সড়কে শৃঙ্খলা আনতে হলে নিরাপদ সড়কের বিকল্প নেই। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতের সঙ্গে জড়িত যানবাহন, পরিবহন মালিক, চালক, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি), ট্রাফিক পুলিশ, আইন প্রয়োগ ও জনগণ। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতে এদের সবারই নিজ নিজ ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ভূমিকার প্রয়োজন। সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হলে আইনের শাসন নিশ্চিতের পাশাপাশি দুর্নীতি প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকার বিকল্প নেই। অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করতে পারলেই সড়ক দুর্ঘটনাও কমে আসবে। তাই ট্রাফিক পুলিশ ও বিআরটিসিসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের তুলনায় বিদেশে সড়ক দুর্ঘটনা কম হয়। যানবাহন ত্রুটিমুক্ত আছে কিনা তা তারা প্রতি বছর যাচাই করে। যানবাহনে ত্রুটি থাকলে চলাচলের অনুমতি দেয়া হয় না। চালককে লাইসেন্স পেতে হলে তাকে দক্ষতা প্রমাণ করতে হয়। দক্ষতা প্রমাণে ব্যর্থ হলে তাকে লাইসেন্স দেয়া হয় না। যানবাহনে চলন্ত অবস্থায় মোবাইলে কথা বলা ও মাদকাসক্ত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। চালকরা ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলেন। এসব ক্ষেত্রে বিদেশে দুর্নীতি কিংবা ঘুস কল্পনা করা যায় না। কিন্তু আমাদের দেশে তার উল্টো চিত্র। যানবাহন চলাচলের প্রতি স্তরেই দুর্নীতি ঘুসের মাধ্যমে ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলছে। ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করলেও চালকের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয় না। ট্রাফিক আইন অমান্য করলে চালকরা জরিমানা এড়াতে পুলিশের সঙ্গে রফাদফা করে পার পেয়ে যাওয়ারও ঘটনা ঘটছে। আইনের প্রতি তারা শ্রদ্ধাশীল নয়। এতে চালকরা আরো বেপরোয়া হওয়ার সুযোগ পান। তাই সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে বিদেশের মতো কঠোর আইন প্রয়োগ করলে সড়কে দুর্ঘটনা কমে যেত।
বণিক বার্তায় প্রকাশ: দেশে ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস থেকে বছরে ১ হাজার ৫৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকা নিয়ম-বহির্ভূতভাবে আদায় হয়। এর মধ্যে দলীয় পরিচয়ের ব্যক্তি বা গোষ্ঠী চাঁদা আদায় করে প্রায় ২৫ কোটি টাকা। পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের কর্মী, প্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা পার্কিংয়ের জন্য নিয়ম-বহির্ভূতভাবে আদায় করে সাড়ে ৩৩ কোটি টাকা। মামলা এড়ানোর জন্য ৮৭ কোটি টাকার বেশি নিয়ম-বহির্ভূতভাবে অর্থ আদায় করে ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশ। টার্মিনালে প্রবেশ বা বের হওয়ার সময় মালিক ও শ্রমিক সংগঠন কর্তৃক নিয়ম-বহির্ভূতভাবে মালিক এবং শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা প্রায় ১৩ কোটি টাকা আদায় করেন। অন্যদিকে নিবন্ধন এবং সনদ ও হালনাগাদের জন্য বিআরটিএ থেকে নিয়ম-বহির্ভূতভাবে বছরে ৯০০ কোটি টাকার বেশি আদায় করা হয়।
সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে সরকার ও বিভিন্ন দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের সদিচ্ছার প্রয়োজন। দেশে ফুটপাত দখল, অদক্ষ চালক ও সহকারী দিয়ে গাড়ি চালানো, মাত্রাতিরিক্ত গতি, গাড়ির ত্রুটি, ট্রাফিক আইন না মানা, চলন্ত অবস্থায় মোবাইল বা হেডফোন ব্যবহার করার কারণে প্রতিনিয়তই দুর্ঘটনা বাড়ছে। সড়কে মৃত্যু বাংলাদেশের মানুষের নিত্যদিনকার অভিজ্ঞতার অংশ। বিভিন্ন খাতে আমরা অভূতপূর্ব উন্নয়ন করতে পারলেও স্বাধীনতার পর থেকেই অব্যবস্থাপনা ও সড়কে মৃত্যু যেন আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থার নিত্যসঙ্গী। গত কয়েক বছরে সড়কে প্রাণহানির পরিমাণ আরো বেড়েছে। প্রধান উপার্জনকারীর বিদায়ে অনেক পরিবারকে পথে নামতে হচ্ছে। আবার পঙ্গুত্ব বরণ করা ব্যক্তিরাও পরিবার ও সমাজের জন্য বোঝা হিসেবে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সড়কে প্রাণহানি আমাদের মোট জাতীয় উৎপাদন বা জিডিপিতেও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব রাখছে। দিনের পর দিন সড়কে প্রাণহানির মচ্ছব চলছে অথচ মনে হয় তার দায়িত্ব নেয়ার কেউ নেই।
চালকের অদক্ষতা ও বেপরোয়া যানবাহন চালানোর পাশাপাশি ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, সড়ক ও সেতুর নাজুক অবস্থাও সড়ক দুর্ঘটনার জন্য বহুলাংশে দায়ী বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। গণপরিবহনে বাড়তি যাত্রী সামাল দিতে গতিসীমার বাইরে দ্রুত গাড়ি চালিয়ে বেশি ট্রিপ দেয়ার অশুভ প্রতিযোগিতা আর বাড়তি মুনাফার লোভে পরিবহন সংস্থাগুলো চালকদের অনেক বেশি সময় কাজ করতে বাধ্য করে। ফলে চালকের ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ পড়ে, তাকে বেসামাল হয়ে গাড়ি চালাতে হয়; যা প্রকারান্তরে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। লক্কড়-ঝক্কড়, অচল যানবাহনে রঙ লাগিয়ে যেনতেন মেরামত করে রাস্তায় চলাচল করে বিভিন্ন উৎসব-পার্বণের সময়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অতিরিক্ত যাত্রী দূর-দূরান্তে গমনাগমন করে। সড়ক-মহাসড়কে অনেক সময় বাস-ট্রাকের মাদকাসক্ত চালকের গতির লড়াইয়ে দুর্ঘটনা ঘটে। কেউ-বা আবার গাড়ি চালানোর সময় ব্যবহার করেন সেলফোন, যা সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত। পণ্যবাহী যানবাহনে যাত্রী বহন, অদক্ষ চালক ও হেলপার দিয়ে যানবাহন চালানো, বিরামহীন যানবাহন চালানো, মহাসড়কে অটোরিকশা, নসিমন-করিমন ও মোটরসাইকেলের অবাধ চলাচল এবং ব্যস্ত সড়কে ওভারটেকিং, ওভারলোডিং তদারক না করা সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকাংশে বাড়িয়ে দেয়।
সড়ক দুর্ঘটনায় বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যুর কারণে প্রধানমন্ত্রী সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে পাঁচ দফা নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সেগুলো ছিল চালক ও সহকারীদের প্রশিক্ষণ প্রদান, দূরপাল্লার বাসযাত্রায় বিকল্প চালক রাখা ও ৫ ঘণ্টা পরপর চালক পরিবর্তন করা, চালক ও যাত্রীদের সিটবেল্ট বাঁধা বাধ্যতামূলক করা, চালকদের জন্য মহাসড়কে বিশ্রামাগার নির্মাণ এবং সিগন্যাল মেনে যানবাহন চালানোর ওপর কড়াকড়ি আরোপ; যা তেমন বাস্তবায়ন হতে দেখা যায়নি।
বিশ্বের প্রথম সারির উন্নত পরিবহন ব্যবস্থার কথা বলতে গেলে সিঙ্গাপুরের নামটি সামনে চলে আসে। সিঙ্গাপুরে পরিবহন ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে ল্যান্ড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি গঠন হয় ১৯৯৫ সালে। এক দশকের ব্যবধানে সংস্থাটি দেশটির পরিবহন ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনে। গ্রাহক সন্তুষ্টির দিক থেকে সিঙ্গাপুরের পরিবহন ব্যবস্থা বিশ্বে প্রথম সারিতে। এশিয়ার মধ্যে চীন, জাপান, দুবাই, ইউরোপের সুইডেন, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি প্রভৃতি দেশের পরিবহন ব্যবস্থা বিশ্বে আদর্শ। প্রতিটি দেশই নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। দেশগুলোয় সংশ্লিষ্ট আইনটি অত্যন্ত শক্তিশালী। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, আইন বাস্তবায়নে তাদের প্রশাসন খুবই কঠোর, কোনো ছাড় দেয়া হয় না। আইন বাস্তবায়নে দুর্নীতিকে তারা প্রশ্রয় দেয় না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়ক পরিবহন আইন প্রয়োগ কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ থাকলে দুর্ঘটনা কমবে না। মালিকদের প্রভাবে চলছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। তারা একপেশে ও একচেটিয়া সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। আইন প্রয়োগে প্রভাবশালীদের ছাড় দেয়া হচ্ছে। প্রভাবশালী ও সবলদের ওপর আইন প্রয়োগ করছে না পুলিশ। দুর্বলের ওপর আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে। এছাড়া সড়কে চাঁদাবাজি, ছোট যানবাহনের আধিক্যের কারণে সড়ক পরিবহন নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়ছে। উন্নত দেশে গণপরিবহনকে প্রাধান্য দেয়া হয়, আর আমাদের দেশে ছোট যানবাহনকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে।
সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—সড়কে দুই ও তিন চাকার গাড়ির সংখ্যা বাড়তে থাকা, বেপরোয়া গতি, বিপজ্জনক ওভারটেকিং, রাস্তা নির্মাণে ত্রুটি, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের অবাধে চলাচল, যাত্রী ও পথচারীদের অসতর্কতা, চালকের অদক্ষতা ও বেপরোয়া মনোভাব, চলন্ত অবস্থায় মোবাইল বা হেডফোন ব্যবহার এবং মাদক সেবন করে যানবাহন চালানো। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে যেসব ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে—১. সড়ক নিরাপত্তায় বাজেট বরাদ্দ বাড়িয়ে মন্ত্রণালয়ে আলাদা সড়ক নিরাপত্তা ইউনিট গঠন করা যেতে পারে, ২. দেশের সড়ক-মহাসড়কে প্রয়োজনীয় রোড সাইন (ট্রাফিক চিহ্ন) স্থাপন ও জেব্রা ক্রসিং অঙ্কন, ৩. গাড়িচালকদের দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করা আবশ্যক, ৪. পরিবহন খাতে বিদ্যমান অনিয়ম-দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ করা জরুরি, ৫. গাড়ির ফিটনেস ও চালকদের লাইসেন্স প্রদানের পদ্ধতি উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিকায়ন করা, ৬. সড়ক দুর্ঘটনায় আর্থিক সহায়তা তহবিল গঠনপূর্বক হতাহতদের দ্রুত উন্নত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা, ৭. দেশব্যাপী চাহিদানুযায়ী পর্যাপ্ত মানসম্মত নতুন গণপরিবহন নামানোর উদ্যোগ নেয়া, ৮. ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তা ও সদস্যদের প্রশিক্ষণের জন্য ট্রেনিং একাডেমি গড়ে তোলা।
সড়কে মৃত্যুর যে মিছিল চলছে প্রতিদিন তা নিয়ন্ত্রণে অবিলম্বে পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। সড়ক দুর্ঘটনা পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে আসে। দুর্নীতি রোধ, সুপ্রশিক্ষিত চালক, সড়কে সুব্যবস্থাপনা এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যথাযথ নীতি প্রণয়ন ও কার্যকর ছাড়া এ-জাতীয় ক্ষয় এড়ানো যাবে না। জাতিগত শক্তির নিদারুণ অপচয় রোধে সরকার যথাযথ পদক্ষেপ নেবে এ কামনা করছি।










