বছরব্যাপী বিদ্যুৎ নেয়া হোক কিংবা না হোক বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে ভাড়া বাবদ বড় অংকের অর্থ দিতে হয়েছে সরকারকে। এ রকম অসম ও জনস্বার্থবিরোধী চুক্তির কারণে বিদ্যুৎ বিল দিন দিন বাড়ছে। বিদ্যুতে সরকারের বড় অংকের ব্যয় হ্রাসে যত দ্রুত সম্ভব চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসা উচিত। অন্তত বেসরকারি রেন্টাল কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে চুক্তি নবায়ন সময়ের দাবি। বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়াতে গিয়ে গোষ্ঠীস্বার্থ প্রাধান্য দেয়ায় নাগরিকদের এ ব্যয়ভার বহন করতে হচ্ছে।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, বর্তমান সরকারের তিন মেয়াদে দেশের বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে ভাড়া (ক্যাপাসিটি চার্জ/রেন্টাল পেমেন্ট) বাবদ ১ লাখ ৪ হাজার ৯২৬ কোটি ৮১ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। জাতীয় সংসদে গতকাল গণফোরামের সংসদ সদস্য মোকাব্বির খানের এক প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ এ তথ্য জানিয়েছেন।
বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ জানান, ৮২টি বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের (আইপিপি) মধ্যে ৭০টিকে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে। ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত (৩০ জুন ২০২৩) পরিশোধ করা হয়েছে ৭৬ হাজার ২৪২ কোটি ৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ক্যাপাসিটি চার্জ পেয়েছে বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি। বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিকে গত সাড়ে ১৪ বছরে দেয়া হয়েছে ৭ হাজার ৪৫৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা।
সংসদ সদস্য মোকাব্বির খানের প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রীর দেয়া তথ্যানুযায়ী, সর্বোচ্চ চার্জ পাওয়া অন্যান্য আইপিপি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মধ্যে মেঘনা পাওয়ার লিমিটেডকে ৫ হাজার ৪৭৫ কোটি ১২ লাখ, রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডকে ৪ হাজার ৪ কোটি ৮ লাখ, সামিট মেঘনাঘাট পাওয়ার লিমিটেডকে ৩ হাজার ৬৪৪ কোটি ৩৯ লাখ, সেমক্রপ এনডব্লিউপিসি লিমিটেডকে ২ হাজার ৮২৩ কোটি ৬৬ লাখ, এপিআর এনার্জিকে ২ হাজার ৭৮৮ কোটি ৪ লাখ, সামিট বিবিয়ানা পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডকে ২ হাজার ৬৮৩ কোটি ৩ লাখ, হরিপুর পাওয়ার লিমিটেডকে ২ হাজার ৫৫৭ কোটি ৬৩ লাখ, ইউনাইটেড আশুগঞ্জ এনার্জি লিমিটেডকে ২ হাজার ৩৭৬ কোটি ৬৪ লাখ ও বাংলা ট্র্যাক পাওয়ার ইউনিট-১ লিমিটেডকে ২ হাজার ৮৫৩ কোটি ২২ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে।
বেসরকারি কুইক রেন্টাল ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে থাকুক বা না থাকুক, চুক্তি অনুসারে কেন্দ্রভাড়া পায় সরকারি-বেসরকারি প্রতিটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র, যাকে ক্যাপাসিটি চার্জ বলা হয়। সরকার ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মালিকদের যুক্তি হলো, কেন্দ্রভাড়া না দিলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী হবে না। তাদের আরেকটি যুক্তি হলো বাসা ভাড়া নিয়ে সেখানে কেউ না থাকলেও ভাড়া দিতেই হয়। অন্যদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিপুল সক্ষমতা তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু ততটা বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় না। ফলে সবসময়ই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের একাংশকে বসিয়ে ভাড়া দিতে হয়।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যাপক উৎসাহ দেয়া হয়। তখন থেকে এ খাতে দেশী বিনিয়োগ বাড়ে। সব মিলিয়ে এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের মতো, যদিও বিদ্যুতের চাহিদা থাকে ১৫ হাজার মেগাওয়াটের নিচে। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ায় সারা দেশে সংযোগ দেয়া সম্ভব হয়। পাশাপাশি লোডশেডিং প্রায় বিদায় নিয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে যথেষ্ট জ্বালানি আমদানি করতে না পারায় লোডশেডিং করতে হয়। আরেকটি দিক হলো চাহিদা পুরোটা পূরণ করতেও এত বেশি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দরকার নেই।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদনে থাক আর অলস থাক—দুই ক্ষেত্রেই কেন্দ্রভাড়া থাকে। সংসদে যে হিসাব দেয়া হয়েছে, তাতে বসিয়ে কেন্দ্রভাড়া কত টাকা দেয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। খুব কম সময় চালিয়ে সারা বছর ধরে বিদ্যুৎ কেন্দ্র ভাড়া দেয়া অযৌক্তিক বলে মনে করছেন তারা।
এত বড় অংকের ভাড়া গোনার পরও গত অর্থবছরে পল্লী বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নিট লোকসান ২ হাজার ৫৬৩ কোটি টাকা। এ সময়ে ডেসকোর নিট লোকসান ২২৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। একই অর্থবছরের নয় মাসে ডিপিডিসির কর-পরবর্তী লোকসান হয়েছে ৪৬ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। কুইক রেন্টালকে বড় অংকের ক্যাপাসিটি চার্জ দেয়ার কারণেই সরকারের ব্যয় বড় আকারে বাড়ছে এবং এ পরিষেবা খাত লোকসানি হিসেবে দেখা দিয়েছে।
বর্তমানে দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ২৮ হাজার ১৩৪ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ১ হাজার ১৯৫ মেগাওয়াট উৎপাদন হচ্ছে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, ২০৪১ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদনের ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে আশানুরূপ অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। মাত্র ৩-৪ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। কুইক রেন্টালে বড় অংকের অর্থ না ঢেলে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ব্যয় করা এখন সবচেয়ে যৌক্তিক বিকল্প।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিতে সরকারকে বড় অংকের অর্থ ব্যয় করতে হয়। সেপ্টেম্বর নাগাদ এলএনজি আমদানি ব্যয় মেটাতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে ৭ হাজার ১৮১ কোটি টাকার ঋণ চেয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি পেট্রোবাংলা। অর্থ সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানটি গত মে মাসের শেষ সপ্তাহে একটি চিঠি দেয় মন্ত্রণালয়কে। চিঠিতে ২০১৮ সাল থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত ২৫ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা লোকসানের কথা উল্লেখ করে বলা হয়, এলএনজি আমদানি ব্যয় নির্বাহে বর্তমানে তাদের এ ঋণ প্রয়োজন।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের ব্যয় বহুমুখী। শুরুতে এলএনজি আমদানিতে বড় অংকের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয় এবং এতে লোকসানি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়িয়েছে পেট্রোবাংলা। এদিকে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে ক্যাপাসিটি চার্জ দেয়ার কারণেও গুনতে হয় বড় অংকের টাকা। উভয়মুখী ব্যয়ের দায়ভার পোহাতে হয় রাষ্ট্র ও নাগরিককে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর দেয়া, নতুন তেল ও গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগ করা এবং যতটুকু বিদ্যুৎ নেয়া হয়েছে সে অনুযায়ী কুইক রেন্টালকে অর্থ দেয়ার নতুন চুক্তি করা জরুরি হয়ে পড়েছে।










