বর্তমানে দেশে এলপিজি খাতে প্রায় ২০টি কোম্পানি সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। এর মধ্যে শীর্ষ পাঁচটি কোম্পানি বাজারে নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠিত করেছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে সেই শীর্ষ পাঁচের মধ্যে নই; বরং তারও নিচের স্তরে অবস্থান করছি। আমি যেহেতু লোয়াবকে (এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ) প্রতিনিধিত্ব করছি, সেই দায়িত্ববোধ থেকেই এখানে কথা বলছি।
আমরা মূলত ছোট ও মাঝারি আকারের জাহাজের মাধ্যমে এলপিজি আমদানি করি। বিশেষ করে ‘এমজিসি’ (মিডিয়াম গ্যাস ক্যারিয়ার) সাইজের জাহাজ, যেগুলোর ধারণক্ষমতা প্রায় ২০ হাজার টন। কিন্তু বাস্তবে সমস্যাটা শুরু হয় তখনই, যখন এসব জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায়। চট্টগ্রাম বন্দরে আসার পর খালাস করার অনুমতি দেয়া হয় না। কুতুবদিয়ায় খালাস করতে বলা হয়। কিন্তু বর্ষাকালে কুতুবদিয়ায় নিরাপদভাবে কার্গো খালাস করা যায় না। আমরা কোনো বিশেষ সুবিধা চাই না। কেবল নীতিগত সহায়তা চাই আমরা। এ প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে আমদানি ব্যয় বাড়ছে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই প্রভাব ফেলছে।
এ বাস্তবতাগুলো যদি আমরা খোলাখুলি স্বীকার করে সমাধান খুঁজতে পারি তাহলে এলপিজির দাম কমানো সম্ভব। আমাদের উদ্দেশ্য স্পষ্ট, দেশের মানুষের জন্য জ্বালানি সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করা ও সেই লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যেতে চাই।
দাম আমরা নির্ধারণ করি না। এলপিজি অপারেটরসদের দুই-একটি তালিকাভুক্তও বটে। আমি নিজে সিমেন্ট শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। দুই দশকের ব্যবধানে বাংলাদেশ সিমেন্ট শিল্পে এক বিরল পরিবর্তন ঘটেছে। একসময় যে শিল্প সম্পূর্ণভাবে বিদেশীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। একসময় দেশের সিমেন্ট শিল্পের ৯০ শতাংশ ছিল বিদেশী কোম্পানির দখলে; আজ সেই বাজারের ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছেন বাংলাদেশীরা। এটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের একটি গৌরবগাথা।
কথায় কথায় শুনতে হয়, ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে খারাপ লোক। তারা অর্থ পাচার করে, বেশি মুনাফা করে ও লুটেরা। অথচ ১৯৮০-৯৫-এ যারা ব্যবসায় এসেছেন, তারাই আজ শিল্পে টিকে আছেন। ১৯৯৫ সালের পর থেকে নতুন কোনো প্রজন্ম এ দেশে ব্যবসা করতে আসেনি। নতুন কোনো উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে না। আগে থেকেই যারা ব্যবসা করছেন, ’৯৫-এর পর শুধু তাদের ছেলে সন্তানরা ব্যবসায় এসেছেন। এটা দেশের জন্য বড় সংকট হয়ে দাঁড়াচ্ছে। নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য আমরা যথেষ্ট নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করতে পেরেছি? না। ব্যবসায়ীদের নীতিগত সহায়তা না দেয়া গেলে নতুন প্রজন্ম ব্যবসায় আসবে না।
এখন প্রয়োজন একটি কার্যকর প্লাটফর্ম যেখানে আমরা কথা বলতে পারব এবং আমাদের মতামত প্রকাশ করতে পারব। জনগণ ও অংশীজনদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা বা গণশুনানি (পাবলিক হিয়ারিং) ছাড়াই এখন নীতি প্রণয়ন, বাজেট প্রণয়ন ও কর আরোপ হচ্ছে। কোন জায়গায় আছি আমরা? বছরের মাঝপথে হঠাৎ নতুন কর বসিয়ে দেয়া হচ্ছে। অথচ আমরা যারা সরাসরি প্রভাবিত, তাদের কেউ কিছু জানে না।
কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়াই সরকার ২ শতাংশ এআইটি (অগ্রিম আয়কর) বসিয়ে দেয়। শিল্পে ছোট-বড় উদ্যোক্তা রয়েছেন। সবার সক্ষমতা এক নয়। তাই আমরা দাবি জানিয়েছি, এআইটি যেন আমদানি পর্যায়েই সমন্বয় করা হয়। এ শিল্পে ভুর্তকি দেয়া হয় না। আমি এখানে ভুর্তকি চাইতে আসিনি। শিল্পকে টিকিয়ে রাখার জন্য দরকার সবার জন্য সমান্তরাল পরিবেশ।
চার-পাঁচ বছর হয়ে গেলেও সরকার এখনো বে-টার্মিনাল নির্মাণ করতে পারেনি। মাতারবাড়ীতে ১০০ একর জায়গা দিয়ে বেসরকারি খাতকে টার্মিনাল নির্মাণের দায়িত্ব দিন, আমরা তা দেড় বছরের মধ্যে করে দেব, যা দিয়ে পুরো এলপিজি আমদানি প্রক্রিয়া সহজ হবে। সরকার যদি এটা করতে চায়, তাহলে সেটি পাঁচ বছরেও করতে পারবে না।
বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প কোনো বিদেশীরা করেনি। তৈরি পোশাক শিল্পে কোনো বিদেশী দরকার নেই। এলপিজি খাতকেও বাংলাদেশীরা এগিয়ে নিতে সক্ষম। সিমেন্ট শিল্পও বাংলাদেশীরা করছেন। পেট্রোকেমিক্যালেও বাংলাদেশীরা ভালো করছেন। এমনকি আছে যা বাংলাদেশীরা করতে পারে না? হ্যাঁ, বাংলাদেশীদের মধ্যে খারাপ করেছে। দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষ আছে। কেউ হয়তো ২ লাখ কোটি টাকা পাচার করেছে। কিন্তু তখন আপনারা কোথায় ছিলেন? তখন কেন তাদের ধরা হয়নি?
অনেকেই বলছেন, দেশে এখন ভালো ম্যানেজিং ডিরেক্টর (এমডি) নেই। ভালো এমডি থাকবে কেমনে? গত দুই বছরে বাংলাদেশের ২০ জন সেরা এমডি বিদেশে চলে গেছেন। যদি এ পরিবেশ চলতে থাকে তাহলে হয়তো আরো ২০ জন দেশ ছেড়ে যাবে। তখন এ দেশ, এ শিল্প—চালাবে কারা?
আমরা কোনো অভিযোগ করতে বা কাউকে আঘাত কিংবা গালি দিতে আসিনি। যুক্তি দিয়ে উত্তর দিতে এবং একটি পথ দেখাতে এসেছি যাতে আমরা এগিয়ে যেতে পারি।
আমরা যদি অনর্থক হয়ে থাকি তাহলে আমাদের বাদ দিয়ে দিন। আমাদের দায়গুলো রেখে দিন আমরা বিদেশে চলে যাই। বিদেশে যাওয়ার সময় দেশ থেকে কোনো অর্থ নিয়ে যাব না। আমার মতো উদ্যোক্তারা দেশের বাইরে চলে গেলে প্রতি বছর অন্তত ৫০ মিলিয়ন ডলার উপার্জন করতে পারব। বাংলাদেশে আমরা কোনো কিছুই করতে পারছি না। কারণ আমাদের হাত বাঁধা। নীতিগত সীমাবদ্ধতায় আমি জড়িয়ে আছি।
নীতিগত সহায়তাসহ বাস্তবমুখী নীতি গ্রহণ করা হলে আমরা দেশের জন্য অনেক কিছু করতে পারি। যেকোনো নীতি গ্রহণের আগে অর্থাৎ হোক সেটি দাম বৃদ্ধি, কর পরিবর্তন বা নতুন কোনো বিধি—তার আগে জনগণ ও অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। যেকোনো রাজনৈতিক সরকারই ক্ষমতায় এলে নীতিনির্ধারণের আগে জনগণ ও অংশীজনদের মতামত নেয়া উচিত।
মোহাম্মদ আমিরুল হক: প্রেসিডেন্ট, এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব)
[‘বাংলাদেশে এলপিজি: অর্থনীতি, পরিবেশ ও নিরাপত্তা’ শীর্ষক পলিসি কনক্লেভে প্যানেল আলোচকের বক্তব্যে]










