেও অতি জরুরি তথ্য পৌঁছাতে দেয় না। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের একটি স্তম্ভ। এই স্তম্ভকে যত মজবুত করা যাবে দেশ পরিচালনা ততই স্বচ্ছ হবে। গণতন্ত্র আর প্রশ্নবিদ্ধ হবে না। ফলে গণমাধ্যমের সমন্বয়হীনতা রোধ করা জরুরি। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারলেই গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে।’