উচ্চশিক্ষায় বাংলাদেশের অবস্থান এখনো পিছিয়ে রয়েছে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মতো শিক্ষা খাতে অগ্রগতির লক্ষ্যে বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল গঠন করা হয়। তবে এ কাউন্সিল প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছর অতিবাহিত হলেও মূল লক্ষ্য বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। শুধু কর্মশালা আয়োজনের মধ্যেই কাউন্সিলের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

বণিক বার্তায় প্রকাশ, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোয় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান ও সক্ষমতার স্বীকৃতি হিসেবে অ্যাক্রেডিটেশন সনদের প্রচলন রয়েছে। বাংলাদেশেও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অ্যাক্রেডিটেশনের আওতায় আনার লক্ষ্যে ২০১৮ সালের আগস্টে বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রতিষ্ঠার পর পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি কোনো অ্যাক্রেডিটেশন সনদ দিতে পারেনি। কাউন্সিলের গত পাঁচ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠার পর প্রথম অর্থবছর ২০১৮-১৯-এ কাউন্সিলের কার্যক্রম তেমন একটা এগোয়নি। এর পরের চার অর্থবছরে কর্মশালা আয়োজন ও নিয়োগ প্রক্রিয়ার মধ্যেই কাউন্সিলের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ ছিল। এ সময়ে কাউন্সিল মোট ১৩৫টি কর্মশালা আয়োজন করেছে। বিভিন্ন সময়ে এসব কর্মশালার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অ্যাক্রেডিটেশন গ্রহণে আগ্রহী ও প্রস্তুত করে তোলার কথা বলা হয়েছে। এখন পর্যন্ত কয়েকটির পক্ষ থেকে অ্যাক্রেডিটেশন গ্রহণের আগ্রহও প্রকাশ করা হয়েছে। যদিও এখনো এর মধ্যে একটিকেও কাউন্সিল অ্যাক্রেডিটেশন দিতে পারেনি। 

বস্তুত পর্যাপ্ত সক্ষমতার অভাবেই কাউন্সিল এখনো কোনো অ্যাক্রেডিটেশন সনদ বিতরণ করতে পারেনি বলে শিক্ষা খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। যদিও কাউন্সিল সদস্যদের দাবি, দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অ্যাক্রেডিটেশন সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণার অভাব, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দক্ষ লোকবলের অভাবে তাদের কার্যক্রম ধীর হয়ে পড়েছে। 

কাউন্সিলের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন পর্যন্ত ৪৩টি প্রোগ্রাম অ্যাক্রেডিটেশনের জন্য আবেদনের আগ্রহ প্রকাশ করেছে ১১টি বিশ্ববিদ্যালয়। এ নিয়ে ১২টি বিশেষজ্ঞ কমিটি হয়েছে। উল্লিখিত সময়ের মধ্যে কাউন্সিলের প্রতিনিধিরা চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সশরীরে ভ্রমণ করেছেন। অনলাইনে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। আগ্রহ প্রকাশকারী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর বাইরে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক সূত্রে জানা গেছে, অ্যাক্রেডিটেশন গ্রহণের চিন্তাভাবনা ও আগ্রহ থাকলেও কাউন্সিলের সক্ষমতা নিয়ে সংশয় থাকায় তারা আবেদন করতে পারছেন না। 

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল আইন-২০১৭ অনুযায়ী ২০১৮ সালের ৯ আগস্ট বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা করা হয়। একই বছরের ২৬ আগস্ট জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. মেসবাহউদ্দিন আহমেদকে কাউন্সিলে প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। এরপর কাউন্সিলের পূর্ণকালীন সদস্য, খণ্ডকালীন সদস্য ও সচিব নিয়োগসহ কাউন্সিল পূর্ণাঙ্গ করতেই প্রায় দেড় বছর সময় অতিক্রম হয়ে যায়।

অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল আইন-২০১৭-এর ১০ ধারায় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গুণগতমান নিশ্চিতে কনফিডেন্স সার্টিফিকেট বা ক্ষেত্রবিশেষে অ্যাক্রেডিটেশন সনদ প্রদান, স্থগিত বা বাতিল করাকে কাউন্সিলের দায়িত্ব হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এছাড়া যেসব কার্যক্রমের কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও এর আওতাধীন একাডেমিক কার্যক্রমের অ্যাক্রেডিটকরণ, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক ডিসিপ্লিনের জন্য পৃথক অ্যাক্রেডিটেশন কমিটি গঠন, সনদপ্রাপ্তির শর্তাবলি নির্ধারণ, শুনানির ভিত্তিতে তা বাতিল বা স্থগিত করা, সংশ্লিষ্টদের উৎসাহ দিতে কর্মশালাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজন, অ্যাক্রেডিটেশনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ব্যবস্থা করা ইত্যাদি।

কাউন্সিলের কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গ রূপে শুরু হলে দেশে উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে সংশয়ের জায়গাগুলো দূর হবে বলে শিক্ষাবিদরা আশা করছেন। কিন্তু গত পাঁচ বছরে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে কাউন্সিলের কার্যক্রম শুধু বিভিন্ন কর্মশালা আয়োজনে সীমাবদ্ধ ছিল। কাউন্সিলের পক্ষ থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১২টি, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৬১, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪৫ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৭টি কর্মশালার আয়োজন করা হয়। এর আগে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে কোনো কর্মশালার আয়োজন করা হয়নি। যদিও কাউন্সিলের প্রথম সভায় এ পাঁচ বছরের মধ্যে বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠন এবং আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোকে অ্যাক্রেডিটেশন দেয়ার সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। 

এভাবে কর্মশালা কাউন্সিলের রুটিন কাজে পরিণত হলেও মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। এমনকি প্রতিষ্ঠানগুলোকে অ্যাক্রেডিটেশন নেয়ায় আগ্রহী করে তুলতে কর্মশালায় জোর দেয়া হলেও তার ফল দেখা যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে পদ্ধতিগত কারণে সময়ক্ষেপণ হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দাবি করছে। প্রতিষ্ঠানটি দক্ষ জনবলের অভাবের কথাও বলছে। সবচেয়ে বড় কথা কাউন্সিল অ্যাক্রেডিটেশনের কাজ করতে পারছে না, এটি মোটেও প্রত্যাশিত নয়। কারণ অ্যাক্রেডিটেশন দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু না হলে এসব কর্মশালা রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হিসেবেই গণ্য হবে। কাউন্সিলের ভাষ্যমতে, অ্যাক্রেডিটেশনের আবেদনের জন্য আগ্রহ প্রকাশকারী বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষজ্ঞ কমিটি এবং কাউন্সিলের পক্ষ থেকে পরিদর্শনকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার যে বর্ণনা দেয়া হয়েছে আমরা তাতে আশাবাদী হতে চাই। আমরা প্রত্যাশা করব বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল অতিদ্রুত তার মূল কাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম হবে। এক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতাসহ যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, তা দূর করতে পদক্ষেপ নেয়া হোক।