কৃষি ও প্রাণ-প্রকৃতি পরিবেশের একে অন্যের অবিচ্ছেদ অংশ ও সহায়ক। ভালো পরিবেশের ফলে কৃষিও ভালো হয়। যেমন গাছ থেকে পাতা পড়ে, সেটি জমিকে উর্বর করে। প্রকৃতপক্ষে এরা একে অন্যের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। একটিকে বাদ দিয়ে আরেকটা হবে না। প্রকৃতপক্ষে কৃষির সফলতা নির্ভর করে প্রাণ-প্রকৃতির ওপর। অতএব প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষা করা যেমন মানুষের দায়িত্ব, তেমনি খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোও মানুষের দায়িত্ব।

১৯৬০ সালে পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিল ৩ বিলিয়ন। বর্তমানে তা ৮ বিলিয়ন ছাড়িয়েছে। ১৯৭০ বা ’৭১ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল ৭০ মিলিয়ন বা সাত কোটি। বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৭০ মিলিয়ন বা ১৭ কোটি। বাংলাদেশে জনসংখ্যা বেড়ে আড়াই গুণ হয়েছে। আমার আগে এক বক্তা বলে গেছেন, ১০ হাজার বছর ধরে আমাদের কৃষিনির্ভর সমাজ। ১০ হাজার বছরে কৃষির উৎপাদন বেড়েছে। কিন্তু সেটি প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ছিল না। কৃষি উৎপাদন দুইভাবে বাড়ানো যায়। জমি বাড়িয়ে ও একই জমিতে বেশি ফসল উৎপাদন করে। এটি কোনো ম্যাজিকের বিষয় নয়।

যতদিন পৃথিবীতে বন-জঙ্গল বেশি ছিল, মানুষ বন-জঙ্গল কেটে জমি বাড়িয়েছে। এখন আর কাটার সুযোগ নেই। বন-জঙ্গল কাটলেই এখন পরিবেশবাদীরা আন্দোলন শুরু করে। সুতরাং বন-জঙ্গল কাটা যাবে না। এখন আমাদেরকে একই জমিতে উৎপাদন বাড়াতে হবে। অর্থাৎ উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর মাধ্যমে কৃষির মোট উৎপাদন বাড়াতে হবে। দিনের পর দিন শুনে আসছি আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পন্ন। এখন আমাদের বোঝা উচিত, কোন খাদ্যে আমরা স্বয়ংসম্পন্ন? এটি কি শুধু চাল? যদি চালই হয় তাহলে শুধু গত অর্থবছর আমরা চাল আমদানি করিনি। এটি সুখবর। কিন্তু তার আগের তিন আর্থিক বছরে গড়ে ১১-১৪ লাখ টন চাল আমদানি করতে হয়েছে। এরপর গম ও ভুট্টা। যদিও এ দেশের মানুষ ভুট্টা তেমন খায় না। প্রতি বছর আমাদের ৯০ লাখ টন গম লাগে। যদিও সরকার দাবি করে, আট লাখ টন গম উৎপাদন করে। তবে আমি মনে করি, দেশে তিন লাখ টনের বেশি গম উৎপাদন হয়। দেশে ভুট্টার চাহিদা আট-নয় লাখ টন, আর উৎপাদন করি ছয় লাখ টন। এখন ভুট্টা যদি ঠিকমতো উৎপাদন না করা হয় তাহলে মাছ, পোলট্রি, ডিম বা প্রাণিসম্পদ সঠিকভাবে পাওয়া যাবে না। চাল, গম ও ভুট্টা একে অন্যের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কিন্তু আমাদের দেশে সরকারের পলিসিতে চাল উৎপাদনে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়।

১৯৬০ সাল পর্যন্ত খুব একটা বেশি খাদ্য উৎপাদনশীলতা বাড়েনি। কিন্তু ১৯৬০-৭০ সালের দিকে বিজ্ঞানী নরমেন বোরলগের নেতৃত্বে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর একটি বড় বিপ্লব হয়েছিল, যেটিকে বলা হয় সবুজ বিপ্লব। তখন আমাদের খাদ্যের উৎপাদনশীলতা ৫-৬ শতাংশ বেড়ে গেছে। অন্যথায় ১০ হাজার বছর ধরে জনসংখ্যা বেড়েছে ২ শতাংশ করে এবং খাদ্য উৎপাদনও বেড়েছে প্রায় দেড়-দুই শতাংশ করে। উৎপাদন বাড়ানোর জন্য সবুজ বিপ্লব খুবই সাধারণ জিনিস। উৎপাদন বাড়াতে বেশি পানি, ভালো বীজ, বেশি সার ও কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে। এ চার উপাদানের সমন্বয় হলো সবুজ বিপ্লব। যদিও বীজের ডেভেলপ করা হয়েছে। এখন দেখা গেল, জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে। এতে খাদ্যের সমস্যা হয়নি। খাদ্য সমস্যা প্রকট হয়েছে ২০০৮ সালে। তখন দেখা গেছে, পৃথিবীতে গড়ে যেখানে ১০০ দিনের খাদ্য মজুদ থাকার কথা, সেখানে মজুদ ছিল মাত্র ৩০ দিনের খাদ্য। হঠাৎ খাদ্যের দাম বেড়ে গেছে, তখন সবাই বুঝতে পেরেছে, খাদ্যনিরাপত্তার অভাব হয়ে গেছে। তখন সবাই নতুন প্রযুক্তি নিয়ে চিন্তাভাবনা করেছে। এর আগে ১৯৬০-২০১০ সাল পর্যন্ত কৃষিতে তেমন কোনো প্রযুক্তিগত উন্নয়ন হয়নি। এখন নতুন প্রযুক্তি এসেছে। যেমন প্রাণপ্রযুক্তি। এছাড়া জেনেটিক্যালি মডিফায়েড অর্গানিজম (জিএমও)। জিএমও যুগ চলে গেছে। নতুন প্রাণপ্রযুক্তি এসেছে, যার নাম ক্রিস্পার জিন এডিটিং। আমি মনে করি, প্রাণপ্রযুক্তির মাধ্যমে আগামীতে কৃষি বিপ্লব ঘটবে। সেখানে খাদ্যের উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং খাদ্য উৎপাদন অনেক বেড়ে যাবে।

আমাদের জমি বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। আমাদের জমি কম। কারণ নগরায়ণ বাড়ছে। শিল্পায়ন বাড়ছে। অনেক নদীভাঙন আছে, কিন্তু আমাদের আবার চরও ওঠে। এখন সরকার কতটুকু পরিসংখ্যান রাখে, সেটা সরকার জানে। কত জমি নদীভাঙনে বিলীন হচ্ছে এবং নতুন চর উঠছে তার সঠিক পরিসংখ্যান দরকার। আমরা বারবার বলি জমির পরিমাণ কমছে। আবার আমাদের নতুন নতুন আইল্যান্ড আছে। এটা আমাদের নদীতে আছে। এটা আমাদের সাগরেও আছে। এগুলো আমরা কৃষিতে ব্যবহার করতে পারি।

এখন কৃষি উৎপাদনে সমস্যাগুলো বলব। যখন জনসংখ্যা বাড়ে তখন কৃষি উৎপাদন বাড়াতে হয়। কৃষি উৎপাদনের চেয়েও একটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হলো, মানুষের জীবনমান উন্নয়ন হলে মানুষের খাদ্যের অভ্যাস পরিবর্তন হয়। আমি মনে করি, ২০০৮ সালে খাদ্যের দাম তিন গুণ বেড়ে যাওয়ার কারণ ছিল খাদ্যের প্রাপ্যতা ছিল না এবং ভারত ও চীনে মধ্যম শ্রেণী বেড়ে যায়। ফলে তাদের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন হওয়ায় খাদ্যের চাহিদা বেড়ে গিয়েছিল। এ কারণে সে সময় খাদ্যের দাম বেড়ে গিয়েছিল। এখন ধীরে ধীরে মানুষের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কোন ফসল উৎপাদন করতে হবে সেটিও নির্ধারণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পানির সমস্যা। কেউ বলতে পারবে না, ভবিষ্যতে পানির সমস্যা হবে না। এখনই হচ্ছে। কোনো সময় বৃষ্টি বেশি, কোনো সময় বৃষ্টি কম হচ্ছে। বৃষ্টি বেশি হলে সমস্যা নেই। কিন্তু বৃষ্টি যখন কম হয় তখন পানির সমস্যা সৃষ্টি হয়। নদীর পানির প্রবাহ কমে যাচ্ছে। তৃতীয়ত, পানি যখন কমে যায় আবার নিচু পানির স্তর নিচে নেমে যায়। যারা কৃষিকাজে জড়িত তারা বলতে পারবেন, পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় প্রতি বছরই নলকূপ ভূপৃষ্ঠ থেকে ১০-১২ ফুট নিচে নামাতে হয়। তা না হলে পানি ওঠে না।

তেল ও গ্যাসের দামও এখন কৃষকের নাগালের বাইরে। যদিও আমাদের দেশে সরকার ভর্তুকি দেয়। জ্বালানি ব্যয়ের সঙ্গে কৃষি পণ্য উৎপাদন খরচ সম্পৃক্ত। যখনই জ্বালানি ব্যয় বাড়বে তখনই কৃষি উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। আমরা সমুদ্র থেকে সবচেয়ে বেশি পাই মাছ। যদিও হাওর-বাঁওড় ও নদীনালা থেকেও সামান্য মাছ পাওয়া যায়। সামুদ্রিক মাছ মানুষ এত খায় না। তার পরও সামুদ্রিক মাছও দিন দিন কমে যাচ্ছে। এর মূল কারণ হচ্ছে, তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় সমুদ্রের পানির উপরিভাগ গরম থাকায় মাছ বেশি ওপরে আসতে পারে না। ওপর থেকে নিচে খাবার দেয়া যায় না। এখন এ সমস্যাগুলো একত্র করলে আমাদের মাছের উৎপাদনও দিন দিন কমে যাবে। এরপর আমরা প্রযুক্তিনির্ভর। কিন্তু আমরা উৎপাদন না বাড়ালে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো যাবে না। এটি খাঁটি সত্য কথা। প্রতি বছর আমাদের জনসংখ্যা বাড়ছে ১ দশমিক ৩ শতাংশ করে। এ অবস্থায় যদি আমরা খাদ্য উৎপাদন না বাড়াতে পারি তাহলে অনেক সমস্যার সৃষ্টি হবে।

জলবায়ু পরিবর্তন একদিনে হয় না। এ পরিবর্তনের জন্য বছরের পর বছর লাগে। কিন্তু খাদ্য উৎপাদন যদি বাড়াতে না পারি তাহলে সংকট তৈরি হবে। সুতরাং আমরাও বুঝি, পরিবেশকে সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। এটাও আমি বুঝি, কৃষি ও প্রাণ-প্রকৃতি একে অন্যের সহায়ক ও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। অতএব দুটি একসঙ্গে সামলানো সম্ভব নয় অনেক সময়। এখন জমিতে কৃষক ধান চাষ করছেন। ধান কোনো রোগে আক্রান্ত হলে তিনি কীটনাশক না দিয়ে পারবেন না। কারণ কীটনাশক না দিলে রোগে ধান নষ্ট হয়ে গেলে খাদ্য উৎপাদন দূরের কথা, কৃষকই মারা যাবেন। কারণ কৃষকের বিকল্প কোনো বিনিয়োগ নেই। তিনি ধান চাষেই বিনিয়োগ করেছেন। এটাকে সমন্বয় করা সাধারণত সহজ নয়। যেকোনো সমাজ-মানুষের জীবনমান উন্নত করতে চাইলে খাদ্যনিরাপত্তা যেমন জরুরি, স্বাস্থ্যনিরাপত্তাও তেমনই জরুরি। তবে প্রত্যেকের জীবন মান একসঙ্গে উন্নত করতে এক ধরনের পলিসি নেয়া উচিত।

কৃষি খাতের জন্য ব্যাংক ঋণ সহজলভ্য করা উচিত। আমাদের প্রতিবেশী দেশে ওয়েদার ইন্স্যুরেন্স আছে। ৩৪ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের ওপর তাপমাত্রা গেলে তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কিছু ক্ষতিপূরণ পান। কারণ ওই তাপমাত্রায় ফসলের উৎপাদনশীলতা কমে যায়। আমাদের দেশে এগুলো কিছুই নেই। পণ্যের দাম বাড়লে আমরা কৃষকের দোষ দিই। ব্যবসায়ীদের দোষ দিই। এত দোষ দিয়ে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। আমি মনে করি, দেশে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। যেহেতু আমাদের জমি কম, তাই আমাদের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। উৎপাদনশীলতা বাড়াতে যে ধরনের প্রযুক্তি দরকার সেগুলোর ব্যবহার করতে হবে।

আমরা প্রযুক্তি আবিষ্কার করতে পারি না। কিন্তু আমাদের যে সমাজ রয়েছে সে প্রযুক্তি ব্যবহার করারও জ্ঞান নেই। অন্যান্য দেশে যখন আমরা যাই তখন দেখি, সে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, সে দেশের সরকারি গবেষণা কার্যক্রম ও বেসরকারি একাধিক কার্যক্রমকে একত্রীভূত করে সীমিত সম্পদের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়। আমরা বাড়িতে শাকসবজির চাষাবাদ করি। সেজন্য উন্নত জাতের বীজ আনতে একদিন মন্ত্রণালয়ে গিয়েছিলাম। তারা আমাকে জানাল বীজ দেয়ার আইন নেই। তারা গবেষণা করে উন্নত জাতের বীজ উদ্ভাবন করে নিজেদের কাছে রেখে দেয়। আর না হলে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনকে (বিএডিসি) দেয়। কোনো কৃষক কি বিএডিসির কোনো হাইব্রিড বীজ কোনোদিন পেয়েছেন? আমি তো জানি না। আমাদের যে রিসোর্সগুলো রয়েছে সেগুলো ভালোভাবে ব্যবহার করা হলে উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং মোট খাদ্য উৎপাদন বাড়বে।

আবদুল আউয়াল মিন্টু: চেয়ারম্যান, মাল্টিমোড গ্রুপ

[বণিক বার্তা আয়োজিত কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা ও প্রাণ-প্রকৃতি সম্মেলনের ‘কৃষি উৎপাদন ও প্রাণ-প্রকৃতি’ বিষয়ক অধিবেশনে প্যানেল আলোচকের বক্তব্যে]